শিরক করার পর ঠিকানা জান্নাত নাকি জাহান্নাম?
Janazah-Burial · Hanafi
Question
আমার নানা এক মাজারের মুরিদ।
সেদিক থেকে আমার নানি ও পীর ভক্ত ছিলেন খুব।সেই মাজারে সিজদা করা, মৃত পীর এর কাছেকোনো কিছু চাওয়া ইত্যাদি শিরকি কাজ করা হয়।
কিন্তু উনি অনেক ভালো এবং সহজ সরল ছিলেন।
নামাজ রোজা খুব যত্নের সাথে করতেন।
কিন্তু তিনি মৃত্যুর আগে শেষ মুহূর্তে তার মুখে শুধু আল্লাহর জিকির ছিল।
তাহলে কী আশা করা যায়, আল্লাহ তাকে মাফ করে দিয়েছেন।আমি নানিকে খুব ভালোবাসি। আমি জান্নাতে তার সাথে মিলিত হতে চাই।
একটু জানালে মুনাসিব হয়।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার নানীর প্রতি আপনার ভালোবাসা ও জান্নাতে তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার আগ্রহ সত্যিই প্রশংসনীয়। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ। চলুন, কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করি।
প্রথমত: মাজারে সিজদা ও মৃতের কাছে প্রার্থনার বিধান
ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস অনুযায়ী, ইবাদত শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য (সূরা ফাতিহা: ৫)। মাজারে সিজদা করা বা মৃত পীরের কাছে কোনো কিছু চাওয়া (যেমন: রোগমুক্তি, সন্তান ইত্যাদি) স্পষ্ট শিরক। কেননা সিজদা ইবাদতের সর্বোচ্চ রূপ এবং তা একমাত্র আল্লাহর জন্যই সিজদা করা জায়েজ। আর যিনি জীবিত-মৃত সবার উপর পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী শুধুমাত্র তিনিই আল্লাহ। মৃত ব্যক্তি কারো কোনো উপকার বা অপকার করতে পারেন না (সূরা ফাতির: ২২, সূরা আনআম: ১৬২-১৬৩)।
- রদ্দুল মুহতার (হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ)-এ বর্ণিত হয়েছে: “যে ব্যক্তি কোনো নবী বা ওলীর কবরে সিজদা করে, সে কাফির হয়ে যায়।” (রদ্দুল মুহতার, ৬:৪১৫)
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: “মৃতের কাছে কিছু চাওয়া এবং তাদেরকে ডাকা জায়েজ নয়; এটি শিরকের অন্তর্ভুক্ত।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫:৩৫৯)
দ্বিতীয়ত: আপনার নানীর অবস্থা ও আশার অবকাশ
আপনি বলেছেন, আপনার নানী নামাজ-রোজা খুব যত্নের সাথে করতেন এবং মৃত্যুর আগে শেষ মুহূর্তে তার মুখে শুধু আল্লাহর জিকির ছিল। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক দিক। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী:
১. শেষ কথা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার ফজিলত: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: “যার শেষ কথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (আবু দাউদ, হাদিস: ৩১১৬) আপনার নানী যদি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আল্লাহর জিকির করে থাকেন, তবে এটি তার জন্য রহমত ও মাগফিরাতের একটি বড় নিদর্শন।
২. শিরক অবস্থায় মৃত্যু বনাম তাওবা: কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না; আর তা ছাড়া অন্য যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা নিসা: ৪:৪৮ ও ৪:১১৬) এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে, শিরকের ওপর মৃত্যুবরণ করলে তা ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু আপনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তাঁর শেষ মুহূর্তে শুধু আল্লাহর জিকির ছিল। এ থেকে বোঝা যায়, সম্ভবত তিনি শিরক থেকে তাওবা করে ফিরে এসেছিলেন অথবা আল্লাহ তাঁর ইখলাস ও ভালো আমলের কারণে তাঁর দুর্বলতা ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহর রহমত সীমাহীন।
