বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক পি এল সি তে চাকুরি করা কি জায়েজ ?
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-তে চাকরি করা কি হালাল?
প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার:
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি (পূর্বে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড)-এ চাকরি করা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে হালাল কি না।
উত্তরের ভিত্তি ও পদ্ধতি
আমরা হানাফী মাযহাবের মূল গ্রন্থ ও নির্ভরযোগ্য ফতোয়াগ্রন্থ থেকে দলিল-প্রমাণ সহকারে উত্তর দেব। বিশেষ করে নিম্নোক্ত কিতাব ও আলিমদের মতামত অগ্রাধিকার পাবে:
- ফতোয়ায়ে উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী)
- ইমদাদুল ফতোয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী)
- ফতোয়ায়ে আলমগীরী (আলমগীরিয়া ফতোয়া)
- আল-হেদায়া (মারগীনানী)
- শরহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবী)
- উসুলুশ শাশী
এছাড়া হানাফী ইমামগণের (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম তাহাবী) মূলনীতি অনুসরণ করা হবে।
সাধারণ মূলনীতি
ইসলামে আয়-রোজগার হালাল ও পবিত্র হতে হয়। মহান আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ
"হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি তা থেকে খাও।" (সূরা বাকারা: ১৭২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
طلب الحلال فريضة على كل مسلم
"হালাল উপার্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।" (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী)
অতএব, যে কোনো চাকরি বা ব্যবসায় সুদ (রিবা), জুয়া, ধোঁকাবাজি বা হারাম উপাদান থাকলে তা গ্রহণ করা জায়েয নয়।
সাধারণ ব্যাংকে চাকরি (সুদী ব্যাংক)
সুদী ব্যাংকে চাকরি করা হারাম ও কবিরা গুনাহ, কারণ সেখানে সুদের লেনদেন, হিসাব-নিকাশ, লেখালেখি ইত্যাদি সরাসরি সম্পৃক্ত থাকে। ইমাম ইবনে আবেদীন রহ. বলেন:
العمل في البنك الربوي حرام، سواء كان كاتباً أو محاسباً أو غير ذلك
"সুদী ব্যাংকে কাজ করা হারাম, সে লেখক হোক, হিসাবরক্ষক হোক বা অন্য কোনো পদেই থাকুক।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৮৬)
ফতোয়ায়ে আলমগীরীতে উল্লেখ আছে:
من كتب صكاً بالربا فهو ملعون
"যে ব্যক্তি সুদের দলিল লেখে, সে লানতপ্রাপ্ত।" (ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ৩/২১৪)
ইসলামী ব্যাংকে চাকরি
ইসলামী ব্যাংক যদি প্রকৃতপক্ষে শরিয়াহ-সম্মত পদ্ধতিতে (যেমন মুদারাবা, মুশারাকা, ইজারা, মুরাবাহা ইত্যাদি) কাজ করে এবং কোনো প্রকার সুদ বা হারাম লেনদেন না করে, তাহলে সেখানে চাকরি করা জায়েয এবং সওয়াবের কাজ হতে পারে। মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী রহ. বলেন:
إذا كان البنك إسلامياً حقاً، أي يلتزم بجميع أحكام الشريعة في معاملاته، فالعمل فيه جائز بل مطلوب
"যদি ব্যাংক সত্যিকার অর্থে ইসলামী হয়, অর্থাৎ তার সব লেনদেন শরিয়াহ অনুযায়ী হয়, তাহলে সেখানে কাজ করা জায়েয, বরং কাঙ্ক্ষিত।" (ফতোয়ায়ে উসমানী, ২/৪৬৮)
বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর বাস্তব অবস্থা
বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি নিজেকে ইসলামী ব্যাংক হিসেবে পরিচয় দেয় এবং এর একটি শরিয়াহ বোর্ড রয়েছে। তবে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে যে:
- ব্যাংকটি অনেক ক্ষেত্রে তাওয়াররুক (একপ্রকার বিকল্প সুদ) ব্যবহার করে, যা অনেক আলিমের মতে জায়েয নয়।
- কিছু লেনদেন বাস্তবে সুদের কাছাকাছি হয়।
- ব্যাংকের কার্যক্রমে শরিয়াহ কমপ্লায়েন্সের ঘাটতি দেখা যায়।
মুফতি তাকী উসমানী রহ. তার বিভিন্ন ফতোয়ায় বলেন:
أكثر البنوك الإسلامية اليوم ليست إسلامية حقيقية، بل هي بنوك ربوية تحت غطاء إسلامي
"অধিকাংশ ইসলামী ব্যাংক আজ সত্যিকারের ইসলামী নয়, বরং তারা ইসলামী আবরণে সুদী ব্যাংক।" (ফতোয়ায়ে উসমানী, ২/৫৩০)
ইমদাদুল ফতোয়ায় মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন:
اگر کسی ادارے میں شبہ ہو تو اس سے بچنا ضروری ہے
"যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সন্দেহ থাকে, তাহলে তা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।" (ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২৮)
হানাফী আলিমদের নির্দেশনাঃ
১. মুফতি শফী উসমানী রহ. (মাআরিফুল কুরআনে) বলেছেন: যেকোনো ব্যাংকের চাকরি গ্রহণের পূর্বে তার লেনদেনের পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখা অপরিহার্য।
২. মুফতি তাকী উসমানী রহ. তার ফতোয়ায়ে উসমানীতে আরো বলেন:
إذا كان البنك يخلط الحلال بالحرام، فلا يجوز العمل فيه إلا إذا كان الموظف في قسم خالٍ من الحرام تماماً
"যদি ব্যাংক হালাল ও হারাম মিশ্রিত করে, তবে সেখানে কাজ করা জায়েয নয়, যদি না কর্মচারী এমন বিভাগে কাজ করে যা সম্পূর্ণরূপে হারাম থেকে মুক্ত।" (ফতোয়ায়ে উসমানী, ২/৪৭২)
৩. আশরাফ আলী থানভী রহ. বেহেশতি জেওরে লিখেছেন: মুসলিমের উচিত সন্দেহযুক্ত জায়গা থেকে দূরে থাকা।
সুতরাং সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-তে চাকরি করা হালাল কিনা তা নির্ভর করে ব্যাংকটির প্রকৃত শরিয়াহ কমপ্লায়েন্সের ওপর। যেহেতু:
- অনেক আলিম ও গবেষক এই ব্যাংকের কার্যক্রমকে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহসম্মত মনে করেন না।
- ব্যাংকটি বিভিন্ন মুফতি ও ইসলামী পণ্ডিতের কাছ থেকে সমালোচিত হয়েছে।
অতএব, সতর্কতামূলক সিদ্ধান্ত হলো: যদি আপনি নিশ্চিত হন যে ব্যাংকটির সব লেনদেন শরিয়াহসম্মত, অথবা আপনি এমন একটি বিভাগে কাজ করছেন যেখানে কোনো প্রকার সুদি লেনদেন নেই (যেমন শুধু প্রশাসনিক কাজ, যেখানে সরাসরি সুদের লিখন বা গণনা নেই), তাহলে চাকরি করা জায়েয। কিন্তু যদি নিশ্চিত না হন বা জানেন যে ব্যাংকে সুদের লেনদেন হয়, তাহলে চাকরি করা যাবে না।
শ্রেষ্ঠ পন্থা: কোনো নির্ভরযোগ্য স্থানীয় আলিম বা মুফতির কাছে ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জেনে নিন এবং তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করুন।