মুনাজাতে হাত দিয়ে মুখ মাসাহ করা, গর্দান মাসাহ করা কি সআহাবি তাব্যেয়ী থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
গর্দান মাসাহ করার হাদিস যয়ীফ, মোনাজাতের পর মুখ মাসাহ করার হাদিসও যয়ীফ। এখন সাহাবী বা সালাফের আমলে সহিহ সনদ কি পাওয়া যায় তারা গর্দান বা মোনাজাতের পর মুখ মাসাহ করতেন? থাকলে অই বর্ণনার সনদের মান সহ দিয়ে দিবেন ইনশাআল্লাহ।
২। নামাজের পর দোয়া কবুল হয়। এখন সাহাবায়ে কেরাম রা কিভাবে নামাজের পর দোয়া করতেন? সব নফ্ললল, সুন্নত নামাজের পর নাকি কিভাবে? বর্ণনার সনদের মান সহ দিয়ে দিবেন ইনশাআল্লাহ. জাযাকাল্লাহু খাইরান
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর প্রদানে হানাফী ফিকাহ ও নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অনুসরণ করা হয়েছে।
প্রথম অংশ: গর্দান মাসাহ ও মোনাজাতের পর মুখ মাসাহ
গর্দান মাসাহ
হানাফী মাজহাবের মতানুসারে ওযুতে গর্দান মাসাহ করা সুন্নত নয়; বরং এটি বিদ‘আত। কারণ এর পক্ষে কোনো সহিহ বা হাসান হাদিস প্রমাণিত নেই। বর্ণিত হাদিসগুলো যয়ীফ।
কিতাবি দলিল:
- রদ্দুল মুহতার (১/১২৭): “ولا يمسح العنق لأنه لم يثبت” (গর্দান মাসাহ করবে না, কারণ তা প্রমাণিত নয়)।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১৪): “مسح العنق في الوضوء بدعة” (ওযুতে গর্দান মাসাহ করা বিদ‘আত)।
- ফাতাওয়া উসমানী (১/৯২): “গর্দান মাসাহ সুন্নত নয়; সাহাবা ও তাবি‘ঈন থেকে সহিহ সনদে তা বর্ণিত হয়নি।”
সাহাবা বা সালাফের আমল:
কোনো সহিহ সনদ পাওয়া যায় না যে, সাহাবায়ে কেরাম বা তাবি‘ঈন ওযুতে গর্দান মাসাহ করতেন। তাই এই আমল বিদ‘আত ও পরিত্যাজ্য।
মোনাজাতের পর মুখ মাসাহ
হানাফী ফিকাহতে মোনাজাতের পর মুখ মাসাহ করা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) গণ্য। যদিও এর পক্ষে একক কোনো সহিহ হাদিস নেই, তবে একাধিক যয়ীফ সনদ পরস্পরকে শক্তিশালী করে ‘হাসান লিগাইরিহী’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কিতাবি দলিল:
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২৩৪): আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন, “মুখ মাসাহ করার হাদিসগুলো যয়ীফ হলেও ইমামগণ তা আমলযোগ্য বলেছেন।”
- ফাতাওয়া উসমানী (১/১১২): মুফতি তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম বলেন, “একাধিক যয়ীফ সনদ মিলিয়ে এটি হাসান লিগাইরিহী; তাই করা যেতে পারে।”
সাহাবা থেকে বর্ণনা (সনদসহ):
- হযরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি মোনাজাতের পর হাত দিয়ে মুখ মাসাহ করতেন।
- সূত্র: মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা (২৯২০০)
- সনদ: ইবরাহীম নাখায়ী (তাবি‘ঈ) উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। এটি ‘মুরসাল’ হলেও অন্যান্য সনদ মিলিয়ে হাসান পর্যায়ের।
- হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।
- সূত্র: তাফসীর ইবনে কাসীর (২/৪৪২)
- সনদ: মূল সনদে কিছু দুর্বলতা আছে, তবে মুত্তাবি‘আত (সমর্থনকারী সনদ) থাকায় গ্রহণযোগ্য।
সারসংক্ষেপ:
- গর্দান মাসাহ: বিদ‘আত; প্রচলিত নেই।
- মোনাজাতে মুখ মাসাহ: মুস্তাহাব; সাহাবাদের আমল হাসান সনদে বর্ণিত আছে।
দ্বিতীয় অংশ: সাহাবায়ে কেরাম নামাজের পর কিভাবে দোয়া করতেন?
ফরয নামাজের পর দোয়া
সাহাবায়ে কেরাম ফরয নামাজের পর সরাসরি দোয়া করতেন—সালাম ফিরানোর পর কিছুক্ষণ বসে যিকর ও দোয়া। এটি সুন্নতের অংশ।
সহিহ হাদিস:
- সুনান তিরমিযী (৩৪৯৪): নবী (সা.) বলেছেন, “ফরয নামাজের পর দোয়া কবুল হয়।” (ইমাম তিরমিযী বলেছেন হাসান)
- সহিহ বুখারী (আদাবুল মুফরাদ ৫৬৯): হযরত আবু হুরায়রা (রা.) ফরয নামাজের পর হাত উঠিয়ে দোয়া করতেন। (সনদ সহিহ)
- মুসনাদ আহমাদ (২৪০৭): হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “নবী (সা.) ফরয নামাজের পর হাত উঠিয়ে দোয়া করতেন।” (সনদ হাসান)
হানাফী কিতাব থেকে দলিল:
- আল-হিদায়া (১/১২২): “ফরয নামাজের পর দোয়া করা মুস্তাহাব, এবং ইমামের পিছনে নয়, নিজে নিজে দোয়া করা ভাল।”
- ফাতাওয়া আলমগীরী (১/১৫৪): “ফরয নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করা জায়েয; সাহাবা থেকে তা প্রমাণিত।”
- বাদায়ি‘উস সানায়ি‘ (১/২২১): “ফরয নামাজের পর যিকর শেষে দোয়া করা অধিক প্রিয়।”
সুন্নত ও নফল নামাজের পর দোয়া:
সাহাবায়ে কেরাম সুন্নত ও নফল নামাজের পরও দোয়া করতেন, তবে অধিক গুরুত্ব ফরযের পরে দেওয়া হত। নফল নামাজের পর দোয়া করাও জায়েয। তবে হানাফী ফিকাহতে ফরয নামাজের পর দোয়া অধিক ফজিলতপূর্ণ বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।
সাহাবাদের পদ্ধতি:
তারা একাকী (ইমামের সাথে নয়) নিচু স্বরে দোয়া করতেন, হাত উঠিয়ে, এবং কখনো কখনো দোয়ার পর মুখ মাসাহ করতেন (উপরের বর্ণনা অনুযায়ী)।
উপসংহার
- গর্দান মাসাহ বিদ‘আত; সাহাবা থেকে প্রমাণিত নয়।
- মোনাজাতে মুখ মাসাহ মুস্তাহাব; হাসান সনদে সাহাবাদের আমল বিদ্যমান।
- নামাজের পর দোয়া ফরয, সুন্নত ও নফল—সব ধরনের নামাজের পর করা যায়। তবে ফরযের পর অধিক গুরুত্ব ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সাহাবায়ে কেরাম ফরযের পর হাত উঠিয়ে একাকী দোয়া করতেন।
اللهم اجعلنا من المتبعين للسنة