আশুরার রোজা কি একটা রাখা যাবে?
Siyam-Fasting · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আশুরার রোজা শুধু একটিই রাখা (অর্থাৎ শুধু ১০ই মুহাররমের রোজা) হানাফি মাজহাব অনুযায়ী জায়েজ হলেও তা মাকরুহ তানযীহি (অপছন্দনীয়) বলে বিবেচিত। বরং সুন্নত ও অধিক সওয়াবের জন্য ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ মিলিয়ে রাখা উত্তম।
বিস্তারিত আলোচনা:
হাদিসের আলোকে:
আশুরার রোজা সম্পর্কে নবী কারীম (ﷺ) এর কয়েকটি হাদিস গুরুত্বপূর্ণ:
-
ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন আশুরার রোজা রাখলেন এবং সাহাবীদেরও তা রাখার নির্দেশ দিলেন, তখন সাহাবীরা আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই দিন ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা সম্মান করে থাকে।’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন:
“আগামী বছর ইনশাআল্লাহ আমরা নবম তারিখেও রোজা রাখব।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৪৪৫)এই হাদিস থেকে বুঝা যায়, রাসূল (ﷺ) ইহুদীদের সাথে সাদৃশ্য এড়াতে ৯ তারিখ যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তবে তাঁর ইন্তেকালের কারণে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
-
অন্য এক হাদিসে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত:
“তোমরা ইহুদীদের বিরোধিতা করো। তোমরা আশুরার আগে একদিন বা পরে একদিন রোজা রাখো।”
(মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২১৫৪; বাইহাকী, শুআবুল ঈমান)ইমাম আহমাদ ও ইমাম হানাফীদের নিকট এই হাদিসের ভিত্তিতে শুধু ১০ তারিখের রোজা রাখা মাকরুহ (অপছন্দনীয়) গণ্য।
হানাফি ফিকহের রায়:
-
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে: একমাত্র ১০ই মুহাররমের রোজা রাখা মাকরুহ তানযীহি। কারণ তাতে ইহুদীদের সাদৃশ্য হয়।
-
ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে: শুধু ১০ তারিখের রোজা জায়েজ হলেও উত্তম হলো ৯, ১০ ও ১১ তারিখ—অর্থাৎ তিন দিন অথবা ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ রাখা।
-
ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে উল্লেখ আছে:
“৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ রোজা রাখা সুন্নত; শুধু ১০ তারিখ রাখা মাকরুহ।”
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২০২) -
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:
“আশুরার রোজা একা রাখা উত্তম নয়; বরং ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ একসাথে রাখা চাই।”
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৬০) -
রাদ্দুল মুহতার (দুররে মুখতার)-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:
“আশুরার দিন একাকী রোজা রাখা মাকরুহ তানযীহি। তাই আগের বা পরের দিন মিলিয়ে রাখা মুস্তাহাব।”
(রাদ্দুল মুহতার, ২/৩৭৫)
প্রয়োজনীয় ব্যতিক্রম:
যদি কোনো ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত বা বাস্তব বাধ্যবাধকতার কারণে শুধু ১০ তারিখের রোজা রাখে, তাহলে তা আদায় হয়ে যাবে এবং কোনো গুনাহ হবে না, তবে সে সুন্নতের পূর্ণ সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে একাকী রাখা বর্জন করা উচিত।
উপসংহার ও নির্দেশনা:
- শুধু ১০ই মুহাররমের রোজা রাখা জায়েজ, তবে মাকরুহ তানযীহি (অপছন্দনীয়)।
- সর্বোত্তম পদ্ধতি: ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মিলিয়ে অন্তত দুই দিন রাখা।
- সম্ভব হলে: ৯, ১০ ও ১১—এই তিন দিন রাখা অধিক সওয়াবের এবং ইহুদী-খ্রিষ্টানদের সাদৃশ্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
সতর্কতা:
আশুরার দিন শুধু একাকী রোজা রাখা থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে যারা অসুস্থতা, ভ্রমণ বা অন্য কারণে এক দিনই রাখতে পারেন, তারা ১০ তারিখের রোজা রাখতে পারেন; এতে গুনাহ নেই, তবে সুন্নতের পরিপূর্ণতা লাভ করবে না।
প্রাসঙ্গিক কুরআন ও হাদিস:
- কুরআনে আশুরার রোজা সম্পর্কে সরাসরি আয়াত নেই, তবে হাদিসে উৎসাহিত করা হয়েছে।
- হাদিস: “রাসূল (ﷺ) কে আশুরার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: ‘এটি পূর্ববর্তী বছরের গুনাহের কাফফারা।’” (সহিহ মুসলিম)
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত গ্রন্থ:
- কুরআনুল কারিম (সূরা বাকারা: ১৮৪)
- সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/২০২)
- রাদ্দুল মুহতার (২/৩৭৫)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১৬০)
- বাহিশতী জেওর (৬ষ্ঠ অধ্যায়)
- মাআরিফুল কুরআন (আশুরার ব্যাখ্যা)