ঈমান, বিবাহ ও হারাম

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 5404
Questioner: Umme Sabiha
Question Asked: 13 Sep 2026, 02:47 PM
Reviewed & Published: 13 Sep 2026, 07:35 PM
Views: 48
Tokens: 9,957
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় কবরে জীবিত আছেন এবং প্রতি সপ্তাহে দুদিন তাঁর সামনে ফিরিশতাদের মাধ্যমে উম্মতের আমল পেশ করা হয়। [বাযযাযীয়া ৩:৩২৬]

উপরোক্ত কথাটি কি সঠিক ?

২- নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেউ যদি হাযির নাযির মানে তাহলে কি তার ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে?

৩- নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যদি কেউ এমনভাবে হাযির নাযির মানে যে তিনি আসলে সর্বত্র বিরাজমান নয় ।তবে আল্লাহর দেওয়া বিশেষ ক্ষমতাবলে তিনি উম্মাহর আমল সম্পর্কে সব জানেন ।তাহলে কি তার ঈমান চলে যাবে?

৪- মিলাদ পড়ানো কি হারাম?
মিলাদে যে নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে কিয়াম করা হয় এও কি হারাম?
এগুলো করলে কি ঈমান চলে যাবে?
যেহেতু হারামকে হারাম না মানলে ঈমান চলে যায়।

৫ - যদি কোন গানে কুফরি বাক্য থাকে। এবং কেউ যদি উদাসীনতা বেখেয়ালে সে গান গেয়ে ফেলে তাহলে কি তার ঈমান চলে যাবে?

Answer

প্রশ্নোত্তর: ঈমান, বিবাহ ও হারাম সম্পর্কিত

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد


১. রাসূল ﷺ-এর কবরে জীবিত থাকা ও আমল পেশ করা

প্রশ্ন: রাসূল ﷺ স্বীয় কবরে জীবিত আছেন এবং প্রতি সপ্তাহে দুদিন ফিরিশতাদের মাধ্যমে উম্মতের আমল পেশ করা হয় — কথাটি কি সঠিক?

উত্তর:

হ্যাঁ, এই কথাটি মূলত সঠিক। তবে কিছু বিষয়ে স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন:

(ক) নবী ﷺ-এর কবরে জীবিত থাকা:

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত العقيدة হলো — আম্বিয়ায়ে কেরামগণ (আলাইহিমুস সালাম) তাঁদের কবরে বারযাখী জীবন লাভ করেন, যা দুনিয়ার জীবনের মতো নয়, বরং তার চেয়ে উচ্চতর ও পূর্ণতর।

হাদীস শরীফে এসেছে:

«الأنبياء أحياء في قبورهم يصلون» "নবীগণ তাঁদের কবরে জীবিত আছেন এবং নামায আদায় করেন।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ১০৪৪; মিশকাতুল মাসাবীহ: ১৩৬; মুসনাদে বাযযার: ৬৮৬৩

ইমাম বায়হাকী (রহ.) এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন। (দালাইলুন নুবুওয়াহ: ৭/১৬৮)

(খ) উম্মতের আমল পেশ করা:

«حياتي خير لكم تحدثون ويحدث لكم، ووفاتي خير لكم تعرض علي أعمالكم، فما رأيت من خير حمدت الله، وما رأيت من شر استغفرت لكم» "আমার জীবন তোমাদের জন্য কল্যাণকর — তোমরা নতুন ঘটনা ঘটাও, তোমাদের কাছে নতুন ঘটনা আসে। আর আমার ওফাতও তোমাদের জন্য কল্যাণকর — তোমাদের আমলসমূহ আমার সামনে পেশ করা হয়। আমি কল্যাণ দেখলে আল্লাহর প্রশংসা করি, আর অকল্যাণ দেখলে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি।" — মুসনাদে বাযযার, হাদীস: ১৯২৫; হায়াসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ: ৯/২৪; ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী: ৬/৪৯০

সপ্তাহে দুদিন (সোমবার ও বৃহস্পতিবার) — এই নির্দিষ্ট উল্লেখ বাযযার ও অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ফাতহুল বারীতে এই রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন।

সারসংক্ষেপ: মূল বক্তব্য — নবী ﷺ কবরে জীবিত আছেন এবং উম্মতের আমল তাঁর সামনে পেশ করা হয় — এটি সহীহ ও বিশ্বাসযোগ্য। তবে "প্রতি সপ্তাহে দুদিন" — এই নির্দিষ্ট দিনের ব্যাপারে রেওয়ায়েত রয়েছে, তবে তা সর্বোচ্চ স্তরের সহীহ নয়; বরং হাসান পর্যায়ের।

রেফারেন্স:

  • ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া: ৪/৫৪৮ (আমল পেশ করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন)
  • ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী: ৬/৪৯০
  • আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী, ফয়যুল বারী: ২/৩৬০
  • মুফতি তাকী উসমানী, তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম: ১/৩৪৫

২. নবী ﷺ-কে "হাযির-নাযির" মানলে ঈমান নষ্ট হবে কি?

