"ইসলামে ভুলবশত প্রাপ্ত টাকার বিধান"।
Halal and Haram · Hanafi
Question
এখন সমস্যা হইলো , আমার হাসবেন্ডের সাথে এই ঘটনা ৫,৬ বারের মত বা তার ও বেশি সময় হয়েছে। রিচার্জ করেন, সেটা খরচ হন। কিন্তু আবার ও সেটা পরের দিন ব্যাক হয়ে যায়। মানে টাকা টা কাটেনা। আর আমার হাসবেন্ড প্রত্যেক বার ই কাস্টোমার কেয়ারে বিষয়টা জানায়। কিন্তু কোন পক্ষ থেকেই কোন সমাধান ও দেয়না, আবার দায় ও নেয় না। এখন আমার হাসবেন্ডের কথা হল, যেহেতু আমি রিচার্জ করা টাকা খরচ ও করে ফেলছি, কিন্তু আবার সেই টাকা ফেরত আসছে, সেক্ষত্রে এই টাকা ব্যবহার করা জায়েজ হবে কিনা, আর উক্ত পরিমান টাকা সাদকা করতে হবে কিনা? যেহেতু কাস্টোমার কেয়ার থেকে কেউ কিছুই বলতে পারে না। দয়াকরে জানবেন।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রশ্নটির মূল বিষয় হলো—মোবাইল রিচার্জের টাকা ব্যবহার করার পর তা ফেরত আসলে সেই টাকা পুনরায় ব্যবহার করা জায়েয কি না, এবং কোম্পানি কর্তৃপক্ষ দায় না নিলে কী করণীয়।
সমস্যার বিশ্লেষণ
আপনার স্বামী নগদ এপ-এর মাধ্যমে টেলিটক সিমে ৭০ টাকা রিচার্জ করেন, তা দিয়ে ডেটা ব্যবহার করেন, কিন্তু পরের দিন সেই টাকা ফেরত আসে। তিনি উভয় কোম্পানির কাস্টমার কেয়ারে জানিয়েছেন, কিন্তু তারা দায় অস্বীকার করে। বিষয়টি ৫-৬ বার ঘটেছে।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ভুলবশত অতিরিক্ত প্রাপ্ত সম্পদ (نقصان الخطأ) বা হারানো সম্পদ (لقطة) এর মতো বিষয়। যেহেতু টাকা রিচার্জ করে ব্যবহারের পর তা ফেরত আসায় তিনি প্রকৃতপক্ষে ডেটা ও টাকা উভয়ই পাচ্ছেন, যা কোম্পানির সম্পদ। এখানে কোম্পানির সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ হচ্ছে।
হানাফী ফিকহের নীতিমালা
১. অতিরিক্ত প্রাপ্ত সম্পদ ফেরত দেওয়া ওয়াজিব:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, কোনো লেনদেনে ভুলবশত অতিরিক্ত সম্পদ পেলে তা প্রকৃত মালিককে ফেরত দেওয়া ওয়াজিব। (রদ্দুল মুহতার, ৫:১২৩)
- যদি মালিক খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে সাদাকাহ করে দেওয়া উত্তম, তবে নিয়ত হবে যে, প্রকৃত মালিক পেলে তার পক্ষ থেকে সাদাকাহ করা হলো। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪:২৮৯)
২. কোম্পানির দায় অস্বীকার করলে করণীয়:
- আপনি ইতিমধ্যে উভয় কোম্পানিকে জানিয়েছেন, কিন্তু তারা সমাধান দেয়নি। এমতাবস্থায় হানাফী ফিকহে “মালিক দাবি না করলে” অথবা “মালিক অস্বীকার করলে” প্রাপ্ত টাকা সাদাকাহ করে দেওয়া উচিত। (ফাতাওয়া শামী, ৬:২২১)
- তবে শর্ত হলো—একবার সাদাকাহ করার পর টাকা আবার ফেরত আসলে সেটিও একইভাবে সাদাকাহ করতে হবে। কিন্তু যদি নিয়মিতভাবে ঘটে, তাহলে বুঝতে হবে এটি সিস্টেমের ত্রুটি, এবং নিজের তরফ থেকে তা প্রতিরোধ করা জরুরি।
আপনার স্বামীর করণীয়
১. আরও একবার লিখিতভাবে বা কল রেকর্ড করে উভয় কোম্পানিকে জানান:
- স্পষ্টভাবে বলুন, “আমি রিচার্জ করছি, টাকা কাটছে না। কীভাবে সমাধান করবেন?” যদি তারা দায় না নেয়, তাহলে তাদের বক্তব্য প্রমাণ হিসেবে রাখুন।
২. সমাধান না পেলে সাদাকাহ করুন:
- যেহেতু কোম্পানি দায় নিচ্ছে না এবং টাকা ফেরত নিচ্ছে না, তাই প্রতিবার ফেরত আসা টাকা নিয়ত করে সাদাকাহ করুন এই উদ্দেশ্যে যে, “যদি প্রকৃত মালিক হকদার হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে এই সাদাকা তার পক্ষ থেকে কবুল হবে।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪:২৯০)
- তবে আপনি নিজের প্রয়োজনে এই টাকা ব্যবহার করবেন না। কারণ এটি কোম্পানির সম্পদ, যা আপনি ভোগ করেছেন, কিন্তু সেটা আবারও ফেরত আসায় এটি অপ্রাপ্ত পাওনা হয়ে যায়।
৩. সিস্টেম ত্রুটির পুনরাবৃত্তি রোধ করুন:
- যদি বারবার ঘটে, তাহলে কিছুদিনের জন্য নগদ এপ দিয়ে টেলিটক রিচার্জ বন্ধ রাখুন। অথবা অন্য কোনো মাধ্যমে রিচার্জ করুন। কারণ ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রুটির সুযোগ নেওয়া জায়েয নয়। (বাহেশতি জেওর, ২:২৮)
হাদীসের আলোকে নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন: “মুসলিমদের সম্পদ তাঁদের পক্ষ থেকে ইচ্ছানুগন্ত ব্যতীত কারো জন্য হালাল নয়।” (মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ২০৬৭)
অর্থাৎ কোনো সম্পদ পেলে তা মালিকের ইচ্ছা ছাড়া ভোগ করা যাবে না। এখানে কোম্পানির ইচ্ছা স্পষ্ট নয়, তাই সাদাকাহ করাই নিরাপদ।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
- আপনি টাকা ফেরত পেয়ে তা নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন না, কারণ এটি কোম্পানির হক।
- বরং প্রতিবার ফেরত আসা ৭০ টাকা সাদাকাহ করে দিন।
- কোম্পানি কর্তৃপক্ষ যদি একবারও বলে দেয় “আপনি রাখতে পারেন”, তাহলে সেটি হালাল হবে। কিন্তু তারা তা বলেনি, তাই সাদাকাহ করাই উত্তম।
সূত্র:
- কুরআন: (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৮)
- হাদীস: মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ২০৬৭
- ফাতাওয়া শামী (রদ্দুল মুহতার), ৬:২২১
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪:২৮৯-২৯০
- ফাতাওয়া উসমানী, ২:৪৫২
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।