ইস্তেখারা কতদিন পর্যন্ত পড়া যাবে? কাবিননামার ১৮ নং কলাম ও মোহরনা সংক্রান্ত।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
১. কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কাজটি সংগঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কী ইস্তেখারা চালিয়ে যাওয়া যাবে? বিয়ের বিষয়ে ইস্তেখারা করার পর উল্লেখযোগ্য কোনো স্বপ্ন দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। তবে পাত্রের বিষয়ে খোঁজ নিতে পারার কাজটি সহজ হয়েছিল এবং পজিটিভ ফিডব্যাক পেয়েছি আমরা আলহামদুলিল্লাহ। এখন আমরা একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। তবে বিয়ে সংগঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কী ইস্তেখারা কন্টিনিউ করা যাবে?
২. বিয়ের মোহরনা ছেলের সামর্থ্য ও মেয়ের মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার দিকে লক্ষ্য রাখার কথা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে মোহরনার পরিমাণ কেমন হবে তা কী শুরুতে মেয়ে পক্ষের দাবি করাটা সুন্নাহসম্মত? নাকি আগে ছেলে অফার করবে এরপর মেয়ে/ মেয়েপক্ষ থেকে কম-বেশি দাবি করা উচিত? মানে এপ্রোচটা কীভাবে হলে সুন্দর হবে সেটাই জানতে চাচ্ছিলাম।
৩. কাবিননামার ১৮ নং কলামে স্বামী যদি স্ত্রীকে নিজের ওপর তালাক নিতে পারার অধিকার দিতে সম্মত হয় সেক্ষেত্রে স্বামী ২য় বিয়ে করলে স্ত্রী চাইলে তালাক নিতে পারবে, এই শর্ত দেওয়া কী শরীয়াসম্মত হবে? পাশাপাশি আর কী কী বিষয় শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে? শর্তের বিষয়গুলোই বা কীভাবে পাত্রপক্ষের নিকট উপস্থাপন করলে তা উভয়পক্ষের জন্যই সম্মানজনক হবে? এ বিষয়ে একটু বিস্তারিত জানতে চাচ্ছিলাম।
জাযাকাল্লাহু খইরন।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নে দেওয়া হলো। প্রতিটি উত্তরে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে দলিল পেশ করা হয়েছে।
১. ইস্তেখারা কতদিন পর্যন্ত পড়া যাবে?
উত্তর:
ইস্তেখারা হলো কোনো বৈধ কাজ শুরু করার পূর্বে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া। আপনি যখন ইস্তেখারা করার পর কাজটি সহজ হয়েছে, পজিটিভ ফিডব্যাক এসেছে এবং আপনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, তখন আর ইস্তেখারা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং এখন তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা) করে কাজটি সম্পন্ন করার জন্য এগিয়ে যাওয়া উচিত।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইস্তেখারা শিখিয়ে বলতেন:
«إِذَا هَمَّ أَحَدُكُمْ بِالْأَمْرِ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ... ثُمَّ لِيَقُلْ...»
(যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করে, তখন সে যেন দু’রাকাত নামায পড়ে... তারপর দোয়া করে...) (বুখারী, হাদীস: ১১৬২)
ইস্তেখারা করার পর যদি অন্তর কোনো একদিকে ঝুঁকে যায় বা কাজ সহজ হয়, তাহলে সেটাই ইস্তেখারার ফল। পুনরায় ইস্তেখারা করার প্রয়োজন নেই। তবে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও সংশয় থাকে, তাহলে আবার করা যেতে পারে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, তাই বর্তমানে ইস্তেখারা চালিয়ে না যাওয়াই উত্তম।
হানাফী কিতাব:
- ফাতাওয়া উসমানী (২/২৬৬)
- বাহিশতী জেওয়ার (২/২২) – “ইস্তেখারা করার পর যদি কাজটি সহজ হয় এবং অন্তর সায় দেয়, তাহলে বুঝতে হবে তাতে কল্যাণ আছে। আর যদি বাধা আসে, তাহলে তা পরিত্যাগ করা উচিত।”
২. মোহরানার পরিমাণ নির্ধারণ: মেয়েপক্ষের দাবি করা সুন্নাহসম্মত কি?
