গর্ভাবস্থায় মাংস বা তেল জাতীয় খাবার বাজার থেকে আনলে প্রথমে আগুনে সেঁক দেওয়া কি বিদাত হবে?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
১) আমি চাচীর সাথে থাকি। বাসায় আমরা দুইজনই মহিলা সদস্য আছি। চাচী গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে নানান কুসংস্কার মেনে চলে। উনাকে বোঝানোর পরও বোঝেনা যে এসব মানা ঠিকনা। নানান সময়ে বাসায় মাছ মাংস বা তেল জাতীয় খাবার আনা হলে উনি আমাকে বলেন এসব যেন আগুনে সেঁক দেই আগে।এসবে বিশ্বাস না থাকা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে আমার করতে হয়। এরকম কাজ করার ফলে কি আমার গুনাহ হচ্ছে? কিভাবে উনাকে বোঝাতে পারি?
২) কাউকে অপছন্দ করা বা কারো কাজকর্মে বিরক্ত হওয়া কি বিদ্বেষের অন্তর্ভুক্ত?
৩) যদি কাউকে মনে মনে অপছন্দ করি কিন্তু সামনাসামনি ভালো ব্যবহার করি এটা কি অনুচিত?
৪) জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিন কি কি আমল করা উত্তম।
৫) জিলহজ্জ মাসের ১০ দিন বাসার মহিলা সদস্য যারা কুরবানী দিবেন না তারা কি চুল, নখ কাটা থেকে বিরত থাকলে সওয়াব পাবেন?
Answer
উত্তর:
প্রশ্ন ১: কুসংস্কারমূলক কাজ করতে বাধ্য হলে গুনাহ হবে কি?
কুসংস্কার (যেমন খাবার আগুনে সেঁক দেওয়া) ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"لَا طِيَرَةَ وَالْفَأْلُ يُعْجِبُنِي"
"অশুভ লক্ষণ গ্রহণ করা (তিয়ারাহ) জায়েয নয়, তবে শুভ লক্ষণ (ফাল) পছন্দনীয়।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৭৫৪)
আপনি যদি এসবে বিশ্বাস না রেখে শুধু চাচীর অনুরোধে বাধ্য হয়ে কাজটি করেন, তাহলে আপনার গুনাহ হবে না, তবে এতে অংশগ্রহণ না করাই উচিত। কারণ আল্লাহ বলেন:
"وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ"
"সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সাহায্য করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
বোঝানোর উপায়:
- দলীলসহ কুসংস্কারের অপকারিতা বুঝান (যেমন: হাদীসে তিয়ারাহকে শিরক বলা হয়েছে- সুনান আবু দাউদ: ৩৯১০)।
- গর্ভাবস্থায় দুআ ও যিকিরের গুরুত্ব বোঝান, কুসংস্কার নয়।
- ধৈর্য ধরে বারবার বোঝান, প্রয়োজনে আলেমের সাহায্য নিন।
প্রশ্ন ২: কাউকে অপছন্দ করা বা তার কাজে বিরক্ত হওয়া কি বিদ্বেষ?
কাউকে তার পাপ বা অন্যায় কাজের জন্য অপছন্দ করা বিদ্বেষ নয়; বরং তা ঈমানের দাবি। তবে ব্যক্তিকে তার জাতি, বর্ণ, বা ব্যক্তিগত কারণে অকারণে ঘৃণা করা নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"لَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَحَاسَدُوا وَلَا تَدَابَرُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا"
"একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, হিংসা করো না, এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না; বরং আল্লাহর বান্দারা ভাই ভাই হয়ে যাও।" (সহীহ বুখারী: ৬০৬৫)
অতএব, কারো কাজের (যেমন কুসংস্কার) বিরক্তি প্রকাশ করা জায়েয, তবে অন্তরে ব্যক্তির প্রতি শত্রুতা না পোষণ করে তার সংশোধনের জন্য দুআ করা উচিত।
প্রশ্ন ৩: মনে মনে অপছন্দ করলেও সামনে ভালো ব্যবহার করা কি জায়েয?
হ্যাঁ, এটি জায়েয এবং উত্তম। ইসলাম সমাজে শান্তি বজায় রাখতে বাহ্যিক সুন্দর ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে। কুরআনে এসেছে:
"وَإِمَّا تُعْرِضَنَّ عَنْهُمُ ابْتِغَاءَ رَحْمَةٍ مِنْ رَبِّكَ تَرْجُوهَا فَقُلْ لَهُمْ قَوْلًا مَيْسُورًا"
"যদি তুমি তাদের থেকে (অর্থাভাবে) মুখ ফিরিয়ে নাও তোমার রবের রহমতের প্রতীক্ষায়, তবে তাদের সাথে নরম কথা বলো।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৮)
তবে মনে মনে অপছন্দ পোষণ না করে অন্তর পরিষ্কার করা উচিত। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: "মুমিনের অন্তর ও জিহ্বা এক হওয়া চাই।" (শু‘আবুল ঈমান: ৪৬৬২)
প্রশ্ন ৪: জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের উত্তম আমল কী কী?
জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ"
"এই দিনগুলোর (জিলহজ্জের ১০ দিন) মত নেক আমল আল্লাহর কাছে আর কোনো দিনই প্রিয় নয়।" (সহীহ বুখারী: ৯৬৯)
করণীয় আমল:
১. রোজা: বিশেষ করে ৯ই জিলহজ্জ (আরাফার দিন) রোজা রাখা।
২. তাকবীর: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
৩. অধিক পরিমাণে তাওবা ও ইস্তিগফার করা।
৪. কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, নফল নামাজ।
৫. কোরবানির পশু কিনলে তা যত্নে রাখা এবং তাকে কষ্ট না দেওয়া।
প্রশ্ন ৫: যে মহিলারা কুরবানী দেবেন না, তারা কি চুল-নখ কাটা থেকে বিরত থাকলে সওয়াব পাবেন?
যে ব্যক্তি কুরবানী করবেন, তার জন্য জিলহজ্জের চাঁদ ওঠার পর থেকে কুরবানী পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِذَا رَأَيْتُمْ هِلَالَ ذِي الْحِجَّةِ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلْيُمْسِكْ عَنْ شَعْرِهِ وَأَظْفَارِهِ"
"তোমরা যখন জিলহজ্জের চাঁদ দেখবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানীর ইচ্ছা করলে, সে যেন তার চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।" (সহীহ মুসলিম: ১৯৭৭)
যারা কুরবানী দেবেন না, তাদের জন্যও এটি মুস্তাহাব আমল (ফাতাওয়া শামী: ৬/৩২৬)। তবে এটি আবশ্যক নয়, তাই কাটতেও কোনো বাধা নেই।