স্বামী অত্যাচার করলে স্ত্রী কী করবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
স্বামীর সাথে থাকতে যদি আনসেফ ফীল হয়, বিয়ের পর পাওয়ার থেকে বেশি হারানো হয়, এবং দিনের পর দিন অসুস্থ হয়েই যায়, এমন ভাবে ম্যানিপুলেশন করে যেনো সবসময় সব দোষ স্ত্রীর, এবং ডিভোর্স দেয় না বলে দয়া দেখাচ্ছে, অথচ তার সুবিধা মতো ইউজ করে, ভালো না লাগলে ফ্রাস্ট্রেশন ঝড়ে, গালি দেয়, মেন্টালি টর্চার করে এক পর্যায়ে গায়ে হাত তুলে।
অন্যায় তো বিয়ের দিন থেকেই করা হয়েছিল, সেসব তো আলোচনা তুললাম ই না। সেগুলা বললে তো আর কাহিনী। এত তো ধৈর্য ধরলাম 2 বছর।
এভাবে চলবে তবুও ধৈর্যের নামে স্ত্রীকেই কষ্ট পেতে হবে? স্ত্রীর অসুস্থ হয়ে যায়, পড়াশোনা করতে পারে না, অথচ কথা শুনতে হয় ঘরের মধ্যে থাকো, কি করো? পড়াশোনাও তো কিছু দেখাতে পারলে না? আমাদের একসাথে থাকা হবে না, চাকরি করে নিজের মতো থাকো?
কেনো স্ত্রীর কি ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার নেই? সময় পাওয়ার অধিকার নেই? সারাক্ষণ তো স্বামী তার মা বোন এর সাথেই সময় কাটায়, বড় ভাই পর্যন্ত তার স্ত্রী চাকরি করবে, মায়ের ভাত রাঁধবে এসব অর্ডার করে। অথচ স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কোয়ালিটি সময় কাটাতে কেউ দেয় না। স্বামী কোনো ক্ষেত্রে তার মা বাবা ভাই এর কোনোই দোষ দেখতে পারে না। নতুন বউ নিয়ে গিয়ে তার মা বড় ভাই মিলে সবার সামনে টক অপমান করে, সে গাইরত হীন পুরুষের মতো চুপ করে থাকে।
বিয়ের দিন আমি রাজি ছিলাম না, আমার সাথে আলোচনা না করে দেন মোহর তার বাপ ঠিক করেছে সামান্য। ঠিক আছে, এরপর বরযাত্রী বাড়িয়ে আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করা, বিয়েতে একটা শাড়ি পর্যন্ত দেয় নী। তারা অযথা বরযাত্রীর আয়োজন বাড়াতে বলেছে, তারা আত্মীয় নিয়েও আসে নাই, করো সাথে তাদের সম্পর্ক ভালো না । সেই যে বিয়েতে খবর অপচয় হলো, এভাবে স্ত্রীর বাবার বাড়ির থেকেই সব করতে হবে, জমায় কে খাওয়াতে হবে, স্বামী স্ত্রী পড়াশোনা করে দুজন, কিন্তু একসাথে ছুটিতে আসলে খবর থেকে জানা কাপড় সব মেয়ের বাবার বাড়ির লোকের দেয়া লাগে, মেয়ে তো তার বাবা মা দেখছেই। এরপর ও বেয়াই বেআইন এর দাওয়াত, তাদের খাওয়ানো, জামা কাপড় দেয়া সব এক তরফা। ছেলের মা কোনোদিন বৌমা কে কল দিয়ে কোথাও বলে না, ছেলে তার বাড়ি নিয়ে গেলে থাকার ঘর দেয় না, ভালো ব্যবহার করে না।
সব ঘটনা এত টুকু পরিসরে বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। প্রয়োজন হলে পরে জানানো হবে।
তবে এগুলো কি অন্যায় হচ্ছে না? আমি এভাবে বিয়ে করতে চাই নী, পুরো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ আর নির্দেশ অনুযায়ী বিয়ে করতে চেয়েছি। কিন্তু হেলের বাড়ির সবাই অনেক অহংকারী, নিজের মুখে বলে কারো পাতে ভাত দেয় না, ছেলের বউ, আর তার বাবা মা কে দাম ই দেয় না। উল্টা ছোট করে। ছেলের বউ এর সাথে আলাদা ঘুরতে যেতে পারে না হয় মা নাহয় বোন কে সাথে নিবেই। সে তো স্ত্রীর কোনো হোক আদায় করে না, কিচ্ছু দেয় না, তবুও মেনে নেয়া হয়েছে ঠিক আছে চাকরি পাক দেখা যাবে। কিন্তু স্ত্রীর মা টাকা দিলে সেটা ভাই বোনের পিছনে খরচ করে, বৃত্তির টাকা পেলে বাবা মা কে দিয়ে দেয় স্ত্রী কে