বাবা মা ছাড়া বিয়ে সহীহ হয় কি না?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেবগণ,
আমার মামা শশুরের মেয়ে বয়স ১৭, সে এক মাস আগে এক ছেলের সাথে ঢাকা পালিয়ে যায় বাবা মা কে না বলেই।
প্রায় ৮-১০ দিন পরে তাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়, মেয়ে বাবা মামলা করার পরে। এতোদিন তারা একসাথেই ছিলো ঢাকায়।
তো মেয়ের ভাষ্য অনুযায়ী তারা বিয়ের রেজিষ্ট্রি করছে প্রচলিত আইন অনুযায়ী। যদিও প্রচলিত আইনে মেয়ের ১৮ বছরের নিছে বিয়ে হয় না। এখানেও সেই ছেলে ধোঁকাবাজির সাহায্য নিছে৷
মেয়েকে আমরা প্রশ্ন করি তোমাকে কি এভাবে বলছিলো যে, ওমুক ছেলের সাথে এতো টাকা মোহরানার বিনিময়ে তোমার কাছে বিবাহের প্রস্তাব করছি তখন কি তুমি কবুল বলছিলা?
তার উত্তর ছিলো হ্যা এভাবে তাকে ইজাব দেয়া হইছে এবং সে কবুল করছে।
এখন আমাদের প্রশ্ন হলো তারা যে এভাবে যে বিয়ে করেছে মেয়ের অভিভাবক ছাড়াই তাই এই বিয়ে কি সহীহ হয়েছে হানাফি ফিকহ অনুসারে?
যদি সহীহ হয় তাহলে আমাদের কিভাবে তালাক নিতে পারি এবং ইদ্দত পালন করতে মেয়েকে তাকিদ দিতে পারি? দয়া করে জানাবেন।
উল্লেখ্য যে ঐ ছেলের হাতে আমরা কখনোই বিয়ে দিবো না তার আরো অনেক খরাপ রেকর্ডের কারণে। আর তালাক তার কাছে চাইলে নাও দিতে পারে।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনায় মেয়েটির বয়স ১৭ বছর এবং সে নিজেই ইজাব-কবুলের মাধ্যমে বিয়ে করেছে। হানাফি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগা) ও সুস্থ মেয়ে যদি নিজের পছন্দমতো কারো সাথে বিয়ে করে এবং ইজাব-কবুল সঠিকভাবে হয়, তাহলে সেই বিয়ে সহীহ (শুদ্ধ) হয়—এমনকি অভিভাবকের (ওয়ালির) অনুমতি না থাকলেও। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, বালেগা মেয়ের নিজের বিয়ে করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কেবল ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে অভিভাবকের অনুমতি শর্ত, তবে হানাফি ফিকহে ইমাম আবু হানিফার মতই অগ্রগণ্য ও আমলযোগ্য।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (৪/২৯):
"المرأة البالغة العاقلة إذا زوجت نفسها من كفء صح النكاح وإن لم يرض الولي"
(অর্থ: প্রাপ্তবয়স্কা ও সুস্থ মেয়ে যদি নিজেকে সমকক্ষ/কুফু-এর সাথে বিয়ে দেয়, তবে অভিভাবকের অমতেও বিয়ে সহীহ হবে।) - ফাতাওয়া উসমানি (২/২৯২):
"بكر بالغة عاقلة إذا زوجت نفسها من كفء صح النكاح عند الإمام أبي حنيفة خلافاً للصاحبين" - ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৯৩):
এ বিষয়ে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতই প্রাধান্যপ্রাপ্ত।
বর্তমান প্রসঙ্গে:
যেহেতু মেয়েটি বালেগা (১৭ বছর বয়সী) এবং সে স্পষ্টভাবে ইজাব-কবুলের কথা স্বীকার করেছে এবং মোহরানাও নির্ধারিত হয়েছে, তাই বিয়ে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী সহীহ হয়েছে। তবে ছেলেটির চরিত্র ও ধোঁকাবাজি থাকায় এ বিয়ে ফাসখ (বাতিল) করার আবেদন ইসলামি সালিশি আদালত বা কাজীর মাধ্যমে করা যেতে পারে।
তালাক ও ইদ্দত পালনের পদ্ধতি:
-
তালাক:
- যেহেতু বিয়ে সহীহ হয়েছে, তাই তালাক দেওয়ার অধিকার স্বামীর (ছেলেটির) আছে। সে তালাক দিলে মেয়েটি ইদ্দত পালন করবে।
- যদি সে তালাক না দেয়, তাহলে মেয়ের পরিবার কাজী বা ইসলামি সালিশি আদালতের মাধ্যমে ফাসখ (বিয়ে ভঙ্গ) করাতে পারবেন। কারণ ছেলেটি ধোঁকাবাজ ও অসৎ চরিত্রের—এটি ‘নফস ও খুশুনাত’ (অত্যাচার ও প্রতারণা)-এর অন্তর্ভুক্ত।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৪৭):
"إذا ثبت سوء العشرة والفسق الشديد فللقاضي أن يفسخ النكاح"
(অর্থ: যদি স্বামীর দুর্ব্যবহার ও গুরুতর পাপাচার প্রমাণিত হয়, তাহলে কাজী বিয়ে ফাসখ করতে পারেন।)
-
ইদ্দত:
- তালাক বা ফাসখের পর মেয়েটিকে তিন হায়েজ (মাসিক) পর্যন্ত ইদ্দত পালন করতে হবে। যদি সে গর্ভবতী হয়, তাহলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত ইদ্দত।
- সূরা বাকারা (২:২৮):
"وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ"
(অর্থ: তালাকপ্রাপ্তা নারীরা নিজেদেরকে তিন হায়েজ পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখবে।) - ফাতাওয়া শামী (৩/৫১৪):
ইদ্দতের বিস্তারিত বর্ণনা আছে।
সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা:
১. মেয়েটিকে বোঝান, বর্তমানে বিয়ে সহীহ হয়েছে, তাই সে এখন ওই ছেলেটির স্ত্রী।
২. ছেলেটিকে তালাক দিতে বলা হোক। যদি না দেয়, তাহলে স্থানীয় কাজী বা ইসলামি সালিশি আদালতে ফাসখের জন্য আবেদন করুন।
৩. ফাসখ বা তালাকের পর মেয়েটি তিন মাসিক পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে এবং ইদ্দত চলাকালে অন্য কোথাও বিয়ে করতে পারবে না।
মন্তব্য: ধোঁকাবাজি ও অপরাধমূলক কাজের জন্য প্রশাসনিক আইনেও অভিযোগ করতে পারেন। তবে ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ে সহীহ হলেও, পারিবারিক কল্যাণের জন্য ফাসখের পথই উত্তম।
ওয়াল্লাহু তা‘আলা আ‘লাম।