৩. ভালো আমলের প্রভাব: আপনার নানীর নিয়মিত নামাজ-রোজার অনুশীলন এবং সহজ-সরল চরিত্র তাঁর ঈমানের ভিত্তি মজবুত করেছিল। শেষ মুহূর্তে আল্লাহর জিকির সহজ হওয়ার এটিও একটি কারণ হতে পারে। ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি সারা জীবন আল্লাহর আনুগত্য করে, আল্লাহ তার শেষ মুহূর্তকে সুন্দর করে দেন।”
তৃতীয়ত: আমাদের করণীয়
আমরা কারো জন্য চূড়ান্তভাবে জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা করতে পারি না। এটি আল্লাহর একক এখতিয়ার। তবে আমরা ভালো ধারণা (হুসনে যান) পোষণ করব এবং এই আশা করব যে, আল্লাহ তাঁর অসীম দয়ায় আপনার নানীকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। বিশেষ করে, শেষ মুহূর্তের জিকির এবং তাঁর ভালো আমলগুলি এর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।
আপনার করণীয় হলো:
১. দোয়া ও ইস্তিগফার: আপনার নানীর জন্য নিয়মিত দোয়া করুন, মাগফিরাত কামনা করুন এবং যেকোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি আল্লাহ যেন ক্ষমা করে দেন সেই প্রার্থনা করুন। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “আর যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের ভাইদের যারা ঈমানে আমাদের অগ্রগামী তাদের ক্ষমা করুন।” (সূরা হাশর: ১০)
২. সাদকায়ে জারিয়া: আপনার নানীর পক্ষ থেকে সাদকা করা, যেমন: কুরআন শিক্ষা দেওয়া, মসজিদে কিছু দান করা, গাছ লাগানো ইত্যাদি। এতে তার আমলনামা বৃদ্ধি পাবে।
৩. শিরক থেকে দূরে থাকা: আপনার নানার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সর্বোত্তম উপায় হলো, সেই শিরকি পথ (মাজারে সিজদা ইত্যাদি) থেকে নিজে বিরত থাকা এবং অন্যদেরও বিরত রাখার চেষ্টা করা। রাসূল (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো সুন্নত (ভালো পথ) চালু করল, সে তার নিজের সওয়াব পাবে এবং যারা তার অনুসরণ করবে তাদের সওয়াবও পাবে, তাদের সওয়াব থেকে কিছু কম করা হবে না।” (মুসলিম)
৪. আল্লাহর রহমতের আশা: কখনোই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। তিনি অতীব দয়ালু। আপনার নানীর ব্যাপারে সদা ভালো ধারণা পোষণ করুন এবং দোয়া করতে থাকুন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার নানীর শেষ মুহূর্তের জিকির, নিয়মিত নামাজ-রোজা এবং সাধারণ জীবনযাপনের আলোকে আশা করা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর দুর্বলতা ও অজ্ঞতাজনিত ভুল ক্ষমা করে দিয়েছেন। বিশেষ করে যদি তিনি মৃত্যুর আগে শিরক থেকে তাওবা করে থাকেন, তবে ইনশাআল্লাহ তিনি ক্ষমা পেয়ে যাবেন। আপনি তাঁর জন্য দোয়া করতে থাকুন এবং নিজে শিরকমুক্ত জীবনযাপন করে তাঁর জন্য উসিলা তৈরি করুন। আল্লাহর রহমত তার গজবের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।
মা’আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি, রহ.)-এ সূরা নিসার ৪৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: “শিরক ব্যতীত অন্যান্য গুনাহ মৃত্যুর আগে তাওবা করলে ক্ষমা হওয়ার আশা আছে; কিন্তু শিরকের ওপর মৃত্যুবরণ করলে তা ক্ষমা করা হবে না।” আপনার নানী যদি শেষ মুহূর্তে আল্লাহর জিকির করে থাকেন তবে তা তাওবারই আলামত।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে শিরক-বিদআত থেকে হেফাজত করুন এবং নানীর সাথে আপনার জান্নাতে মিলিত হওয়ার ইচ্ছা পূরণ করুন। আমীন।
আল্লাহু আলাম (আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন)।