বিদেশে শেফের চাকরির বেতনে কুরবানী
Business and Job · Hanafi
Question
(উল্লেখ্য যে, মূলত অন্যান্য অধিক হালাল অপশন বিদেশে কম থাকায় ই এই কাজ করা।)
Answer
উত্তরঃ
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তরঃ
উক্ত ব্যক্তির উপার্জিত বেতন হারাম হবে, কারণ তিনি সরাসরি হারাম বস্তু (যেমন: হারাম পশু, মদ, ইত্যাদি) প্রস্তুত ও পরিবেশনের সাথে জড়িত হয়। রেস্তোরাঁয় শেফ হিসেবে কাজ করার অর্থ হলো হারাম খাদ্য তৈরি করা, যা ইসলাম স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছে। এই উপার্জন দ্বারা কুরবানী করলে তা সহীহ হবে না এবং কবুল হবে না। কারণ আল্লাহ তাআলা পবিত্র বস্তুই গ্রহণ করেন।
তবে, যদি ব্যক্তি শুধুমাত্র হালাল খাদ্য (যেমন: সবজি, ডিম, মাছ ইত্যাদি) তৈরির দায়িত্বে থাকে এবং হারাম বস্তুর সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা না থাকে, তবে তার বেতন হালাল হবে। কিন্তু প্রশ্নে উল্লেখিত পরিস্থিতিতে যেখানে সরাসরি হারাম পশু ও অন্যান্য হারাম খাদ্য বিক্রি হয়, সেখানে শেফ হিসেবে কাজ করা **ঠিক নয়।
বিস্তারিত ফতোয়া
১. হারাম কাজের মাধ্যমে উপার্জনের বিধান
ইসলামে উপার্জনের পবিত্রতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন:
"وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ"
(সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
অর্থ: "তোমরা নিজেদের মধ্যে অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভক্ষণ করো না।"
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا"
(সহীহ মুসলিম: ২৩৪৬)
অর্থ: "নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তুই গ্রহণ করেন।"
হারাম পশু (যেমন: শূকর, মৃত পশু) বা হারামভাবে জবাইকৃত পশু এবং মদ ইত্যাদি নিয়ে কাজ করলে সেই উপার্জন হারাম হবে। শেফ হিসেবে এই বস্তুগুলি তৈরির দায়িত্ব নেওয়া গুনাহের কাজ।
২. হানাফি ফিকহের নির্দেশনা
প্রখ্যাত হানাফি গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (৯/৪৫৮) এ উল্লেখ আছে:
"হারাম বস্তু বিক্রি করা বা তৈরি করা জায়েয নয়। আর যে ব্যক্তি এ কাজ করে, তার উপার্জন হারাম হবে।"
ফতোয়ায়ে উসমানী (২/২৪০) তে বলা হয়েছে:
"কোনো প্রতিষ্ঠান যদি সরাসরি হারাম বস্তু (যেমন: শূকর, মদ) নিয়ে ব্যবসা করে, সেখানে কাজ করা জায়েয হবে না। আর যদি হারাম ও হালাল উভয়ই থাকে, তবে শুধুমাত্র হালাল অংশের সাথে সম্পর্কিত কাজ করা জায়েয হতে পারে, কিন্তু হারাম অংশের সাথে জড়িত থাকা নাজায়েয।"
৩. হালাল অপশনের অজুহাত
আপনি বলেছেন, বিদেশে হালাল অপশন কম থাকায় এই কাজ করা হয়েছে। কিন্তু ইসলামী বিধান অনুযায়ী, হারামকে হালাল করে না, যদিও বিকল্প কম থাকে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ فَقَدِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ"
(সহীহ বুখারী: ২০৫১)
অর্থ: "যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দীন ও ইজ্জতকে রক্ষা করে।"
তবে, চরম প্রয়োজন (যেমন: ক্ষুধায় মৃত্যুর আশঙ্কা) হলে হারাম জিনিস খাওয়ার অনুমতি আছে, কিন্তু সাধারণ চাকরির জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। তাই হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা ফরজ।
৪. কুরবানীর গ্রহণযোগ্যতা
যদি কোনো ব্যক্তি হারাম উপার্জন দিয়ে কুরবানী করে, তবে তা সহীহ হবে না এবং আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। কেননা কুরবানীর জন্য পবিত্র ও হালাল সম্পদ জরুরি। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন:
"হারাম মাল দ্বারা কুরবানী বা সদকা কবুল হয় না।"
(ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫/৩৪৫)
তবে, যদি তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হয়, তবে তাকে হালাল উপার্জন দিয়ে কুরবানী করতে হবে। যদি কেবল হারাম টাকাই থাকে, তবে ঋণ (সুদ মুক্ত) নিয়েও কুরবানী করা উচিত, কারণ এটি ওয়াজিব।
প্রস্তাবিত সমাধান
১. তাওবা করুন এবং এই চাকরি থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসুন। আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করুন।
২. হালাল উপার্জনের জন্য চেষ্টা করুন। বিদেশে অনেক দেশে হালাল রেস্তোরাঁ বা অন্যান্য হালাল কাজের সুযোগ রয়েছে।
৩. আগের হারাম উপার্জন দিয়ে কুরবানী করবেন না। বরং, হালাল উপার্জন বা ঋণ নিয়ে কুরবানী করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক দান করুন এবং হারাম থেকে দূরে রাখুন। আমীন।
সূত্রঃ
- কুরআনুল কারীম (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮, সূরা আল-মায়েদা: ৩)
- সহীহ মুসলিম (২৩৪৬), সহীহ বুখারী (২০৫১)
- রদ্দুল মুহতার (৯/৪৫৮), ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (৫/৩৪৫)
- ফতোয়ায়ে উসমানী (২/২৪০)
- মাআরিফুল কুরআন (১/৪৫০-৪৫২)