বাই-মুরাবাহা চুক্তিতে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের শরিয়াহ বিধান

Business and Job · Hanafi

Question No: 2351
Questioner: Muhammad Asif
Question Asked: 05 Jul 2026, 01:09 PM
Reviewed & Published: 05 Jul 2026, 01:28 PM
Views: 73
Tokens: 5,375
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

যদি একটি বাই-মুরাবাহা চুক্তিতে ক্রেতার পরিশোধের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়—
1. একটি ব্যবসায়িক সিকিউরিটি চেক গ্রহণ করা
2. কিস্তি পরিশোধের জন্য নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী কিস্তির চেকসমূহ গ্রহণ করা
3. অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য চুক্তিতে দুইজন জামিনদার অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রত্যেকের নিকট থেকে একটি করে সিকিউরিটি চেক গ্রহণ করা

তাহলে উল্লিখিত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাগুলো বাই-মুরাবাহা চুক্তির শরিয়াহসম্মততার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না? এগুলো গ্রহণ করা কি ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বৈধ? যদি বৈধ হয়, তবে এ বিষয়ে কোনো বিশেষ শর্ত বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে কি?

Answer

বাই-মুরাবাহা চুক্তিতে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের শরয়ী বিধান

بسم الله الرحمن الرحيم

আপনার প্রশ্নের উত্তর প্রদানের পূর্বে সংক্ষেপে বলে রাখি, বাই-মুরাবাহা একটি বৈধ ইসলামী বাণিজ্যিক চুক্তি। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে একটি পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হয়, যেখানে বিক্রেতা তার ক্রয়মূল্য ও লাভের পরিমাণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে। এই চুক্তির বৈধতার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো চুক্তির সময় মূল্য ও লাভ নির্ধারিত হতে হবে।

এখন আপনি তিনটি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। নিচে প্রতিটি ব্যবস্থার শরয়ী বিশ্লেষণ প্রদান করা হলো:


১. ব্যবসায়িক সিকিউরিটি চেক গ্রহণ করা

এটি একটি রাহন (বন্ধক) বা জামানত হিসেবে গণ্য হবে, যা শরিয়াহসম্মত। ইসলামী শরিয়াহতে ঋণ বা ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে জামানত বা বন্ধক রাখা জায়েজ। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

"আর যদি你们 সফরে থাক এবং কোনো লেখক না পাও, তবে হস্তান্তরিত বন্ধক গ্রহণ করবে।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৩)

সুতরাং, ক্রেতার কাছ থেকে একটি সিকিউরিটি চেক গ্রহণ করা জায়েজ হবে, তবে শর্ত হলো এটি বিক্রেতার জন্য অতিরিক্ত কোনো সুদ বা লাভ আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। চেকটি কেবলমাত্র জামানত হিসেবে থাকবে, এবং যদি ক্রেতা সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করে, তবে চেকটি ফেরত দিতে হবে।


২. কিস্তির চেকসমূহ গ্রহণ করা

বাই-মুরাবাহা চুক্তিতে যখন কিস্তির পরিমাণ ও সংখ্যা নির্ধারিত থাকে, তখন ক্রেতার কাছ থেকে তারিখ অনুযায়ী কিস্তির চেক নেওয়া জায়েজ। কারণ এটি ঋণ পরিশোধের একটি নিরাপদ ব্যবস্থা মাত্র। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, কোনো অবস্থাতেই দেরি হওয়ার কারণে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার শর্ত দেওয়া যাবে না। দেরি হলে শুধুমাত্র মূল পাওনা আদায় করা যাবে, কোনো জরিমানা বা অতিরিক্ত সুদ নেওয়া হারাম।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"ঋণ পরিশোধের সময় নির্ধারণ করা এবং তার বিপরীতে চেক গ্রহণ করা জায়েজ, তবে শর্ত হল তাতে কোনো অতিরিক্ত লাভের শর্ত না থাকে।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/৫০৫)


৩. দুইজন জামিনদার অন্তর্ভুক্ত করা এবং সিকিউরিটি চেক গ্রহণ

জামিনদার (কাফালাহ) গ্রহণ করাও শরিয়াহসম্মত। ইসলামী আইনে জামিনদার রাখা জায়েজ এবং এটি ঋণ আদায়ের একটি বৈধ মাধ্যম। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

"আর যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত, তাকে সচ্ছলতা না আসা পর্যন্ত সময় দাও। কিন্তু যদি তোমরা দান করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮০)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ঋণ আদায়ের জন্য জামিনদার নেওয়া জায়েজ। তবে জামিনদারদের কাছ থেকে সিকিউরিটি চেক নেওয়ার ব্যাপারে শর্ত হলো, জামিনদাররা তাদের জামানতের পরিমাণ সম্পর্কে সচেতন থাকবেন এবং তারা নিজ ইচ্ছায় জামিনদার হবেন। জোর করে জামিনদার করা যাবে না।

ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন:

"জামিনদার গ্রহণ করা জায়েজ, কারণ এটি ঋণ আদায়ের একটি উপায়।" (বাদায়িউস সানায়ি, ৬/২২১)


সারসংক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা

উল্লিখিত তিনটি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাই শরিয়াহসম্মত ও বৈধ। তবে নিম্নোক্ত শর্ত ও সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে চলা জরুরি:

  1. সুদ ও অতিরিক্ত লাভের শর্ত না থাকা: কোনো অবস্থাতেই দেরি হওয়ার কারণে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার শর্ত দেওয়া যাবে না। এটি সুদ (রিবা) হবে, যা হারাম।

  2. চেক ব্যবহারের নিয়ম: ক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া সিকিউরিটি চেক শুধুমাত্র জামানত হিসেবে থাকবে। যদি ক্রেতা সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করে, তবে চেক ফেরত দিতে হবে। বিক্রেতার জন্য চেক ব্যবহার করে টাকা তোলার অধিকার তখনই থাকবে, যখন ক্রেতা চুক্তি ভঙ্গ করে পরিশোধ না করে।

  3. জামিনদারদের সম্মতি: জামিনদারদের তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং তাদের সম্মতি নিতে হবে। জামিনদারদের কাছ থেকে নেওয়া চেকও একই নিয়মে পরিচালিত হবে।

  4. মূল্য ও লাভ সুনির্দিষ্ট: বাই-মুরাবাহা চুক্তির সময় ক্রয়মূল্য ও লাভের পরিমাণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে এবং তা পরিবর্তন করা যাবে না।

  5. চুক্তির শর্ত: চুক্তির সময় এই নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে, যাতে উভয় পক্ষ জানতে পারে।

ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন:

"জামানত ও বন্ধক গ্রহণ করা জায়েজ, তবে তাতে কোনো প্রকার সুদ বা অতিরিক্ত লাভের শর্ত থাকতে পারবে না।" (আল-আসল, ৪/৭৫)


উপসংহার

আপনার উল্লিখিত তিনটি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা—সিকিউরিটি চেক, কিস্তির চেক এবং জামিনদারসহ তাদের কাছ থেকে চেক গ্রহণ—সবই শরিয়াহসম্মত, যদি উপরোক্ত শর্ত ও সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে চলা হয়। এই ব্যবস্থাগুলো চুক্তির বৈধতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দলিল দ্বারা প্রমাণিত।

তবে সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে, এই ব্যবস্থাগুলো যেন সুদ বা অন্যায় লাভের কোনো উপায়ে পরিণত না হয়। ইসলামী শরিয়াহর মূল লক্ষ্য হলো ন্যায়বিচার ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা, এবং ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা বজায় রাখা।

আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.