ইস্তিখারার ফলাফল সংক্রান্ত প্রশ্ন।

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2376
Questioner: Israt Noor Nafia
Question Asked: 06 Jul 2026, 06:15 AM
Reviewed & Published: 06 Jul 2026, 06:25 AM
Views: 54
Tokens: 7,267
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুআলাইকুম। আমার বিয়ের কথা চলছে একটা ছেলের সাথে এবং দিন তারিখও ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু ছেলের গায়ের রং কালো হওয়ায় আত্মীয় স্বজনরা (মায়ের বাড়ির এবং বাবার বাড়ির) পছন্দ করেনি, তারা বারবারই বিয়ে ভেঙে দিতে বলছে এবং বলেছে এখানে বিয়ে দিলে তারা দাওয়াত রাখবে না, এই নিয়ে আব্বু, আম্মুর সাথে ঝগড়াও করেছে। খুবই নিকটাত্মীয় এবং বাড়িও কাছাকাছি এখন তারা না করলে আমরা অনেকটা একঘরে হয়ে যাবো। আমার নিজেরও এখন বিয়ে করার ইচ্ছা নেই অনেকটা নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করতে হচ্ছে কিন্তু শুধু ছেলের দ্বীনদারিতা দেখে সবার বিরুদ্ধে গিয়ে এখানে কথা আগাইছিলাম। কিন্তু সবার বিরোধিতা দেখে আমি এখন কনফিউজড হয়ে গেছি। ছেলের গায়ের রং নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই কিন্তু এখন ভয় হচ্ছে পরে যদি ভালো না লাগে কীভাবে তার সাথে সারাজীবন কাটাবো? আমি প্রস্তাব আসার পর থেকে নিয়মিত ইস্তিখারা করেছি আলহামদুলিল্লাহ। এখন এই বাধাগুলোকে কি ইস্তিখারার ফলাফল হিসেবে ধরবো বা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ইশারা হিসেবে নিবো নাকি যেহেতু বিয়ের কথা দেওয়া হয়েছে তাই কথা রক্ষার্থে বিয়ে করে নিবো? আজকে সন্ধ্যার আগে উত্তর দিলে মুনাসিব হয়।

Answer

উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই জানিয়ে রাখি, ইস্তিখারা শুধুমাত্র একটি দু‘আ ও আল্লাহর নিকট তাওফীক চাওয়ার মাধ্যম। এর ফলাফল সাধারণত মানুষের মনে এক ধরনের স্বস্তি বা অস্বস্তি, অথবা কাজের পথ সহজ বা কঠিন হওয়ার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। স্বপ্ন দেখা জরুরি নয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন, “ইস্তিখারার ফলাফল হলো, যে কাজে অন্তর খোলা থাকে ও সহজ হয়, তা উত্তম; আর যে কাজে অন্তর সংকুচিত হয় ও বাধা আসে, তা বর্জন করা কর্তব্য।” (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৯)

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ) ও মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুমও একই মত পোষণ করেন। অর্থাৎ ইস্তিখারা করার পর আপনি যদি কাজটি করতে গিয়ে বারবার বাধা পান, অন্তরভারী হয়, অথবা কোনো বৈধ কারণে অসুবিধা সৃষ্টি হয়, তবে তা ইস্তিখারার ফলাফল হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে—যে কাজটি আপনার জন্য ভালো নয়। কিন্তু শুধু দুনিয়াবী চাপ বা মানুষের রঙ-গোত্রের কারণে সৃষ্ট বাধা ইস্তিখারার ফল বলা ঠিক নয়, কারণ ইসলামে দ্বীনদারিতাই মাপকাঠি।

আপনার প্রশ্নের আলোকে বিশ্লেষণ:
১. ছেলেটির গায়ের রং কালো হওয়ায় আত্মীয়-স্বজনের আপত্তি—এটি একটি কুসংস্কার ও জাহেলিয়াতের লক্ষণ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফরমায়েছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে দ্বীনে সর্বোত্তম।” (বুখারী, ৫০৩৪) সুতরাং দ্বীনদারিতা থাকলে রঙ কোনো সমস্যা নয়। আপনার নিজেরও এতে আপত্তি নেই, বরং ছেলের দ্বীনদারিতার কারণে আপনি এগিয়ে এসেছিলেন।

