ইসলামে মেয়েদের চাকরি করা কি জায়েজ?
Business and Job · Hanafi
Question
আমি বাংলাদেশের প্রথম সারির একটা পাবলিক ইউনিভার্সিটির অনার্স চতুর্থ বর্ষের একজন শিক্ষার্থী। ছোটো বেলা থেকেই পড়াশোনায় অনেক মনোযোগী ছিলাম এবং সর্বদা সেরা রেজাল্ট করায় সবার নজরে ছিলাম। পিতা-মাতা সহ সকল স্তরের শিক্ষকবৃন্দ আমায় নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতো এবং এখনো দেখে। আমি একসময় ভাবতাম দেশের প্রথম সারির কোনো কর্মকর্তা হবো। কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায় মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য, স্বপ্ন পাল্টে যায়।আমারো পাল্টে গেছে। আমি জানি - খুব প্রয়োজন ছাড়া মেয়েদের বাইরে কাজ করা ঠিক না। মেয়েদের প্রধান কর্মক্ষেত্র তার পরিবার। দ্বীনের বুঝ পাওয়ার পর থেকে পরিবার কে বুঝানোর চেষ্টা করেছি আলহামদুলিল্লাহ আমার সাথে সহমত পোষন করেছে কিন্তু তারপরও তারা মন থেকে চাই আমি কিছু করি। কিন্তু আমি মনে করি আমি যখন বাইরে ফোকাসড হবো তখন ঘরের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারবো না। এছাড়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে সম্পূর্ন পর্দা মেইনটেইন করে কিছু করতে পারবো। সবকিছু বিবেচনা করে আমি এ পর্যন্ত জব রিলিটেড কোনো প্রিপারেশন নেইনি। কারন আমি তো জব করবো না । বরং সেই সময় দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের পেছনে ব্যয় করছি। কারন আমি আমার ঘরকে আলোকিত করতে চাই। কিন্তু বর্তমানে চারপাশের নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেমন বিয়ের পর দাম্পত্য কলহ থেকে বিচ্ছেদ এসব দেখে অনেকে বলে জীবন অনেক কঠিন। নিজের একটা আইডেনটিটি থাকা উচিৎ যেন কঠিন পরিস্থিতিতে পায়ের নিচের মাটি না সরে যায়! এছাড়া পরিবারও চাই আমি কিছু করি যদিও বাইরে তারা আমার মতামত কে মূল্যায়ন করেছে। এছাড়া পরিচিত শিক্ষকবৃন্দ বলে সমাজ, দেশের প্রতি তোমার একটা দায়িত্ব আছে ! এসব শুনে মাঝে মাঝে একটু খারাপ লাগে।
এরূপ পরিস্থিতিতে আমার কি করা উচিৎ? বর্তমানে আমি IOM এর ৬ষ্ঠ সেমিস্টার এর একজন ত্বলিবা এবং কুরআনুল কারীম হিফজ চলমান।আমি যদি চাকরির জন্য প্রিপারেশন নিতে শুরু করি তাহলে আমি দ্বীনি জ্ঞান অর্জনে সময় দিতে পারবো না ।ফলে মানসিক প্রশান্তি হারিয়ে ফেলবো যা আমার জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলবে।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার দ্বীনি চেতনা, পরিবার ও সমাজের চাপ সত্ত্বেও নিজের করণীয় সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং দ্বীনি জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী হওয়া সত্যিই প্রশংসনীয়। আল্লাহ তাআলা আপনার এই নিয়তকে কবুল করুন এবং আপনাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন। আমিন।
মূলনীতি:
ইসলামে নারীর প্রধান কর্মক্ষেত্র তার ঘর-সংসার। কুরআন ও হাদিসে নারীদের ঘরে অবস্থান, সতর আবৃত রাখা এবং পরিবার পরিচালনায় মনোযোগী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
“তোমরা নিজ নিজ গৃহে অবস্থান কর এবং প্রাক-জাহেলিয়াতের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।” (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ، فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ
“নারী সতর (গোপনীয় বস্তু)। যখন সে ঘর থেকে বের হয়, শয়তান তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।” (তিরমিযি, হাদিস: ১১৭৩; সহিহ ইবন হিব্বান: ৫৫৯৮)
অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন ছাড়া নারীর বাইরে কাজ করা:
হানাফি ফিকহের আলোকে, নারীর জন্য বাইরে কাজ করা তখনই জায়েয, যখন তা অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন হয় (যেমন: নিজের বা পরিবারের ভরণপোষণের জন্য অন্য কোনো উপায় না থাকা) এবং শর্ত থাকে যে:
১. সম্পূর্ণ ইসলামি পর্দা (হিজাব ও লিবাস) রক্ষা করা।
২. পুরুষদের সাথে অবাধ মেলামেশা ও একাকী অবস্থান থেকে বিরত থাকা।
৩. কাজের পরিবেশ নিরাপদ ও ফেতনা থেকে মুক্ত হওয়া।