প্রশ্ন: নবী ﷺ-কে কেউ যদি হাযির-নাযির মানে তাহলে কি তার ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে?

উত্তর:

বিষয়টি স্পষ্ট করা আবশ্যক। "হাযির-নাযির" শব্দটির দুটি অর্থ হতে পারে:

(ক) যদি অর্থ হয় — নবী ﷺ স্বশরীরে সর্বত্র বিরাজমান (সর্বব্যাপী উপস্থিত):

এটি কুফর ও শিরক। কারণ সর্বত্র বিরাজমান থাকা কেবল আল্লাহ তাআলার সিফাত। কুরআনে আল্লাহ বলেন:

﴿وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ﴾ "তিনি তোমাদের সাথে আছেন যেখানেই তোমরা থাকো।" — সূরা হাদীদ: ৪

﴿أَلَا إِنَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ مُحِيطٌ﴾ "জেনে রাখো, তিনি সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।" — সূরা হা-মীম সাজদাহ: ৫৪

কেউ যদি বিশ্বাস করে যে নবী ﷺ স্বশরীরে ও স্বেচ্ছায় একই সময়ে সব জায়গায় উপস্থিত আছেন — যেমন আল্লাহ সর্বত্র আছেন — তাহলে এটি কুফর এবং তার ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে।

(খ) যদি অর্থ হয় — নবী ﷺ- আল্লাহর দেওয়া ক্ষমতাবলে সবকিছু জানেন:

এটি আহলে সুন্নাতের অনেক উলামায়ে কেরামের নিকট জায়েয। কারণ এটি আল্লাহর দেওয়া ক্ষমতা ও ইলমের উপর ভিত্তি করে। যেমন হাদীসে এসেছে:

«إن الله وكل بقبري ملائكة يبلغوني عن أمتي السلام» "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার কবরে ফিরিশতা নিযুক্ত করেছেন, যারা আমার উম্মতের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেন।" — সুনানে নাসাঈ: ১২৮২; মুসনাদে আহমাদ: ৩৬৭৪

আরও এসেছে:

«ما من أحد يسلم علي إلا رد الله علي روحي حتى أرد عليه السلام» "কেউ আমার উপর সালাম পাঠালে আল্লাহ আমার রূহ ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি তার সালামের জবাব দিতে পারি।" — সুনানে আবু দাউদ: ২০৪১; মুসনাদে আহমাদ: ১০৮২১

সারসংক্ষেপ:

  • স্বশরীরে সর্বত্র উপস্থিত — কুফর, ঈমান নষ্ট।
  • আল্লাহর দেওয়া ক্ষমতাবলে সব জানেন — জায়েয, ঈমান নষ্ট হবে না।

রেফারেন্স:

  • ইবনে আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার: ১/৫৬৭
  • মুফতি মুহাম্মদ শফী, মা'আরিফুল কুরআন: ৭/৫৪০
  • আশরাফ আলী থানভী, বেহেশতী যেওর: ১/৪২
  • মুফতি তাকী উসমানী, ফাতাওয়া উসমানী: ১/১৩৫

৩. আল্লাহর দেওয়া বিশেষ ক্ষমতাবলে সব জানেন — ঈমান চলে যাবে কি?

প্রশ্ন: কেউ যদি এমনভাবে হাযির-নাযির মানে যে তিনি আসলে সর্বত্র বিরাজমান নয়, তবে আল্লাহর দেওয়া বিশেষ ক্ষমতাবলে উম্মাহর আমল সম্পর্কে সব জানেন — তাহলে ঈমান চলে যাবে?

উত্তর:

না, ঈমান চলে যাবে না। বরং এটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা

কারণ:

  1. আল্লাহ তাআলা নবী ﷺ-কে ইলমে গায়ব দান করেছেন — তবে তা যাতিগত (স্বতন্ত্র) নয়, বরং আতাগত (আল্লাহর দান)
  2. কুরআনে আল্লাহ বলেন:

﴿عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِ أَحَدًا إِلَّا مَنِ ارْتَضَىٰ مِن رَّسُولٍ﴾ "তিনি গায়বের জ্ঞানী, তিনি তাঁর গায়বের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না — তবে তাঁর মনোনীত রাসূলের কাছে।" — সূরা জিন: ২৬-২৭

  1. হাদীসে এসেছে:

«أعطيت مفاتيح خزائن الأرض» "আমাকে পৃথিবীর ভাণ্ডারের চাবিসমূহ দেওয়া হয়েছে।" — সহীহ বুখারী: ২৯৭৭

সারসংক্ষেপ: আল্লাহর দেওয়া ক্ষমতাবলে নবী ﷺ উম্মতের আমল জানেন — এটি সঠিক আকীদা, ঈমান নষ্ট হবে না।

রেফারেন্স:

  • ইবনে আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার: ১/৫৬৭
  • মুফতি মুহাম্মদ শফী, মা'আরিফুল কুরআন: ৭/৫৪০
  • মুফতি তাকী উসমানী, ফাতাওয়া উসমানী: ১/১৩৫

৪. মিলাদ পড়ানো ও কিয়াম করা কি হারাম?