উত্তর:
মোহরানা (মহর) স্ত্রীর অধিকার। এটি নির্ধারণ করার পদ্ধতি শরীয়তে এমন:
ক) ছেলের উচিত প্রথমে অফার করা – এটি সুন্নাহ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর কন্যাদের বিয়েতে মোহরানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। (মুসলিম, হাদীস: ১৪২৬)
খ) মেয়েপক্ষের অধিকার – তারা ছেলের অফার শুনে তা গ্রহণ বা কম-বেশি করতে পারে। সরাসরি দাবি করাও জায়েয, তবে উত্তম হলো প্রথমে ছেলে অফার করুক, তারপর মেয়েপক্ষ সেই অনুযায়ী কথা বলুক।
গ) সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি – মোহরানা নির্ধারণে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা জরুরি:
- ছেলের আর্থিক সামর্থ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া।
- মেয়ের মর্যাদা ও পরিবারের অবস্থানের প্রতি লক্ষ্য রাখা।
- অত্যন্ত বাড়াবাড়ি না করা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: «إِنَّ أَعْظَمَ النِّكَاحِ بَرَكَةً أَيْسَرُهُ مُؤْنَةً» (নিশ্চয়ই সবচেয়ে বেশি বরকতময় বিয়ে সেই যাতে কম খরচ হয়) (মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ২৪৬৯১)
হানাফী কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (৩/৯৯) – “মোহরানা নির্ধারণে ছেলের সামর্থ্য ও মেয়ের মর্যাদা বিবেচনা করা সুন্নাহ।”
- ফাতাওয়া আলমগীরী (১/৩০২) – “মোহরানা নির্ধারণে উভয় পক্ষের সম্মতি জরুরি; তবে উত্তম হলো ছেলে প্রথমে অফার করবে।”
উপসংহার:
সুন্নাহ অনুযায়ী ছেলের উচিত প্রথমে মোহরানার প্রস্তাব দেওয়া। তবে মেয়েপক্ষ ইচ্ছা করলে নিজেদের পক্ষ থেকে একটি সম্মানজনক প্রস্তাব রাখতে পারে। এতে কোনো দোষ নেই। তবে অতিরিক্ত দাবি বা কম-বেশি নিয়ে মনোমালিন্য না করাই ভালো।
৩. কাবিননামার ১৮ নং কলাম: শর্ত দেওয়া কি শরীয়াসম্মত? এবং কীভাবে উপস্থাপন করবেন?
ক. ১৮ নং কলামের শর্ত: দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রী তালাক নিতে পারবে—এটা কি জায়েয?
উত্তর:
হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, বিয়ের চুক্তিতে এ ধরনের শর্ত (যে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রী নিজেকে তালাক দিতে পারবে) জায়েয নয়। কারণ তালাক দেওয়ার মালিকানা স্বামীর। স্ত্রী নিজে নিজেকে তালাক দিতে পারে না, যদি না স্বামী তাকে এ অধিকার দেয় (তাওফীয)। তবে এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, “শর্ত” হিসেবে বিবাহনামায় লেখা হচ্ছে—এটি একটি শর্তারোপিত তালাক (তা’লীকী তালাক)।
-
হানাফী ফিকহে শর্তযুক্ত তালাকের বিধান: স্বামী যদি বলে, “যদি আমি দ্বিতীয় বিয়ে করি, তাহলে আমার স্ত্রী তালাক,” তবে তা একটি সাসপেন্ডেড তালাক (তা’লীকী তালাক), যা শর্ত পূরণ হলে কার্যকর হবে। কিন্তু এটি বিবাহের চুক্তির শর্ত হিসেবে ধার্য করলে চুক্তিটি সহীহ হলেও শর্তটি অকার্যকর হবে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, বিবাহের চুক্তিতে এমন শর্ত রাখা যা বিবাহের উদ্দেশ্যের বিপরীত (যেমন: স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়া) সে শর্ত বাতিল, তবে বিবাহ সহীহ থাকবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/১১১)
-
ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: “যদি স্বামী নিজে নিজের ইচ্ছায় স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেয় (তাওফীয), তবে তা জায়েয। কিন্তু বিবাহের সময় শর্ত হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া বা স্ত্রীর জন্য তা বাধ্যতামূলক করা জায়েয নয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/১১২)
তবে আধুনিক ফিকহী গ্রন্থে (যেমন ফাতাওয়া উসমানী) উল্লেখ আছে যে, স্ত্রীর স্বার্থ রক্ষায় যদি স্বামী সন্তুষ্টচিত্তে বিবাহপত্রে এ শর্ত লিখে দেয়, তাহলে তা বৈধ বলে গণ্য হতে পারে। তবে এটি হানাফী মাযহাবের মূলনীতি থেকে ব্যতিক্রম। সাধারণ মুসলমানদের জন্য উত্তম হলো, এ ধরনের জটিল শর্ত এড়িয়ে যাওয়া। পরিবর্তে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বুঝাপড়া করা।
খ. আর কী কী শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা যাবে?