ইমাম ইবন আবিদীন রহ. বলেন:
“নারীর জন্য ঘর থেকে বের হওয়া জায়েয নয়, যদি না কোনো বৈধ প্রয়োজন থাকে। আর প্রয়োজন সেটাই যা শরিয়ত অনুমোদন করে।” (রদ্দুল মুহতার, ৬:৩৭০)
আপনার বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
- আপনার পরিবারের আর্থিক অবস্থা হয়তো চাপের মধ্যে নেই (যেহেতু আপনি চাকরিকে ‘খুব প্রয়োজন’ বলছেন না)।
- আপনার অন্তর দ্বীনি জ্ঞান ও কুরআন হিফজের প্রতি প্রবল আকর্ষণে আছে।
- আপনি নিজেও স্বীকার করছেন যে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ পর্দা রক্ষা করে কাজ করা প্রায় অসম্ভব।
- আপনার ইচ্ছা ঘরকে দ্বীনের আলোয় আলোকিত করা, যা নারীর জন্য সর্বোত্তম আমল।
সমাজ ও শিক্ষকদের কথার জবাব:
তারা “নিজের আইডেন্টিটি তৈরি” এবং “দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব” বলতে যা বোঝান, তা মূলত পার্থিব ও পাশ্চাত্য চিন্তাধারা। ইসলামে একজন নারীর পরিচয় তার দ্বীন, চরিত্র, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব এবং আখিরাতের প্রস্তুতির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ مَلْعُونٌ مَا فِيهَا إِلَّا ذِكْرَ اللَّهِ وَمَا وَالَاهُ وَعَالِمًا وَمُتَعَلِّمًا
“দুনিয়া অভিশপ্ত এবং এতে যা কিছু আছে তা অভিশপ্ত, তবে আল্লাহর জিকির, যা তার সাথে সম্পর্কিত (সৎকর্ম) এবং আলেম ও শিক্ষার্থী (জ্ঞানী ও জ্ঞানান্বেষী) ব্যতীত।” (তিরমিযি, হাদিস: ২৩২২)
তাই দ্বীনি জ্ঞান অর্জন ও কুরআন হিফজের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলা সমাজ ও দেশের প্রতি বড় দায়িত্ব পালন। আপনি একজন আলেমা বা দ্বীনি শিক্ষিকা হয়ে সমাজের অসংখ্য নারী-পুরুষকে সঠিক পথ দেখাতে পারেন, যা চাকরির চেয়ে অনেক বেশি ফলপ্রসূ।
আপনার করণীয়:
১. দ্বীনি জ্ঞান ও হিফজ চালিয়ে যান: এটি আপনার জন্য বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর ওয়াদা: যারা তাঁর পথে জ্ঞানার্জন করে, তিনি তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ নিশ্চিত করেন। (সূরা তালাক: ২-৩)
২. পরিবারকে বোঝান: তাদের ভালোবাসা ও উদ্বেগ বুঝুন, কিন্তু দৃঢ়তার সাথে জানান যে আপনি চাকরি না করে দ্বীনি জ্ঞান ও পরিবারকে সময় দিতে চান। আলহামদুলিল্লাহ, তারা আপনার দ্বীনি অবস্থানের সাথে সহমত; তাই এই পথে এগিয়ে যান।
৩. বিয়ের পর পরিস্থিতি: বর্তমান কিছু ঘটনা দেখে আতঙ্কিত না হয়ে শুদ্ধ ও দ্বীনদার স্বামী বেছে নেওয়ার জন্য দোয়া করুন। একটি দ্বীনি পরিবেশ ও দাম্পত্য জীবন আপনার দ্বীনি ও পার্থিব লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।
৪. সামাজিক চাপ উপেক্ষা করুন: যারা কাজের জন্য চাপ দিচ্ছেন, তাদের সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে বোঝানোর চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে আপনার শিক্ষক (ইসলামি স্কলার) থেকে সহায়তা নিন।
৫. যদি ভবিষ্যতে কোনো অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন হয় (যেমন স্বামী উপার্জনে অক্ষম বা অন্য কোনো বৈধ কারণ), তখন পর্দা ও শর্ত মেনে ঘরে বসে (অনলাইন টিউশনি, লেখালেখি ইত্যাদি) কাজ করতে পারবেন।
ফকিহ ও হানাফি উসুলের আলোকে:
ইমাম আবু হানিফা রহ. ও তাঁর অনুসারীদের মতে, নারীর জন্য বাইরে বের হওয়ার মূলনীতি হলো الضرورة (প্রয়োজন) এবং العرف (স্থানীয় প্রথা) এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। আপনার বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্বীনি জ্ঞান অর্জনকে ফরয কিফায়া-এর অন্তর্ভুক্ত এবং নারীর জন্য তা সর্বোত্তম কাজ। (ফাতাওয়া উসমানি, ২:২৩৫; রদ্দুল মুহতার, ১:২৭৩)
সারসংক্ষেপ:
- আপনি সঠিক পথেই আছেন। দ্বীনি জ্ঞান ও কুরআনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকাই আপনার জন্য বর্তমানে উত্তম।
- পরিবার ও সমাজের চাপ মেনে নিজের নিয়ত ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবেন না।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করুন এবং আপনার ঘরকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করুন। আমিন।