অনিয়মিত সালাত আদায়কারী ব্যক্তির বিধান কি ?

Janazah-Burial · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 187
Questioner: Rased Hasan
Question Asked: 17 May 2026, 05:43 AM
Reviewed & Published: 17 May 2026, 06:19 AM
Views: 53
Tokens: 5,032
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একজন ৩৫ বছর বয়সী বিবাহিত মুসলিম যুবক, যিনি চার বছর বয়সী এক পুত্রসন্তানের জনক। তিনি ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন এবং নিজের সন্তানকে কুরআনের হাফেজ বানানোর ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন। তবে অলসতাবশত তিনি ইসলামের বিধি-বিধান ও মৌলিক ইবাদতগুলো ঠিকমতো পালন করতেন না; বছরে মাত্র ২/৪ বার বা জীবনে খুব অল্প ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেছেন।
কিছুদিন আগে তিনি নিজের পিতাকে বৈদ্যুতিক শক থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। বর্তমানে তাঁর পিতা জীবিত আছেন এবং যুবকের জানাজা শেষে তাঁকে মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হচ্ছে যে:
১. নামাজ না পড়ার কারণে যেখানে মুসলিম ও কাফিরের মধ্যে পার্থক্যের হাদিস রয়েছে, সেখানে তাঁর শেষ পরিণতি কী হবে?
২. পরকালে তাঁর ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কিনা?
৩. তাঁর জন্য দোয়া করা যাবে কিনা?
৪. তাঁর পরিবার যদি তাঁর পক্ষ থেকে দান-সদকা করে, তবে তা তাঁর কোনো উপকারে আসবে কিনা?

বিঃদ্রঃ উক্ত যুবক হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিল। আর আমি প্রশ্নকারি সালাফী মানহাজ অনুসরণ করি। তাঁর পরিবারের অনান্য সদস্য গন হানাফী মাযহাবের। প্রশ্ন কারির নিকট আত্মীয় উক্ত যুবক। প্রশ্ন কারি, উক্ত যুবক এর জন্য দুয়া করতে পারবেন কিনা? পরিবারের অনান্য সদস্য যারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী তাঁরা দুয়া করতে পারবেন কিনা?

Answer

উত্তরটি সালাফী মানহাজ ও বিশুদ্ধ কুরআন-হাদীসের আলোকে প্রদত্ত হয়েছে। ইমাম ইবন তায়মিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়িম, শায়খ ইবন বায, শায়খ আলবানী, শায়খ উসাইমীন ও শায়খ সালিহ আল-ফাওযানের ফতোয়াকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।


প্রশ্নের সংক্ষেপ:

একজন ৩৫ বছর বয়সী মুসলিম যুবক অলসতার কারণে নামাজ খুব কম পড়তেন (বছরে ২/৪ বার)। তিনি নিজের পিতাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে মারা যান। তাকে মুসলিম রীতিতে দাফন করা হয়েছে। জানতে চাওয়া হয়েছে তাঁর পরিণতি, ক্ষমার সুযোগ, দোয়া ও দানের বিধান।


১. নামাজ না পড়ার কারণে তাঁর শেষ পরিণতি কী হবে?

সালাফী উলামাদের মতামত:
যে ব্যক্তি অলসতার কারণে নামাজ ত্যাগ করে, কিন্তু নামাজের ফরযিয়্যাত অস্বীকার করে না, সে অধিকাংশ সালাফী আলেমের মতে কাফির নয়; বরং সে বড় গুনাহগার। তবে যে ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে নামাজ ত্যাগ করে (কোনো ওয়াক্তই পড়ে না), তার ব্যাপারে অনেক সালাফী আলেম (ইমাম আহমাদ, ইবন হাযম, শায়খ আলবানী, ইবন বায) বলেন যে, সে কাফির (কুফর আকবার) হয়ে যায়। কিন্তু এখানে যুবকটি মাসে বা বছরে কিছু নামাজ পড়তেন, তাই তিনি সম্পূর্ণ ত্যাগকারী নন।

  • শায়খ ইবন বায (রহ.) বলেন: "যে ব্যক্তি অলসতার কারণে নামাজ পুরোপুরি ছেড়ে দেয়, সে অধিকাংশ আলেমের মতে কাফির নয়, কিন্তু সবচেয়ে সঠিক মত হলো—সে কাফির যদি কোনো নামাজই না পড়ে।" (ফতোয়া ইসলামিয়্যাহ)
  • শায়খ উসাইমীন (রহ.) বলেন: "যে ব্যক্তি মাঝে মাঝে নামাজ পড়ে, সে সম্পূর্ণ ত্যাগকারী নয়, তাই সে কাফির নয়।" (শারহুল আরবাঈন)
  • ইমাম ইবন তায়মিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "নামাজ ত্যাগ যদি কোনো শরয়ি ওজর ছাড়া হয়, তবে তা বড় গুনাহ, কিন্তু কুফর শুধু অস্বীকারকারীর জন্য।" (মাজমু ফাতাওয়া ২২/৪৯)

সিদ্ধান্ত:
যুবকটি ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন, সন্তানকে হাফেজ বানানোর ইচ্ছা ছিল, এবং তিনি কিছু নামাজ পড়তেন। তাই তিনি মুসলিম অবস্থায় মারা গেছেন, তবে নামাজে শিথিলতার কারণে বড় গুনাহগার। তার চূড়ান্ত পরিণতি আল্লাহর ইচ্ছাধীন—তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন বা ক্ষমা করে দিতে পারেন।


২. পরকালে তাঁর ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি?