তারা কোনোদিন কিচ্ছু দেয় না। উল্টা স্ত্রীর বাবা মা এর অবস্থাও খুব ভালো না, স্ত্রীর মা চাকরি করে একা, বয়স ও হয়েছে, অথচ টাকা পয়সার খরচ ও করায়, গায়ে খাটনিও করায়। ছেলের বউ কে পড়াশোনা সেইচএস করে চাকরি করতে হবে এই বলে দিয়েছে, অথচ স্ত্রী চাকরি করতে চায় না। স্বামী ও প্র্যাকটিসিং দেখেই বিয়ে করেছিল, কিন্তু এখন দেখছে স্বামী তার মা আর বড় ভাইয়ের কোথায় ওঠে বসে, তারা অনেক টা দুনিয়ার পিছনে ছোট, ছেলের বড় ভাই বিদেশে থাকে, তারা সেসব মডার্ন লাইফস্টাইল ফলো করে।
এই ভাবে মানিয়ে নেয় যাচ্ছে না। অনেকতা কুফুও মেলে নী, পড়াশোনা দেখে, সবার মুখে ছেলে ভালো শুনে বিয়ে তো দিয়ে দিয়েছে। কালচারে মেলে না, ছেলের বাড়ির লোক জনের খুবই গ্রাম্য ছোট মন, খোঁচা মেরে কথা বলা, কোনো অধিকার না দেয়া, ছেলের বউ মানে কাজের লোক এই ধরনের মানসিকতা।
ছেলের বিয়েও তারা দিতে চায় নী, চাকরি করে তার টাকায় খাবে তার আগ পর্যন্ত। সব স্ত্রীর বাবা মা এর উদ্যোগে, তাদের খরচে হয়েছে ।
এর পর ও স্ত্রী সুখী না,সে কখনও তার প্রয়োজনে, চাহিদা মেটাতে স্বামী কে কাছে পায় না। ছেলে মা হুমকি দিয়ে রেখেছে একসাথে থাকলে ছেলের কোনো খরচ তারা দেবে না, পড়াশোনা একা একাই শেষ করতে হবে।
এরকম নানা মানসিক অশান্তি তে স্ত্রী অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে।
তবুও কি চুপ করে সব মেনে নেয়ায় ইসলাম এর নিয়ম,? স্বামী বদরাগী, চিন্তা ভাবনা কম করে, মায়ের কথা শুনে চলে। তার মা বিয়ের আগেই বলেছি তার ছেলের মাথায় একটু সমসসা আছে, সেটা এত বেশি আর ডাক্তার দেখানোর পর্যায়ে তবুও গোঁড়ামি করে স্ত্রীর উপর অত্যাচার করবে তবুও নিজের দোষ স্বীকার করবে না, নিজের যে সমস্যা আছে মানবে না।
এভাবে স্ত্রী আর থাকতে পারছে না। কিছু স্ত্রীর নারী থেকেও জোর করছে, কারণ এতে পরিবারের মান সম্মান রয়েছে।
স্ত্রী খুবই ডিপ্রেশনে ভুগছে, সব কিছুতে অশান্তি, শারীরিক ভাবেও অসুস্থ হয়ে গেছে। সবাই তাকেই দোষারোপ করছে, মেনে নিতে বলছে। কারণ জামায় কে কেউ বুঝাতে যাবে না। ওদিকে স্বামী হুমকি দেয় এভাবে থাকলে থাক, নাহলে নিজে তালাক চেয়ে আবেদন কর, তোর বাড়ির লোকেদের বল। কারণ সে জানে স্ত্রী একা কিছুই করতে পারবে না। আর স্বামী নিজে ডিভোর্স দেবে না কারণ তাতে তাকে ঝামেলা করতে হবে। বিয়ের সময় ও একটা কিচ্ছু করে নী সে বা তার পরিবার, শুধু এসে খেয়ে গেছে।
এসব আগে থেকে বুঝা যায় নী, এখন কোনো ভাবে স্বামীর সাথে মানিয়ে থাকা যাচ্ছে না। তাকে বুঝিয়ে শান্তিতে থাকা যায় না ইসলামিক বই কিছু জোগাড় করে দেয়া হয়েছে, রাসূল সা এর সংসার জীবনের আলোচনা, সীরাত পড়তে দেয় হয়েছে সে পড়বে না। ফ্রী সময় মোবাইল গেম খেলে সারাদিন শুয়ে শুয়ে, কথা শোনা না, মানা করলেও গান শোনে, ফেসবুক দেখে এমন কিছু সময়। এমনকি স্ত্রী নামাজ পড়লেও থামে না। এমনিতে সে বাইরে বাইরে দেখায় খুব ধার্মিক, খুব কড়া। কিন্তু স্ত্রীর সাথে এরকম।