২. ইস্তিখারা করার পর আপনি কী অনুভব করছেন? যদি ছেলেটির সাথে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আপনার অন্তর স্বস্তি পায়, কিন্তু শুধু পারিবারিক চাপে দ্বিধা হয়, তাহলে তা ইস্তিখারার ফলাফল নয়; বরং তা মানুষের ভয়। আর যদি ইস্তিখারার পরেও আপনার অন্তর সংকুচিত থাকে, বিয়ের ব্যাপারে ইতিবাচক কোনো ভাব না আসে এবং পথে বারবার বাধা সৃষ্টি হয়—তবে তা ইস্তিখারার ইঙ্গিত হতে পারে।

৩. আপনি বলেছেন, নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করতে হচ্ছে। তবে প্রাথমিকভাবে আপনি দ্বীনদারিতা দেখে কথা এগিয়েছিলেন। এখন আত্মীয়দের চাপে কনফিউশন হচ্ছে। এ অবস্থায় দ্বীনদারিতার মাপকাঠিকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সেই অধিক মর্যাদাবান, যে বেশি তাকওয়াবান।” (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩) তাই গায়ের রংকে অগ্রাধিকার দেওয়া ইসলামসম্মত নয়।

৪. ইস্তিখারার সঠিক ব্যবহার হলো—কাজটি ভালো কি মন্দ, তা জিজ্ঞেস করা। যখন আপনি বিয়ের কথা পাকাপাকি করে ফেলেছেন এবং ছেলেটির দ্বীনদারিতায় সন্তুষ্ট ছিলেন, তখন ইস্তিখারার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক আছে। কিন্তু এখন যদি দেখা যায়, আত্মীয়দের চাপে বিয়ে ভেঙে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, তাহলে মনে রাখবেন, ইস্তিখারার ফলাফল মাত্র একটি মাধ্যম; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আপনার বিবেক ও দ্বীনি জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে।

৫. কথা রাখার গুরুত্ব অবশ্যই আছে। তবে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেখানে দীর্ঘ জীবন কাটাতে হবে। যদি ইস্তিখারার মাধ্যমে আপনার মনে স্পষ্টভাবে অনুভব হয় যে এই বিয়ে আপনার জন্য ক্ষতির কারণ হবে (যেমন: ধর্মীয় পরিবেশ না থাকা, স্বামীর চরিত্রে ত্রুটি ইত্যাদি), তাহলে কথা রাখার জন্য বাধ্য হওয়া জরুরি নয়। কিন্তু এখানে সমস্যা শুধু রঙের—যা ইসলামী দৃষ্টিতে তুচ্ছ। তাই আপনার উচিত দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং আত্মীয়দের বুঝানোর চেষ্টা করা, আর না বুঝলে আল্লাহর ওপর ভরসা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

সুনির্দিষ্ট পরামর্শ:
(ক) আপনি এখনও সন্ধ্যার আগে উত্তর চেয়েছেন। তাই সংক্ষেপে বলছি—ইস্তিখারা করার পর আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতি কী? ছেলেটির সঙ্গে মোবাইলে বা ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে সম্পর্ক ভালো চলছে কিনা দেখুন। যদি আপনি তার ধার্মিকতায় সন্তুষ্ট হন এবং আপনার অন্তর বিয়েতে রাজি থাকে, তাহলে আত্মীয়দের অমতে বিয়ে করা জায়েজ। কিন্তু যদি আপনার ভয় হয় যে “ভালো না লাগলে কীভাবে কাটাবো?”—সেই ভয় স্বাভাবিক, তবে ইস্তিখারার মাধ্যমে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
(খ) আপনি যদি ইস্তিখারার পরেও ক্রমাগত অস্বস্তি বোধ করেন, বিয়ের পথে শুধু বাধাই বাধা আসে, এবং আপনার ইচ্ছাও দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে সেই বিয়েকে এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম। কারণ ইস্তিখারার উদ্দেশ্য হলো অন্তরের প্রশান্তি ও কাজের সহজতা।
(গ) আত্মীয়দের বর্জনের হুমকি—এটি তাদের অন্যায়। ইসলামে অন্যের বিয়েতে বাধা দেওয়া ও অহেতুক সম্পর্ক ছিন্ন করা গুনাহ। আপনি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দ্বীনদার যুবককে গ্রহণ করেন, তবে আল্লাহ অন্য ব্যবস্থা করে দেবেন। যেমন ইরশাদ হয়েছে: “যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন।” (সূরা তালাক, ৬৫:২)