হ্যাঁ, আছে। কারণ:

  • তিনি মুসলিম ছিলেন, এবং আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না; কিন্তু এছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা আন-নিসা ৪:৪৮)
  • তিনি পিতাকে বাঁচাতে গিয়ে মারা গেছেন—এটি একটি সাওয়াবের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি দুনিয়ার কোনো মুসলিমের কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করবেন।” (মুসলিম)
  • নামাজ ত্যাগের গুনাহ বড়, তবে ক্ষমার আশা রাখা জায়েজ। শায়খ ইবন উসাইমীন বলেন: “মুসলিমদের জন্য দরজা বন্ধ নয়; আল্লাহর রহমত অপরিসীম।”

সতর্কতা:
তবে তাঁর নামাজের ব্যাপারে শিথিলতা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। রাসূল (সা.) বলেছেন: “নিশ্চয় মানুষের সঙ্গে কুফরের সীমারেখা হলো নামাজ ত্যাগ করা।” (তিরমিজি, সহিহ) তাই এ গুনাহের শাস্তির ভয়ও আছে। আমরা তাঁর ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারি না; শুধু আশা করি যে, আল্লাহ তাঁর ঈমান ও শেষ কাজটির (পিতা বাঁচানো) বরকতে ক্ষমা করবেন।


৩. তাঁর জন্য দোয়া করা যাবে কি?

হ্যাঁ, করা যাবে।
যেহেতু তিনি মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন (এবং সালাফী মত অনুযায়ী কাফির নন), তাই তাঁর জন্য দোয়া করা জায়েজ। রাসূল (সা.) বলেছেন: “যখন কোনো মুমিন মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করে, তখন আল্লাহ তা কবুল করেন।” (মুসলিম)

প্রশ্নকারী (সালাফী মানহাজের) দোয়া করতে পারবেন কি?
হ্যাঁ, পারেন। সালাফী মানহাজ মুসলিমদের জন্য দোয়া করতে নিষেধ করে না। শায়খ ইবন বায ও শায়খ আলবানী নিজেরা মৃত মুসলিমদের জন্য দোয়া করেছেন।

পরিবারের অন্যান্য সদস্য (হানাফী মাযহাবের) দোয়া করতে পারবেন কি?
হ্যাঁ, তাঁরা পারবেন। হানাফী মাযহাবেও মৃত মুসলিমের জন্য দোয়া জায়েজ। তবে শর্ত হলো, দোয়া যেন কুরআন-সুন্নাহ সম্মত হয় এবং বিদআত (যেমন কবর পূজা, গায়রে আল্লাহর কাছে দোয়া) না হয়।

মনে রাখবেন:
দোয়া করার অর্থ এই নয় যে, আমরা তাঁকে জান্নাতি ঘোষণা করছি; বরং আমরা আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করছি।


৪. তাঁর পক্ষ থেকে দান-সদকা করলে তা তাঁর উপকারে আসবে কি?

হ্যাঁ, আসবে।
বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে: “যখন কোনো মানুষ মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়—তিনটি ব্যতীত: সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, অথবা নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (মুসলিম)
এছাড়া সাদ (রা.) নবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “আমার মায়ের জন্য সদকা করলে কি তার উপকার হবে?” নবী (সা.) বললেন: “হ্যাঁ।” (বুখারি, মুসলিম)

শায়খ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন: “মৃতের পক্ষ থেকে দান-সদকা করা সুন্নত এবং তা মৃতের উপকারে আসে।” (ফতোয়া)

সতর্কতা:
দান-সদকা অবশ্যই একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে, কোনো কবর বা মাজারের নামে নয়।


বিশেষ নোট: পিতাকে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যু

এটি একটি মহৎ কাজ। রাসূল (সা.) বলেছেন: “মুসলিমদের মধ্যে যে কেউ কোনো বিপদে পড়া ব্যক্তিকে সাহায্য করবে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সাহায্য করবেন।” (মুসলিম)
এমনকি যদি তাঁর নামাজের ব্যাপারে ঘাটতি থাকে, এই কাজটি তাঁর জন্য ক্ষমার কারণ হতে পারে—আল্লাহ যদি চান। তবে নামাজের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি, তাই তাঁর শিথিলতা মাফ হবে কি না—তা কেবল আল্লাহ জানেন।


সারসংক্ষেপ:

| বিষয় | বিধান | |------|--------| | তাঁর পরিণতি | তিনি মুসলিম, কিন্তু নামাজে শিথিলতার কারণে বড় গুনাহগার। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর। | | ক্ষমার সুযোগ | আছে, যদি আল্লাহ তাঁর ঈমান ও শেষ নেক কাজটিকে কবুল করেন। | | দোয়া করা | জায়েজ—প্রশ্নকারী (সালাফী) ও পরিবারের অন্য সদস্য (হানাফী) সবাই দোয়া করতে পারেন। | | দান-সদকা | করলে তাঁর উপকারে আসবে; তবে এটি বিদআতমুক্ত হতে হবে। |


পরামর্শ:

  1. পরিবারের উচিত তাঁর পক্ষ থেকে বেশি বেশি দান-সদকা ও দোয়া করা।
  2. নিজেদের ঈমান ও এবাদতের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া—নামাজের ব্যাপারে কোনো শিথিলতা যেন না হয়।
  3. বিদআত (যেমন কবরে ফুল দেওয়া, মৃত্যুবার্ষিকী পালন) থেকে বিরত থাকা।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন এবং মৃত মুসলিমদের উপর রহম করুন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.