ব্যাংক থেকে সুদি লোন নিয়ে ভাইকে দেওয়া কি জায়েজ?
Business and Job · Hanafi
Question
আমার স্যালারি একাউন্টের এগেইন্সটে ব্যাংক ৮ লাখ টাকার মতো লোন দিবে। আমার ভাইয়া আমাকে লোন টি নিয়ে উনাকে দিতে বলছেন এবং উনি লোনের সব টাকা পরিশোধ করবেন, আমাকে লোনের কোনো টাকা দেয়া লাগবেনা। এখন আমি যদি আমার একাউন্টের এগেইন্সটে লোন নিয়ে ভাইয়াকে দেই যেটা উনি পরিশোধ করবেন , তাহলে সুদ নেয়া-দেয়া এর যেসকল গুনাহ আছে আমি সেটার অন্তর্ভুক্ত হবো কিনা?
Answer
সুদভিত্তিক লোন নিয়ে ভাইয়াকে দেওয়া: শরয়ি বিধান
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ভাইয়াকে দেওয়া এবং ভাই কর্তৃক তা পরিশোধ করা — এতে আপনি সুদি লেনদেনের গুনাহে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত হবেন। কারণ সুদের চুক্তি (আকদ) আপনার নামেই হচ্ছে, ব্যাংকের সাথে সুদি লোনের মূল পক্ষ আপনি নিজেই। ভাই শুধু পরিশোধকারী (যামিন/দায়ী) হিসেবে থাকছেন — এতে আপনার দায় ও গুনাহ রহিত হয় না।
কুরআনের দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)
فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ "যদি তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৭৯)
হাদিসের দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ "রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ খাওয়ালে, সুদ খাওয়াতে সাহায্যকারীকে, সুদের লেখককে এবং তার দুই সাক্ষীকে অভিশাপ করেছেন এবং বলেছেন: তারা সবাই সমান (গুনাহে)।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮; সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৩৩)
دِرْهَمُ رِبًا يَأْكُلُهُ الرَّجُلُ وَهُوَ يَعْلَمُ أَشَدُّ مِنْ سِتَّةٍ وَثَلَاثِينَ زَنْيَةً "এক দিরহাম সুদ যা একজন মানুষ জেনে-বুঝে খায়, তা ছত্রিশবার যিনার চেয়েও কঠিন।" — (মুসনাদে আহমাদ: ৩৭৫৪)
হানাফি ফিকহের দলিল
১. সুদি চুক্তির পক্ষ হওয়াই গুনাহের কারণ
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"সুদ গ্রহণকারী, প্রদানকারী, লেখক ও সাক্ষী — সবাই সমান গুনাহগার। কারণ তারা সবাই সুদি কারবারে সহযোগিতা করে।" — (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল বুয়ু, বাবুর রিবা: ৫/১৬৬)
২. গুনাহে সহযোগিতা নিষিদ্ধ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" — (সূরা আল-মায়িদা: ২)
৩. ফতোয়ায়ে উসমানি-তে উল্লেখ আছে:
"ব্যাংক থেকে সুদি লোন নেওয়া নিজেই হারাম। কেউ যদি নিজের নামে লোন নিয়ে অন্যকে দেয়, তবে সে-ই সুদি চুক্তির মূল পক্ষ; পরিশোধকারী যেই হোক, গুনাহ থেকে সে মুক্ত হবে না।" — (ফতোয়ায়ে উসমানি: ২/৪৩৫, কিতাবুর রিবা)
৪. ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.) বলেন:
"সুদি লোনের কাগজে যার নাম থাকে, দায় তার উপরই বর্তায়; চুক্তির গুনাহও তারই। অন্য কেউ পরিশোধ করলেও সে সুদি কারবারের শরিক হিসেবে গণ্য হবে।" — (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৩/২৮৯)
আপনার প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর
| বিষয় | বিধান | |------|------| | ব্যাংকের সাথে সুদি লোনের চুক্তি | আপনার নামে → গুনাহ আপনার | | ভাই টাকা পরিশোধ করবেন | এতে আপনার দায়/গুনাহ রহিত হবে না | | আপনি কি সুদের গুনাহে অন্তর্ভুক্ত হবেন? | হ্যাঁ, সরাসরি অন্তর্ভুক্ত হবেন | | ভাইয়ের অবস্থান | তিনিও পরিশোধকারী হিসেবে শরিক, তিনিও গুনাহগার |
কারণ: সুদি লোনের মূল আকদ (চুক্তি) আপনার নামে হচ্ছে। আপনি হচ্ছেন "মুস্তাকরিজ" (ঋণগ্রহীতা) এবং ব্যাংক "মুকরিজ" (ঋণদাতা)। ভাই শুধু "যামিন" বা পরিশোধকারী। হাদিসে "মূকিলাহু" (সুদ খাওয়াতে সাহায্যকারী) শব্দটি আপনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য — আপনি ভাইয়ের জন্য সুদি লোনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন।
করণীয়
১. এই লোন নেওয়া থেকে বিরত থাকুন — চাই ভাই পরিশোধ করুক বা আপনি। ২. ভাইকে বোঝান — সুদ সম্পূর্ণ হারাম, পরিশোধের দায় যার উপরই থাকুক, চুক্তির গুনাহ আপনার। ৩. বিকল্প ব্যবস্থা:
- ইসলামি ব্যাংক/শরিয়াহ-সম্মত ফিন্যান্সিং
- হালাল উপায়ে ঋণ (কarz-e-hasanah)
- ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব (মুশারাকা/মুদারাবা)
- প্রয়োজন হলে সম্পদ বিক্রি বা খরচ কমানো ৪. যদি ইতোমধ্যে নিয়ে ফেলেন — তওবা করুন, ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করুন।
বিশেষ সতর্কতা
অনেকে মনে করেন "যেহেতু ভাই পরিশোধ করবে, তাই আমার কোনো দোষ নেই" — এটি ভুল ধারণা। ফিকহের মূলনীতি:
الأمور بمقاصدها — "কাজের বিধান তার উদ্দেশ্য অনুযায়ী।"
আপনার উদ্দেশ্য যেহেতু সুদি লোন নেওয়া, তাই গুনাহ আপনার উপরই বর্তাবে। ভাইয়ের পরিশোধের প্রতিশ্রুতি গুনাহকে হালাল করতে পারে না।
والله تعالى أعلم بالصواب