বিবাহের সিদ্ধান্ত, ইস্তেখারা, পাত্রীপক্ষকে 'না' বলার পর করণীয়।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
১: নন মাহরাম কারো প্রতি এরকম অনুভুতি আসা কি ওয়াস ওয়াসার লক্ষণ?
২: হুট করে এরকম অস্থিরতা আসার কারন কি?
৩: পাত্রীপক্ষকে "না" করে দেওয়া কি আমার উচিত হয়েছে? পাত্রীপক্ষকে "না" করার ব্যাপার আমার ফ্যামিলি জানার পর আমাকে বকাঝকা করেছে।
৪: এখন আমার করনীয় কি? আমার ইচ্ছা আর্থিকভাবে আরো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আবার বিয়ের ব্যাপারে ভাবনা চিন্তা করা কিন্তু অনুশোচনা আর পাত্রীর প্রতি আকর্ষণ কমছেনা।
Answer
ওয়াস ওয়াসা ও বিবাহ সংক্রান্ত প্রশ্নের শরঈ উত্তর
ভূমিকা
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। এতে তিনটি দিক জড়িত: (১) ওয়াস ওয়াসার প্রকৃতি, (২) বিবাহের সিদ্ধান্ত ও ইস্তেখারা, (৩) পাত্রীপক্ষকে "না" বলার পরবর্তী করণীয়। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে ধাপে ধাপে উত্তর দেওয়া হলো।
১. নন-মাহরামের প্রতি এরকম অনুভূতি কি ওয়াস ওয়াসার লক্ষণ?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, এটি সাধারণত ওয়াস ওয়াসা নয়; বরং এটি স্বাভাবিক মানবীয় আকর্ষণ (মাইল/ঝোঁক), যা শরীয়ত স্বীকৃতি দিয়েছে — তবে তা সংযত রাখা ফরজ।
দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ... "মানুষের কাছে নারী, সন্তান-সন্ততি... এর প্রতি আসক্তি সুশোভিত করা হয়েছে।" — (সূরা আলে ইমরান: ১৪)
আল্লাহ আরও বলেন:
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ "হয়তো তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আর হয়তো কোনো জিনিস ভালোবাসো, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর।" — (সূরা বাকারা: ২১৬)
ফিকহী বিশ্লেষণ:
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:
"নফসের পক্ষ থেকে যে স্বাভাবিক ঝোঁক আসে, তা যদি হারাম কাজে লিপ্ত না করে এবং নিয়ত সংযত থাকে, তবে তা গুনাহ নয়। তবে শয়তান এই সুযোগে কুমন্ত্রণা দেয়।"
ওয়াস ওয়াসার সংজ্ঞা: ওয়াস ওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে সৃষ্ট সন্দেহ ও কুমন্ত্রণা, যা ইবাদত, আকীদা বা হালাল-হারাম সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি করে। যেমন — "নামাজ হয়নি কি?", "অজু ভেঙে গেল কি?" ইত্যাদি।
আপনার ক্ষেত্রে যা ঘটছে তা হলো স্বাভাবিক আকর্ষণ, যা বিবাহের নিয়ত ও ইস্তেখারার মাধ্যমে আরও দৃঢ় হয়েছে। এটি ওয়াস ওয়াসা নয়; বরং এটি একটি ইশারা, যা আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তরে রেখেছেন। তবে এটিকে হারাম পথে পরিচালিত করা যাবে না।
সতর্কতা: যেহেতু পাত্রী এখনও নন-মাহরাম, তাই তার সাথে একান্তে সাক্ষাৎ, প্রেম-প্রণয়, ফোনে কথা বলা — সবই হারাম। শুধু শরীয়তসম্মত পন্থায় (অভিভাবকের মাধ্যমে) বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া জায়েজ।
২. হঠাৎ করে এরকম অস্থিরতা আসার কারণ কী?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: এর কয়েকটি কারণ থাকতে পারে:
(ক) শয়তানের কুমন্ত্রণা ও ওয়াস ওয়াসা:
শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়। যখন আপনি ভালো কাজের (বিবাহ) সিদ্ধান্ত নেন, তখন শয়তান নানা সন্দেহ ও ভয় ঢুকিয়ে দেয়।
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا "নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু; সুতরাং তোমরা তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করো।" — (সূরা ফাতির: ৬)
(খ) ইস্তেখারার প্রভাব:
আপনি ইস্তেখারা করেছেন এবং তাতে সম্মন্ধের প্রতি টান বেড়েছে। ইস্তেখারার প্রকৃত ফল হলো — আল্লাহ তাআলা অন্তরে সেই কাজের প্রতি অনুরাগ বা বিরাগ সৃষ্টি করেন। ইমাম তাহাবী (রহ.) ও ইবনে আবিদিন (রহ.) উল্লেখ করেন:
"ইস্তেখারা হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা; এরপর অন্তরে যে ঝোঁক আসে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা হতে পারে।"
(গ) আবেগ ও মানবীয় দুর্বলতা:
আপনি পাত্রীকে দেখেননি, কিন্তু তার দ্বীনদারি ও গুণাবলির কথা শুনে অন্তরে ভালোবাসা জন্মেছে। এটি স্বাভাবিক। ইমাম গাজালী (রহ.) «ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন»-এ বলেন:
"আত্মার মধ্যে ভালোবাসা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিয়ামত, তবে তা শরীয়তের সীমার মধ্যে রাখতে হবে।"
(ঘ) পারিবারিক চাপ ও ভয়:
আপনার পরিবার, বিশেষ করে আব্বুর রাগের কারণে আপনার মনে দ্বিধা সৃষ্টি হয়েছে। পাত্রীপক্ষের দুশ্চিন্তাও আপনাকে অস্থির করছে। এটি মানসিক চাপ, যা স্বাভাবিক।
৩. পাত্রীপক্ষকে "না" করে দেওয়া কি উচিত হয়েছে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, এটি সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং এটি তাড়াহুড়ার সিদ্ধান্ত ছিল।
দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
التَّأَنِّي مِنَ اللهِ وَالْعَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ "ধীরস্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ থেকে।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৯৭২; তিরমিজি)
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন:
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ "যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি আসে, যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তখন তাকে বিয়ে দাও।" — (তিরমিজি, হাদীস নং ১০৮৪)
ফিকহী বিশ্লেষণ:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, বিবাহে দ্বীনদারি ও চরিত্রই প্রধান বিবেচ্য। ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:
"বিবাহের জন্য দ্বীনদার ও সচ্চরিত্র পাত্র/পাত্রী নির্বাচন করা সুন্নত।"
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে বলেন:
"বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার আগে ইস্তেখারা ও ইস্তেশারা (পরামর্শ) করা উচিত। শুধু পার্থিব দুশ্চিন্তার কারণে দ্বীনদার পাত্রীকে প্রত্যাখ্যান করা ঠিক নয়।"
আপনার ভুল:
১. রাগের বশে সিদ্ধান্ত: আপনি রাগ করে পাত্রীপক্ষকে "না" বলেছেন। রাগের সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া শয়তানের প্ররোচনা।
২. পার্থিব দুশ্চিন্তাকে প্রাধান্য দেওয়া: পাত্রী ভবিষ্যৎ রিজিক নিয়ে দুশ্চিন্তা করছে — এটি তার মানবীয় দুর্বলতা, কিন্তু আপনি তাকে "কম তাওয়াক্কুল" বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ আল্লাহ বলেন:
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" — (সূরা তালাক: ৩)
৩. পরিবারের চাপ: আপনার পরিবার আপনাকে বকাঝকা করেছে — এর মানে তারা এই সম্মন্ধ চায়। ইসলামে পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. এখন আপনার করণীয় কী?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: নিম্নলিখিত ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: ইস্তেখারা ও ইস্তেশারা (পরামর্শ)
আবার ইস্তেখারা করুন এবং অভিজ্ঞ আলেমের সাথে পরামর্শ করুন। আপনার কর্মক্ষেত্রের আলেমের তত্ত্বাবধানে আছেন — তার সাথে বিস্তারিত আলোচনা করুন।
ধাপ ২: পাত্রীপক্ষের সাথে পুনরায় যোগাযোগ
যদি সম্ভব হয়, পাত্রীপক্ষের সাথে পুনরায় যোগাযোগ করুন এবং ক্ষমা চেয়ে নিন। বলুন:
"আমি রাগের বশে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি আবার ভেবে দেখতে চাই।"
ধাপ ৩: পাত্রীর সাথে সরাসরি কথা বলা যাবে না
যেহেতু পাত্রী নন-মাহরাম, তাই তার সাথে সরাসরি কথা বলা, মেসেজ করা, ফোন করা — সবই হারাম। যদি কিছু জানতে চান, তার অভিভাবক বা আপনার পরিবারের মাধ্যমে জানান।
ধাপ ৪: পার্থিব দুশ্চিন্তার সমাধান
পাত্রী ভবিষ্যৎ রিজিক নিয়ে দুশ্চিন্তা করছে — এটি তার মানবীয় দুর্বলতা। আপনি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন (অভিভাবকের মাধ্যমে) যে:
- আল্লাহই রিজিকের মালিক।
- আপনি দ্বীনি পরিবেশে থাকতে চান, যা বরকতের উৎস।
- আপনি সচ্ছল, এবং আপনার পরিবারও সচ্ছল।
ধাপ ৫: পিতার সাথে সম্পর্ক
আপনার পিতার রাগের বিষয়টি — ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ ফরজ। আল্লাহ বলেন:
وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করো।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
আপনার পিতার রাগ সাময়িক; তিনি আপনার কল্যাণই চান। তার সাথে ধৈর্য ধারণ করুন এবং তার পরামর্শ শুনুন।
ধাপ ৬: বিবাহে তাড়াহুড়া করবেন না, কিন্তু দেরিও করবেন না
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ "হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে।" — (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫০৬৫)
আপনার সামর্থ্য আছে, দ্বীনদার পাত্রীও পেয়েছেন — সুতরাং বিলম্ব করা ঠিক নয়। তবে আর্থিকভাবে আরও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিয়ের চিন্তা করা — এটি একটি বৈধ ইচ্ছা, কিন্তু এজন্য দ্বীনদার পাত্রীকে হারানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
ধাপ ৭: অনুশোচনা ও আকর্ষণ কমছে না — এর মানে কী?
আপনার অন্তরে যে তীব্র অনুশোচনা ও আকর্ষণ — এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ইশারা হতে পারে যে, এই সম্মন্ধ আপনার জন্য কল্যাণকর। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
"যখন কোনো হালাল কাজের প্রতি অন্তরে প্রবল ঝোঁক আসে এবং ইস্তেখারায় তা দৃঢ় হয়, তখন তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা।"
তবে শুধু আবেগের বশে নয়; বরং ইস্তেখারা + ইস্তেশারা + পরিবারের সম্মতি — এই তিনটি মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. নন-মাহরামের প্রতি অনুভূতি কি ওয়াস ওয়াসা? | না, এটি স্বাভাবিক আকর্ষণ; তবে সংযত রাখা ফরজ। | | ২. হঠাৎ অস্থিরতার কারণ? | শয়তানের কুমন্ত্রণা, ইস্তেখারার প্রভাব, পারিবারিক চাপ ও মানবীয় আবেগ। | | ৩. "না" করা কি উচিত হয়েছে? | না, এটি তাড়াহুড়ার সিদ্ধান্ত ছিল; রাগের বশে নেওয়া সিদ্ধান্ত ভুল। | | ৪. এখন করণীয়? | ইস্তেখারা + আলেমের পরামর্শ + পাত্রীপক্ষের সাথে পুনরায় যোগাযোগ + পিতার সাথে সদাচরণ + বিলম্ব না করা। |
বিশেষ নসীহত
১. রাগের সময় সিদ্ধান্ত নেবেন না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "রাগ করো না।" (বুখারী)
২. ইস্তেখারার ফলকে আবেগের সাথে মিশিয়ে ফেলবেন না। ইস্তেখারা হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা; এরপর অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিন।
৩. পাত্রীর সাথে হারাম সম্পর্কে জড়াবেন না। শুধু অভিভাবকের মাধ্যমে যোগাযোগ করুন।
৪. পিতার সন্তুষ্টি অর্জন করুন। তিনি আপনার কল্যাণই চান; তার রাগ সাময়িক।
৫. আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখুন। রিজিকের মালিক আল্লাহ; তিনি যাকে চান, যেভাবে চান রিজিক দেন।
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا ۞ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" — (সূরা তালাক: ২-৩)