নিম্নোক্ত শর্তগুলো হানাফী ফিকহ অনুসারে বৈধ:
- স্বামী স্ত্রীকে পৃথক আবাসন দেবে।
- স্বামী নির্দিষ্ট পরিমাণ খোরপোষ দেবে।
- স্বামী অন্য বিবাহ করলে স্ত্রীকে পৃথক থাকার অধিকার থাকবে (তবে তালাকের অধিকার নয়)।
- স্ত্রী চাইলে পড়াশোনা বা চাকরি করতে পারবে (যদি তা শরীয়তের পরিপন্থী না হয়)।
অবৈধ শর্ত:
- স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়া (উপরের আলোচনা অনুযায়ী)।
- স্বামীকে কোনো হারাম কাজ করতে বাধ্য করা।
- মোহরানা না দেওয়ার শর্ত।
গ. কীভাবে পাত্রপক্ষের কাছে শর্ত উপস্থাপন করবেন?
শর্তগুলো উপস্থাপনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পদ্ধতি অবলম্বন করলে উভয় পক্ষের জন্য সম্মানজনক হবে:
- ভদ্রতা ও নম্রতা বজায় রাখা – শুরুতে ভালোবাসা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করুন।
- শরীয়তের গুরুত্ব বোঝানো – বলুন, “আমরা ইসলামী বিধান অনুযায়ী একটি সুন্দর বিবাহ চাই। কিছু শর্ত আছে যা আমাদের পারিবারিক শান্তির জন্য প্রয়োজন।”
- একতরফা না করে পারস্পরিক আলোচনা – শুধু মেয়েপক্ষের দাবি না করে ছেলের মতামতও নিন।
- লিখিত আকারে দেওয়া – বিয়ের আগে একটি প্রস্তাবপত্র তৈরি করে দেওয়া ভালো, যাতে পরে কোনো ভুল বোঝাবুঝি না হয়।
- নরম ভাষা ব্যবহার – যেমন: “আমরা আশা করি আপনারা আমাদের এ অনুরোধটি বিবেচনা করবেন। এটি আমাদের মেয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য।”
উত্তম পদ্ধতি: সরাসরি শর্ত না করে বরং কথোপকথনের মাধ্যমে এ বিষয়গুলো বোঝানো। যেমন: “আমরা চাই আমাদের মেয়ে যেন দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধায় না পড়ে। আপনি কী মনে করেন?” এতে করে শর্তের পরিবর্তে একটি চুক্তির রূপ নেয়।
সারসংক্ষেপ:
- ইস্তেখারা করার পর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে আর পুনরায় করার প্রয়োজন নেই; তাওয়াক্কুল করে এগিয়ে যান।
- মোহরানায় ছেলের প্রথম অফার করাই সুন্নাহ; মেয়েপক্ষ কম-বেশি করতে পারে। অতিরিক্ত দাবি না করাই ভালো।
- ১৮ নং কলামের শর্ত (দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রীর তালাকের অধিকার) হানাফী মতে জায়েয নয়। বরং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে শর্তহীন বিবাহ করাই উত্তম। প্রয়োজনে বৈধ শর্ত (যেমন পৃথক আবাসন, খোরপোষ) রাখা যেতে পারে, তবে তা সম্মানের সাথে উপস্থাপন করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার বিবাহকে বরকতময় করুন। আমীন।
জাযাকাল্লাহু খইরন।