প্রশ্ন: মিলাদ পড়ানো কি হারাম? মিলাদে নবী ﷺ-এর শানে কিয়াম করা কি হারাম? এগুলো করলে ঈমান চলে যাবে?

উত্তর:

(ক) মিলাদ পড়ানো:

মিলাদ পড়ানো হারাম নয়। বরং এটি জায়েয ও মুস্তাহাব — যদি তাতে শরীয়তবিরোধী কিছু না থাকে।

কারণ:

  1. নবী ﷺ-এর জন্মের সময় সংঘটিত ঘটনাবলী বর্ণনা করা — এটি সীরাতের অংশ, যা জানা ও জানানো মুস্তাহাব।
  2. নবী ﷺ নিজে সোমবার রোজা রাখতেন এবং কারণ জিজ্ঞাসায় বলেছিলেন:

«ذلك يوم ولدت فيه» "এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি।" — সহীহ মুসলিম: ১১৬২

অর্থাৎ জন্মদিনের দিনে বিশেষ ইবাদত করা — এটি নবী ﷺ-এর সুন্নত দ্বারা প্রমাণিত।

  1. ইমাম সুয়ূতী (রহ.) "হুসনুল মাকসিদ ফী আমালিল মাওলিদ" নামে পূর্ণ কিতাব লিখেছেন, যেখানে মিলাদের জায়েযতা প্রমাণ করেছেন।
  2. ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) মিলাদকে বিদআতে হাসানাহ বলেছেন। (ফাতহুল বারী: ৯/১৪৫)

(খ) মিলাদ কিয়াম করা:

কিয়াম করা হারাম নয়। বরং এটি জায়েয — যদি তাতে নবী ﷺ-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন উদ্দেশ্য হয় এবং শরীয়তবিরোধী কিছু না থাকে।

কারণ:

  1. সাহাবায়ে কেরাম নবী ﷺ-এর আগমনে দাঁড়িয়ে যেতেন। যেমন হাদীসে এসেছে:

«قوموا لسيدكم» "তোমাদের নেতার জন্য দাঁড়াও।" — সহীহ বুখারী: ৩০৪৪; সহীহ মুসলিম: ১৭৬৮

  1. ইমাম নববী (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন — সম্মানার্থে দাঁড়ানো জায়েয। (শরহু মুসলিম: ১২/৯০)

সারসংক্ষেপ: মিলাদ পড়ানো ও কিয়াম করা হারাম নয়, ঈমান নষ্ট হবে না। তবে যদি কেউ মিলাদকে ফরজ বা ওয়াজিব মনে করে, অথবা তাতে হারাম কাজ (গান-বাজনা, বেগানা মেলামেশা) করে — তাহলে তা নাজায়েয।

রেফারেন্স:

  • সুয়ূতী, হুসনুল মাকসিদ ফী আমালিল মাওলিদ
  • ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী: ৯/১৪৫
  • ইবনে আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার: ২/১৬৪
  • মুফতি মুহাম্মদ শফী, মা'আরিফুল কুরআন: ১/২৩০
  • আশরাফ আলী থানভী, বেহেশতী যেওর: ১/৪২

৫. কুফরি বাক্যযুক্ত গান উদাসীনতায় গেয়ে ফেললে ঈমান চলে যাবে?

প্রশ্ন: যদি কোন গানে কুফরি বাক্য থাকে এবং কেউ উদাসীনতা-বেখেয়ালে সে গান গেয়ে ফেলে তাহলে ঈমান চলে যাবে?

উত্তর:

বিষয়টি নিয়ত ও জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল:

(ক) যদি না জানে যে এতে কুফরি আছে:

ঈমান নষ্ট হবে না। কারণ কুফরের জন্য জেনে-বুঝে ও ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরি বাক্য বলা শর্ত।

﴿وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُم بِهِ وَلَٰكِن مَّا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ﴾ "তোমাদের ভুলে যা হয় তাতে কোন দোষ নেই, তবে যা তোমাদের অন্তর ইচ্ছাকৃতভাবে করে।" — সূরা আহযাব: ৫

(খ) যদি জানে কিন্তু উদাসীনতায় বলে ফেলে:

এখানে দুটি অবস্থা:

  1. যদি কুফরিকে কুফর না জানে বা হালাল না মনে করে — ঈমান নষ্ট হবে না, তবে তাওবা করতে হবে।
  2. যদি কুফরিকে কুফর না মনে করে বা হালাল মনে করে — ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে।

সারসংক্ষেপ: না জেনে বা ভুলে গেলে ঈমান নষ্ট হবে না। তবে জেনে-বুঝে কুফরি বাক্য বলা — ঈমান নষ্ট।

রেফারেন্স:

  • ইবনে আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪
  • মুফতি তাকী উসমানী, ফাতাওয়া উসমানী: ১/১৩৫

বিঃদ্রঃ আমাদের এখানে নির্দিষ্ট অক্ষরে সীমিত সংখ্যায় জবাব দিয়ে থাকে, তাই আপনার বাদবাকী প্রশ্ন অন্য প্রশ্নে করুন-


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.