স্ত্রী এখন কি করতে পারে। তার সাথে মানিয়ে নেবার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। রাগের মাথায় স্ত্রীর সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে আর বলে এগুলা তো কিছুই না আর খারাপ অপেক্ষা করছে। আর পরে অনুতপ্তও হয় না, ইয়ার্কি করে উড়িয়ে দেয় বলে এসব নিয়ে এখনও ভাবার কি আছে? স্ত্রীর মন বোঝে না, অথচ সবসময় মা এর সাথে গল্প করা, না এর কথা বলা এসব ব্যস্ত কোনো কাজ ও করতে চায় না পড়াশোনা করে বলে।অথচ বাড়ি আসলে সব কিছুতে স্ত্রী কে হুকুম করে। এত কিছুর পর ও বলবে স্ত্রী কথা শোন আন, বেয়াদব, কোনো কাজের না, আবর্জনা, আরো কত খারাপ খারাপ গালি, স্ত্রী বাবা মা কে পর্যন্ত মিথ্যা অপবাদে দেয়। অকারণে।
এত কিছু হবার পর স্ত্রীর মন খারাপ থাকবে স্বাভাবিক, তাতেও স্ত্রীর দোষ, স্ত্রীর নাকি সবসময় এমন খারাপ থেকে, মন ফ্রেশ না, বেশি চিন্তা করে বলে বিশেষ সময়ে তার সাথে সহযোগিতা করতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে স্ত্রী এসব মেনে নিতে পারছে না আর। স্ত্রী খুব ভালোবাসতো তাকে, এখন একেবারে ভালোবাসতে পারছে না, সব বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে।
এরকম টক্সিক সম্পর্ক কে থাকার অথবা বের হওয়ার উপায় কি? ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো কি ঠিক? একজন নারী এগুলো মেনে নিতে বাধ্য? আমি তালাক চাইলেও সে দিবে না এবং সম্মানের ভয়ে আমার পরিবার রাজি না। যেহেতু আমি অলরেডি অনেক বেশি অত্যাচারিত হয়েছে, সব সময় স্বামী এবং স্বামীর পরিবার দ্বারা অন্যায়ের শিকার হয়েছি, যদি কখনো তালাক হয় ও দেনমোহরের টাকা আমি কেন ফেরত দেবো? সেই তো আমাকে বাধ্য করছে তালাক দিতে আমি তো ভালোবেসে তার সাথেই থাকতে চেয়েছি সব সময়। এখনো চাই কিন্তু সে কোন পরিবর্তন করতে রাজি না নিজের।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
প্রশ্নের বিবরণে আপনার (স্ত্রীর) প্রতি স্বামী ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে যে নির্যাতন, অবহেলা, মানসিক অত্যাচার, গালিগালাজ, হাত তোলা, এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের কথা বলা হয়েছে—তা ইসলামী দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অন্যায় ও হারাম। ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই সদাচার, ভালোবাসা, সহানুভূতি ও ইনসাফের নির্দেশ দিয়েছে। নিচে ধাপে ধাপে উত্তর দেওয়া হলো।
১. ইসলামে স্বামীর কর্তব্য ও স্ত্রীর অধিকার
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“আর তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার করো।” (সূরা নিসা ৪:১৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
استوصوا بالنساء خيرا
“নারীদের সম্পর্কে কল্যাণের ওসিয়ত করো।” (বুখারি, মুসলিম)
স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকারসমূহের মধ্যে রয়েছে:
• সদয় ও সম্মানজনক ব্যবহার
• ভরণপোষণ (খোরপোশ)
• ভালোবাসা ও সময় দেওয়া
• শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন না করা
• স্ত্রীর পরিবারের প্রতি সম্মান
আপনার বর্ণনায় স্বামী এসব কোনো অধিকারই আদায় করছে না; বরং তিনি অপমান, গালি, ফ্রাস্ট্রেশন প্রকাশ, মেন্টাল টর্চার এবং একপর্যায়ে শারীরিক নির্যাতনও করছেন। এটি সুস্পষ্ট জুলুম (অত্যাচার), যা ইসলাম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
“নিজের বা অন্যের কোনো ক্ষতি করা জায়েজ নয়।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৩৪১; মুয়াত্তা মালিক)
২. ধৈর্যের নামে নির্যাতন সহ্য করা কি জরুরি?
