বাই মুয়াজ্জাল চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের পূর্বে মূল্য পরিশোধের শরয়ি বিধান
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
বাই মুয়াজ্জাল চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের পূর্বে মূল্য পরিশোধের বিধান
উত্তর
বাই মুয়াজ্জাল (বাকিতে বিক্রয়) চুক্তিতে যদি ক্রেতা নিজ ইচ্ছায়, কোনো প্রকার চাপ বা বাধ্যবাধকতা ছাড়াই নির্ধারিত সময়ের পূর্বে সম্পূর্ণ বা আংশিক মূল্য পরিশোধ করতে চায়, তাহলে বিক্রেতার জন্য সেই অর্থ গ্রহণ করা শরিয়তসম্মত ও জায়েজ। তবে এর সাথে কিছু শর্ত ও সতর্কতা জড়িত।
দলিল ও ব্যাখ্যা
১. কুরআন ও হাদিসের আলোকে
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের মধ্যে তোমাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, তবে তোমাদের পরস্পরের সম্মতিতে ব্যবসা করলে ভিন্ন কথা।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
কুরআনের এই আয়াতের ভিত্তিতে ব্যবসায়িক লেনদেনে উভয় পক্ষের সম্মতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যখন ক্রেতা নিজ ইচ্ছায় আগে টাকা দিতে চায় এবং বিক্রেতাও গ্রহণ করতে রাজি থাকে, তখন তা উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।
২. হানাফি ফিকহের দলিল
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে: বিক্রেতার জন্য নির্ধারিত সময়ের পূর্বে মূল্য গ্রহণ করা জায়েজ, তবে শর্ত থাকে যে এর বিনিময়ে ক্রেতাকে কোনো মূল্যছাড় (discount) দেওয়া হবে না। যদি মূল্যছাড় দেওয়ার শর্ত থাকে, তবে তা সুদ (রিবা) হিসেবে গণ্য হবে এবং নাজায়েজ হবে।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) 'রাদ্দুল মুহতার' গ্রন্থে বলেন:
"যদি ক্রেতা নির্ধারিত সময়ের পূর্বে ঋণ পরিশোধ করে এবং বিক্রেতা তা গ্রহণ করে, তবে তা জায়েজ। কিন্তু যদি ক্রেতা আগে পরিশোধের বিনিময়ে কিছু ছাড় দাবি করে বা বিক্রেতা আগে নেওয়ার শর্তে ছাড় দেয়, তবে তা নাজায়েজ।" (রাদ্দুল মুহতার, ৪/১৮৭)
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগিরি)-তে বর্ণিত:
"যদি কোনো ব্যক্তি নির্ধারিত সময়ের পূর্বে তার ঋণ পরিশোধ করে, তবে পাওনাদারের জন্য তা গ্রহণ করা জায়েজ। তবে এর বিনিময়ে কোনো লাভ বা ছাড় নেওয়া যাবে না।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৩/২০৭)
৩. মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম)-এর মত
মুফতি তাকি উসমানি সাহেব 'ফিকহি মাকালাত' গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
"বাই মুয়াজ্জাল চুক্তিতে ক্রেতা যদি নিজ ইচ্ছায় নির্ধারিত সময়ের পূর্বে সম্পূর্ণ বা আংশিক মূল্য পরিশোধ করতে চায়, তবে বিক্রেতার জন্য তা নেওয়া জায়েজ। কিন্তু এই আগাম পরিশোধের বিনিময়ে কোনো প্রকার কমিশন, মূল্যছাড় বা সুবিধা দেওয়া-নেওয়া জায়েজ নয়। যদি ক্রেতা আগে টাকা দেওয়ার কারণে 'ডিসকাউন্ট' দাবি করে বা বিক্রেতা তা দিতে রাজি হয়, তাহলে সেটা সুদ (রিবা) হিসেবে গণ্য হবে।" (ফিকহি মাকালাত, ১/২৩৪)
মূলনীতি ও শর্তসমূহ
১. স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়া: ক্রেতার আগাম পরিশোধ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় হতে হবে। কোনো চাপ, দাবি বা বাধ্যবাধকতা থাকলে তা শরিয়তসম্মত হবে না।
২. কোনো মূল্যছাড় নয়: আগাম পরিশোধের বিনিময়ে বিক্রেতা ক্রেতাকে কোনো প্রকার ছাড়, ডিসকাউন্ট বা কমিশন দিতে পারবেন না। এটি সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
৩. মূল চুক্তি অপরিবর্তিত: আগাম পরিশোধের কারণে মূল চুক্তির শর্তাবলি পরিবর্তন করা যাবে না। যেমন: মূল্যের পরিমাণ কমানো বা বাড়ানো।
৪. উভয় পক্ষের সম্মতি: বিক্রেতা যদি আগাম টাকা নিতে অস্বীকার করে, তবে তিনি তা করতে পারেন। তবে ক্রেতার ইচ্ছা থাকলে এবং বিক্রেতা রাজি থাকলে তা গ্রহণ করা জায়েজ।
বিশেষ সতর্কতা
ইসলামী শরিয়তে সময়ের পূর্বে ঋণ পরিশোধের বিনিময়ে ছাড় দেওয়া (যাকে আরবিতে "জাল" বলা হয়) নাজায়েজ এবং সুদের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদের মতে এটি সুদের শামিল। তাই এই বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
উপসংহার
বাই মুয়াজ্জাল চুক্তিতে ক্রেতা যদি নিজ ইচ্ছায়, কোনো প্রকার শর্ত বা দাবি ছাড়াই নির্ধারিত সময়ের পূর্বে সম্পূর্ণ বা আংশিক মূল্য পরিশোধ করতে চায়, তাহলে বিক্রেতার জন্য তা গ্রহণ করা শরিয়তসম্মত ও জায়েজ। তবে এর বিনিময়ে কোনো প্রকার মূল্যছাড়, ডিসকাউন্ট বা আর্থিক সুবিধা দেওয়া যাবে না।
আল্লাহ তাআলাই উত্তম জ্ঞানী।