তালাক সম্পর্কিত
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
তালাক নিয়ে আমার কয়েকটি প্রশ্ন ছিল।
১. কয়েকদিন ধরে আমার হাসব্যান্ডের সাথে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না।
একদিন ঝগড়া হয় আমাদের মাঝে তখন আমি উনার কাছে তালাক চাই। আমাকে তালাক দিতে বলি । তখন উনি আমার উপর হতাশ হয়ে বলেন যে,, চলে যাও। তোমাকে আর ধরে রাখতে পারলাম না।
কিছুক্ষন পর সব ঠিক হলে, উনি আমার আপুকে ফোন দিয়ে সব জানাতে চান যে,, আমি পাগলামি করতেছি। আমাকে যেন আপু একটু বুঝায়। কিন্তু আমি উনাকে আপুর সাথে কথা বলতে দেয়নি। এরপর আমি উনাকে জিজ্ঞাসা করি যে, উনি কোন নিয়তে এসব বলেছেন? তখন উনি বলেন, আমার উপর হতাশ হয়ে বলেছেন। এতে কি তালাক হবে?
২. আরেকদিন আমি উনার উপর বিরক্ত হয়ে বলি যে,, আমি মুক্তি চাই। ভালো লাগে না।
সবকিছুতে ঝামেলা। এটা করতে পারবা না, ওটা করতে পারবা না। খালি রেসট্রিকশন।
তখন উনি হেসেই বলেন যে,, তুমিতো মুক্তই। যা ইচ্ছা করবা। তোমাকে মানা করসে কে? বল।
হুজুর, এইটুকুই মনে আছে।
৩. অনেক সময় ঝগড়ার টাইমে আমি উনার কাছে তালাক চাইতাম। কিন্তু উনি আমাকে তালাক দিতে রাজি নন।কিন্তু চলে যাও যেখানে ইচ্ছা। তোমার যা ইচ্ছা কর ইত্যাদি বলতেন।
আমি ক্লিয়ারলি মনে করতে পারছি না।
যেগুলো ভুলে গেছি আমরা উভয়ই সেগুলো জন্য কি তালাক পতিত হবে?
অনেক আগের ঘটনা হওয়ায় আমাদের মনে নেই।
এখন টেনশন হচ্ছে এইসব নিয়ে।
৪. এসব ঘটনার ৪মাস পর একদিন উনি আমার হাত ধরে আছেন। আমি বললাম যে, ছেড়ে দেন।তখন উনি বলেন, যাও, ছেড়ে দিলাম। যেটা হাত ছাড়ার উদ্দেশ্যই বলেছেন। তারপর আবার আমাকে হেসে বললেন যে, তোমাকে ছেড়ে দিলাম।তখন আমি উনাকে সাথে সাথে বলি যে, কি বললেন এটা! কেন বললেন? তখন উনি বলেন,, আরে তুমি খালি টেনশন কর তাই বললাম আর কি।
উনি বলেন যে, আমিতো নিয়ত বলেছি।
এতে কি তালাক হবে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জেনে নেওয়া জরুরি যে, হানাফি মাজহাব অনুযায়ী তালাকের ক্ষেত্রে শব্দের প্রকৃতি ও নিয়তের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
- সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ: যেমন “তালাক”, “আমি তালাক দিলাম”, “তুমি তালাক” – এগুলো উচ্চারণ করলে নিয়ত নির্বিশেষে তালাক পতিত হয়।
- কিনায়াহ (অস্পষ্ট) শব্দ: যেমন “চলে যাও”, “মুক্ত”, “ছেড়ে দিলাম” – এগুলো তালাকের জন্য ব্যবহার হতে পারে, কিন্তু তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্বামীর নিয়ত অপরিহার্য। নিয়ত না থাকলে তালাক হয় না।
এখন আপনার বর্ণিত প্রতিটি ঘটনা বিশ্লেষণ করছি:
১ম ঘটনা: “চলে যাও। তোমাকে আর ধরে রাখতে পারলাম না।”
- এটি একটি কিনায়াহ শব্দ। স্বামী রাগ ও হতাশায় বলেছেন, তালাকের নিয়তে নন (যেমনটি তিনি পরে জানিয়েছেন)।
- ফলাফল: এতে কোনো তালাক পতিত হয়নি। কারণ তালাকের নিয়ত ছিল না।
দলিল:
“যদি স্বামী কিনায়াহ শব্দ উচ্চারণ করে কিন্তু তালাকের নিয়ত না করে, তবে তালাক পতিত হবে না।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭২)
২য় ঘটনা: “তুমিতো মুক্তই। যা ইচ্ছা করবা।”
- “মুক্ত” শব্দটিও কিনায়াহ। স্বামী হেসে-খেলে বলেছেন, এবং তিনি তালাকের নিয়তে বলেননি (বরং স্ত্রীর কথার জবাবে নিজেকে নির্দোষ বোঝাতে বলেছেন)।
- ফলাফল: এখানেও তালাক পতিত হয়নি।
দলিল:
“হাসি-ঠাট্টায় তালাক দিলে যদি শব্দ সরীহ হয় তবে তালাক পতিত হয়, কিন্তু কিনায়াহ হলে নিয়ত প্রয়োজন।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৩৪; সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৪৬৩)
৩য় ঘটনা: ঝগড়ার সময় “যেখানে ইচ্ছা যাও”, “যা ইচ্ছা কর” ইত্যাদি অস্পষ্ট কথা
- এগুলোও কিনায়াহ শব্দ। স্বামী তালাক দিতে রাজি ছিলেন না, বরং রাগের মাথায় বলেছেন।
- আপনি ও স্বামী উভয়েই বিস্তারিত মনে করতে পারছেন না।
- ইসলামী নীতি: সন্দেহ থাকলে তালাক প্রতিষ্ঠিত হয় না। মূলত বিবাহ অক্ষুণ্ণ থাকে।
- ফলাফল: এসব বক্তব্যের কারণে কোনো তালাক পতিত হয়নি।
দলিল:
“তালাক সন্দেহের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং নিশ্চয়তা জরুরি।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৩২; আল-হিদায়া, ২/৩৭৪)
৪র্থ ঘটনা: “যাও, ছেড়ে দিলাম” (হাত ছাড়ার জন্য) এবং পরে “তোমাকে ছেড়ে দিলাম” (হেসে বলা)
- প্রথম বক্তব্য (“যাও, ছেড়ে দিলাম”) হাত ছাড়ার জন্য, তালাকের উদ্দেশ্যে নয়।
- দ্বিতীয় বক্তব্য (“তোমাকে ছেড়ে দিলাম”) তিনি হেসে বললেও পরে তিনি বলেন যে, “আমিতো নিয়ত বলেছি”।
- স্বামীর নিজস্ব বক্তব্য অনুযায়ী তিনি এটি তালাকের নিয়তেই বলেছেন।
- হানাফি ফিকহে কিনায়াহ শব্দের ক্ষেত্রে স্বামীর নিয়তই চূড়ান্ত।
- ফলাফল: যদি স্বামী সত্যিই তালাকের নিয়তে “ছেড়ে দিলাম” বলেন, তবে একটি তালাকে রাজ‘ঈ (প্রত্যাবর্তনযোগ্য) পতিত হয়েছে।
ব্যাখ্যা:
তালাকে রাজ‘ঈ হওয়ার কারণে আপনি এখনও স্ত্রী হিসেবে গণ্য (ইদ্দতের মধ্যে থাকলে), এবং স্বামী ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নিতে পারবেন। ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে পৃথক হয়ে যাবেন।
সতর্কতা:
- স্বামী যদি বলেন যে, “আমি তালাকের নিয়তে বলিনি, কেবল টেনশন দূর করার জন্য বলেছি”, তবে তালাক পতিত হবে না।
- তবে তিনি ইতিমধ্যে “নিয়ত বলেছি” বলে স্বীকার করেছেন। তাই বাস্তবিক পক্ষে এক তালাক পতিত হয়ে থাকতে পারে।
দলিল:
“কিনায়াহ শব্দে তালাকের জন্য স্বামীর নিয়ত শর্ত। যদি স্বামী বলেন, ‘আমি তালাকের নিয়ত করেছি’, তবে তালাক পতিত হবে।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৫)
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
- ১ম, ২য় ও ৩য় ঘটনা: কোনো তালাক হয়নি।
- ৪র্থ ঘটনা: স্বামীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এক তালাকে রাজ‘ঈ পতিত হয়েছে বলে গণ্য হবে।
- আপনি যদি এখনও ইদ্দতের (৩ মাসিক) মধ্যে থাকেন, তবে স্বামী চাইলে ফিরিয়ে নিতে পারেন (মৌখিকভাবে বা সহবাসের মাধ্যমে)।
- ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে আপনার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে।
- পরবর্তী করণীয়:
- স্বামীকে খোলাখুলি জিজ্ঞাসা করুন, তিনি ৪র্থ ঘটনায় “ছেড়ে দিলাম” বলার সময় কি তালাকের নিয়ত করেছিলেন? যদি হ্যাঁ বলেন, তবে তালাক হয়েছে। যদি না করেন, তবে তালাক হয়নি।
- আপনি নিজেও যদি নিশ্চিত না হন, তবে এক তালাক হয়েছে ধরে নিয়ে ইদ্দত পালন করা উত্তম (সতর্কতামূলক)।
- ভবিষ্যতে ঝগড়ার সময় তালাকের মতো গুরুতর শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
আল্লাহ তায়ালা আপনার সম্পর্ক সুন্দর করে দিন।
মহান আল্লাহ অধিক জ্ঞানী।