ইসলাম ধৈর্যের নির্দেশ দিলেও তা অন্যায় ও অত্যাচার সহ্য করার নাম নয়। স্ত্রী যদি তার স্বামীর অত্যাচারে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে তার জন্য ধৈর্য ধরা ওয়াজিব নয়; বরং সে নিজেকে রক্ষার জন্য ব্যবস্থা নিতে পারে।
ফকিহগণ বলেন: কোনো নারী যদি তার স্বামীর অত্যাচার বা দুর্ব্যবহারের কারণে তার সাথে বসবাস করা কঠিন মনে করে, তাহলে সে তালাক বা খুলা চাইতে পারে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৫৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪৪১)
উপসংহার: আপনার স্ত্রীকে বাধ্য হয়ে এভাবে কষ্ট সহ্য করতে হবে না। ধৈর্যের অর্থ অত্যাচার মেনে নেওয়া নয়, বরং আল্লাহর বিধানের ওপর স্থির থাকা এবং হালাল উপায়ে সমাধান করা।
৩. সমাধানের ধাপসমূহ
ক. পরিবার ও সমাজের মধ্যস্থতা
প্রথমে উভয় পরিবারের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ বা স্থানীয় আলেম-মাশায়েখের মাধ্যমে স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করা উচিত। কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا
“যদি তোমরা তাদের মধ্যে বিবাদের আশঙ্কা করো, তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত করো।” (সূরা নিসা ৪:৩৫)
খ. বিচ্ছেদের ব্যবস্থা
যদি সব চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং স্বামী পরিবর্তন না করে, তাহলে স্ত্রীর জন্য আইনসম্মত খুলা বা তালাকের পথ খোলা।
খুলা (Khula):
খুলা হলো স্ত্রীর পক্ষ থেকে মোহর বা কিছু অর্থের বিনিময়ে তালাক নেওয়া। হানাফি মাজহাব অনুসারে, স্ত্রী যদি স্বামীকে অপছন্দ করে এবং তার সাথে বসবাস করা সম্ভব না হয়, তাহলে সে মোহর ফিরিয়ে দিয়ে খুলা নিতে পারে। (আল হিদায়া, ২/২৯০; রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৫৫)
কাযি কর্তৃক ফাসখ (Faskh):
যদি স্বামী অত্যাচারী হয়, ভরণপোষণ না দেয়, বা শারীরিক নির্যাতন করে, তাহলে স্ত্রী ইসলামি আদালত বা কাযির কাছে ফাসখের (বিবাহ বিচ্ছেদ) আবেদন করতে পারেন। হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ ফতোয়া অনুযায়ী, নির্যাতনের কারণে স্ত্রী ফাসখের অধিকার রাখে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪৪০; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৪৫)
৪. দেনমোহর ফেরত দেওয়া প্রসঙ্গে
আপনি প্রশ্নে বলেছেন, “যদি কখনো তালাক হয় ও দেনমোহরের টাকা আমি কেন ফেরত দেবো?”