শেষ সিদ্ধান্ত:
আপনার জন্য সবচেয়ে উত্তম হবে—আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা চালিয়ে যাওয়া, ছেলেটির দ্বীনদারিতা ও আখলাক সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া, এবং নিজের অন্তরের দিকে খেয়াল করা। যদি অন্তর স্থির থাকে এবং আপনি তাকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হন, তবে সবার বিরোধিতা সত্ত্বেও বিয়ে দিন। আর যদি বারবার বাধা ও অস্বস্তি আসে, তাহলে মনে করুন ইস্তিখারা তা থেকে বিরত রাখছে।

মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম বলেন, “ইস্তিখারা করার পর কোনো কাজের পথে যদি অনেক বাধা আসে এবং কাজটি করতে গিয়ে কষ্ট হয়, তাহলে তা ইস্তিখারার ফলাফল বলে গণ্য হবে। কিন্তু শুধু মানুষের কথা বা দুনিয়াবী চাপকে ইস্তিখারার ফল ভাবা ঠিক নয়।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৯১)

আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব:

  • এই বাধাগুলোকে ইস্তিখারার ফলাফল হিসেবে ধরবেন?
    → হ্যাঁ, ধরতে পারেন যদি এগুলো আসলেই কাজের পথে স্বাভাবিক প্রতিবন্ধকতা হয়ে আসে এবং আপনি ইস্তিখারা করার পরও অন্তর সংকুচিত থাকে। কিন্তু যদি এগুলো শুধু আত্মীয়দের কুসংস্কারমূলক আপত্তি হয়, তাহলে তা ইস্তিখারার ফলাফল নয়, বরং মানুষের কারণে বাধা।

  • আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা হিসেবে নেবেন?
    → ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী ইস্তিখারাই আল্লাহর নিকট পথপ্রদর্শন চাওয়া। যদি আপনার ইস্তিখারা করার পর ছায়া বিয়ের পক্ষে সহজ হয় এবং আপনি স্বস্তি পান, তাহলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা ধরা যেতে পারে। আর যদি বিপরীত হয়, তাহলে তা ইশারা হিসেবে গণ্য।

  • কথা রক্ষার্থে বিয়ে করে নেবেন?
    → কথা রাখা ভালো, কিন্তু যদি আপনি নিশ্চিত হন যে বিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত হবে (যেমন স্বামীর দ্বীনে ত্রুটি আছে), তাহলে কথা রাখার জন্য দায়ী নন। তবে এখানে তেমন কোনো সমস্যা নেই, শুধু রঙের আপত্তি। তাই কথা রাখা ও দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দেওয়াই আপনার জন্য সঙ্গত।

উপসংহার:
আপনার জন্য বলব—ইস্তিখারা চালিয়ে যান। ছেলেটির দ্বীনদারিতা সম্পর্কে আরও জানুন। তার সাথে আলাপ করে দেখুন, আপনার অন্তর খোলে কিনা। যদি ইস্তিখারার পরেও আপনি বিয়ের প্রতি আগ্রহী হন, তাহলে আত্মীয়দের চাপ না মেনে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে বিয়ে করে ফেলুন। আর যদি আপনার অন্তর সম্পূর্ণ বিমুখ হয়, তবে ইস্তিখারার ফলাফল মেনে বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করুন, কিন্তু সুন্দরভাবে ওজর পেশ করে কথা ভাঙুন।

আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কল্যাণদায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফীক দান করুন। আমীন।

রেফারেন্স:

  • {রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৯ (ইস্তিখারার বিবরণ)}
  • {ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৯১ (ইস্তিখারার ফলাফল)}
  • {বাহিশতী জেওয়ার, বিবাহ অধ্যায় (ইস্তিখারার পদ্ধতি)}
  • {মাআরিফুল কুরআন, সূরা হুজুরাত ১৩ নং আয়াতের তাফসীর}
  • {ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৪ (ইস্তিখারার হুকুম)}

والله أعلم بالصواب
আপনার সহায়তার জন্য প্রস্তুত


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.