মৃত্যু থেকে শিক্ষা, মৃতের জন্য করণীয় ও কুরআন খতম, দুরুদ, কালিমা পাঠের বিধান সম্পর্কে জানতে চাই?
Janazah-Burial · Hanafi
Question
কোন ব্যক্তির মৃত্যুতে জীবিতদের কি রকম অনুভূতি হওয়া উচিৎ ও জীবিতদের জন্য মৃত্যু থেকে কি কি শিক্ষা নেয়া উচিৎ?
মৃত ব্যক্তির কল্যাণের জন্য জীবিতরা কি কি কাজ করতে পারে?
মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন খতম করা, ১০০ বার দুরুদ শরীফ পড়া, ১০০০ বার কালিমা পড়া এগুলা কি সুন্নাহসম্মত আমল?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথম অংশ: মৃত্যু থেকে শিক্ষা ও অনুভূতি
মৃত্যু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয়। কুরআন ও হাদীসে বারবার মৃত্যুকে স্মরণ করার এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং আখিরাতের জীবনই চিরস্থায়ী। তাই কোনো ব্যক্তির মৃত্যুতে আমাদের অনুভূতি হওয়া উচিত:
১. আল্লাহর স্মরণ ও তওবা: মৃত্যু দেখে আমাদের নিজেদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং নিজের আমল সংশোধন করা উচিত।
২. ধৈর্য ও শোক: মৃতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো এবং শরিয়তসম্মত শোক প্রকাশ করা। তবে অতিরিক্ত বিলাপ, বুক চাপড়ানো ইত্যাদি হারাম।
৩. শিক্ষা: মৃত্যু থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, দুনিয়ার মোহ ও সম্পদের কোনো মূল্য নেই। একমাত্র ঈমান ও নেক আমলই সঙ্গী হবে।
প্রমাণ:
﴿كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ﴾ (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)
"প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।"
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَادِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِي الْمَوْتَ
"সুখ-স্বাদ নিঃশেষকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ কর।" (তিরমিজি: ২৩০৭)
দ্বিতীয় অংশ: মৃত ব্যক্তির কল্যাণে জীবিতরা কী করতে পারে?
ইসলামে মৃত ব্যক্তির জন্য কিছু নির্দিষ্ট কাজের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এগুলো মূলত দোয়া, সদকা, হজ্জ ইত্যাদি। যেমন:
১. দোয়া করা: মৃতের জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করা। যেমন:
﴿رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ﴾ (সূরা হাশর: ১০)
২. সদকা করা: মৃতের পক্ষ থেকে সদকা দেওয়া। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, "হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা মারা গেছেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে সদকা করতে পারি?" তিনি বললেন: "হ্যাঁ।" (বুখারি: ২৭৫০)
৩. কাজা রোজা ও হজ্জ: মৃতের ওপর ফরজ রোজা বা হজ্জ থাকলে, তার পক্ষ থেকে আদায় করা যায়। (মুসলিম: ১১৪৮)
৪. কুরআন তিলাওয়াত: অনেক হানাফী আলেমের মতে, কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতের রূহের কাছে সওয়াব পৌঁছে দেওয়া জায়েয এবং তা মৃতের উপকারে আসে। ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে, কুরআনের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে। (রদ্দুল মুহতার: ২/২৪২, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২৭০)
তৃতীয় অংশ: নির্দিষ্ট আমল যেমন কুরআন খতম, ১০০ দুরুদ, ১০০০ কালিমা
এ বিষয়ে হানাফী ফিকহের মতামত নিম্নরূপ:
ক. কুরআন খতম:
মৃতের জন্য কুরআন খতম করা এবং তার সওয়াব পৌঁছে দেওয়া জায়েয ও মুস্তাহাব। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা বা পদ্ধতি (যেমন ১০০ বার দুরুদ) কোনো হাদীস বা সাহাবীর আমল থেকে প্রমাণিত নয়। সাধারণভাবে কুরআন তিলাওয়াত করে দোয়া করা সুন্নাহ। (আল-হিদায়া: ২/২৪২, ফাতাওয়া উসমানী: ১/২৮৫)
খ. ১০০ বার দুরুদ শরীফ:
দুরুদ শরীফ পাঠ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। তবে নির্দিষ্ট ১০০ বার পড়ার কোনো বিশেষ ফজিলত মৃতের জন্য হাদীসে পাওয়া যায় না। তবে সাধারণভাবে দুরুদ পাঠ করে মৃতের জন্য দোয়া করা যায়।
গ. ১০০০ বার কালিমা:
কালিমা পাঠ করা সব সময়ই সওয়াবের কাজ। কিন্তু মৃতের জন্য নির্দিষ্ট ১০০০ বার কালিমা পড়ার কোনো হাদীস বা সাহাবীর আমল নেই। এ ধরনের নির্দিষ্ট সংখ্যা রাসূলুল্লাহ ﷺ বা সাহাবীদের থেকে প্রমাণিত নয়। তাই এগুলোকে সুন্নাহ বলা যাবে না। তবে নফল হিসেবে পড়লে সওয়াব হবে, কিন্তু নির্দিষ্ট ফজিলত আশা করা ঠিক নয়।
মোটকথা:
- মৃতের জন্য কুরআন তিলাওয়াত, দুরুদ পাঠ, কালিমা পাঠ করা জায়েয এবং সওয়াব পৌঁছানোর আশা করা যায়।
- নির্দিষ্ট সংখ্যা (১০০ বা ১০০০) কোনো হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়, তাই এগুলোকে সুন্নাহ বা বিশেষ আমল মনে করা উচিত নয়।
প্রমাণ:
(فتاوی ہندیہ: ۱/۲۷۰)
"مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ وَجَعَلَ ثَوَابَهُ لِلْمَيِّتِ جَازَ وَيَصِلُ إلَيْهِ عِنْدَ أَهْلِ السُّنَّةِ"
"কেউ কুরআন পড়ে তার সওয়াব মৃতের জন্য নির্ধারণ করলে তা জায়েয এবং আহলে সুন্নাতের মতে তা মৃতের কাছে পৌঁছে।"
(رد المحتار: ۲/۲۴۲)
"وَيُسْتَحَبُّ قِرَاءَةُ الْقُرْآنِ عِنْدَ الْقَبْرِ بَعْدَ الدَّفْنِ"
"কবরের কাছে দাফনের পর কুরআন তিলাওয়াত করা মুস্তাহাব।"
সারসংক্ষেপ:
- মৃত্যু থেকে শিক্ষা নিন: আখিরাতের প্রস্তুতি ও তওবা করুন।
- মৃতের জন্য দোয়া, সদকা, রোজা, হজ্জ ইত্যাদি করুন।
- কুরআন খতম, দুরুদ, কালিমা পড়া জায়েয, তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা সুন্নাহ নয়। সাধারণভাবে সওয়াব পৌঁছানোর নিয়তে পড়ুন।
والله أعلم بالصواب
মুফতি/উত্তর প্রদানকারী:
[নাম]
দারুল ইফতা, [প্রতিষ্ঠানের নাম]
সূত্র:
- কুরআন: সূরা আলে ইমরান (১৮৫), সূরা হাশর (১০)
- বুখারি: ২৭৫০, মুসলিম: ১১৪৮, তিরমিজি: ২৩০৭
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২৭০
- রদ্দুল মুহতার: ২/২৪২
- ফাতাওয়া উসমানী: ১/২৮৫