ইসলামী আইন অনুসারে:
- যদি স্ত্রী নিজে খুলা নেয় (অর্থাৎ স্বামীর দোষ না থাকা সত্ত্বেও সে তালাক চায়), তাহলে সাধারণত তাকে দেনমোহর ফেরত দিতে হয়।
- কিন্তু আপনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে স্বামী অত্যাচারী, তার ওয়াজিব কর্তব্য পালন করেনি, এবং আপনাকে থাকতে দিচ্ছে না—তাহলে আপনি ফাসখের জন্য আবেদন করতে পারেন। ফাসখের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে দেনমোহর ফেরত দিতে হয় না, কারণ এখানে বিচ্ছেদ স্বামীর দোষের কারণে হচ্ছে।
- হানাফি ফিকহের একটি মূলনীতি:
“الخلع مع الظلم لا يجب رد المهر”
“যখন খুলা অত্যাচারের কারণে হয়, তখন মোহর ফেরত দেওয়া ওয়াজিব নয়।” (ফাতাওয়া কাযী খান, ১/৪৭২; রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৫৮)
তাই আপনার স্ত্রী দেনমোহর ফেরত দিতে বাধ্য নন, যদি তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে স্বামীর অত্যাচার ও ত্রুটির কারণেই তিনি বিচ্ছেদ চাচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন অভিজ্ঞ আলেম বা মুফতির সাথে পরামর্শ করা জরুরি।
৫. স্ত্রীর মানসিক ও শারীরিক অবস্থা
স্ত্রী যদি এতটাই ডিপ্রেশনে ভোগেন যে তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না, তাহলে তাঁর জন্য বিচ্ছেদ নেওয়া আরও জরুরি হয়ে পড়ে। ইসলাম জীবন ও স্বাস্থ্যের উপর অত্যাচার পছন্দ করে না। সহিহ বুখারিতে আছে:
لا ضرر ولا ضرار
(পূর্বোক্ত)
অর্থাৎ কোনো অবস্থাতেই নিজের বা অন্যের ক্ষতি করা জায়েজ নয়। স্ত্রী যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন কিন্তু চুপ করে থাকেন, তা ইসলাম সমর্থন করে না।
৬. ব্যবহারিক পরামর্শ
- আপনার পরিবারের সদস্যদের সাথে খোলামেলা কথা বলুন। সম্মানের ভয়ে থেকে অত্যাচার সহ্য না করে অভিভাবকদের বাস্তবতা জানান।
- স্থানীয় আলেম, ইমাম বা ইসলামি সেন্টারে যোগাযোগ করুন। তাঁরাই স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন অথবা আইনি ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করবেন।
- স্বামীকে শেষবারের মতো ইসলামি দৃষ্টিতে বোঝানোর চেষ্টা করুন। তবে তিনি যদি সীরাত, ইসলামি বই বা নামাজেও উদাসীন থাকেন, তাহলে আশা করা কঠিন।
- খুলা বা ফাসখের জন্য প্রস্তুতি নিন। প্রয়োজনীয় প্রমাণ (ম্যাসেজ, গালির রেকর্ড, চিকিৎসকের সার্টিফিকেট) সংগ্রহ করে রাখুন।
- দেনমোহর নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার জন্য ফাসখের পথই উত্তম। তার মানে এই নয় যে আপনি স্বামীকে প্রতারণা করবেন; বরং আপনি আপনার বৈধ অধিকার আদায় করবেন।
৭. সংশ্লিষ্ট কিতাবের রেফারেন্স
- কুরআন মাজিদ:
সূরা নিসা ৪:১৯, ৪:৩৫, ৪:৩৪ (এখানে “اضربوهن” এর ব্যাখ্যা শরয়ী সীমার মধ্যে—হালকা ও আঘাতমূলক নয়; আপনার স্বামীর আচরণ সেটার অন্তর্ভুক্ত নয়) - হাদিস:
“استوصوا بالنساء خيرا” (বুখারি, মুসলিম)
“لا ضرر ولا ضرار” (ইবনে মাজাহ) - হানাফি ফিকহ:
- রদ্দুল মুহতার (৩/৪৫৫-৪৫৮)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৪৪০-৪৪৫)
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৪৫, খুলা ও ফাসখের বিবরণ)
- বেহেশতি জেওর (বিবাহ ও স্ত্রীর অধিকার অধ্যায়)
- আল-হিদায়া (২/২৯০ খুলা অধ্যায়)
- শারহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবির)
- উসুলুশ শাশি (ইসলামি আইনের মূলনীতি)
৮. সিদ্ধান্ত
**ইসলামী দৃষ্টিতে একজন নারীকে অত্যাচার সহ্য করতে বাধ্য করা হয় না। সুতরাং স্ত্রী যদি চান, তিনি আইনানুযায়ী খুলা বা ফাসখের মাধ্যমে বিচ্ছেদ নিতে পারেন এবং দেনমোহর তার জন্য রাখা জায়েয হবে, কারণ স্বামীই অত্যাচারী। তাঁর পরিবারের সম্মানের ভয়ে এভাবে টক্সিক সম্পর্কে থাকা কখনো কাম্য নয়।
সর্বোত্তম পন্থা:
স্থানীয় কোনো বিশ্বস্ত মুফতি বা ইসলামি আদালতে বিষয়টি উপস্থাপন করুন। তাঁরাই আপনাকে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেবেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে শান্তি ও সুন্দর সমাধান দিন। আমিন।