মুনাফা-বন্টন ভিত্তিক সাময়িক যৌথ ব্যবসা (নির্দিষ্ট সীমা সহ)
Business and Job · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমি একটি সফটওয়্যার কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর। আমরা চিকিৎসা খাতের জন্য সফটওয়্যার তৈরি করেছি, যা বর্তমানে একটি বড় হসপিটালে সফলভাবে চলছে। এখন এই তৈরি করা রেডি সফটওয়্যারটি দেশের অন্যান্য নতুন নতুন হসপিটালে বাণিজ্যিক বিক্রয়, মার্কেটিং এবং কোম্পানি পরিচালনার জন্য আমাদের পুঁজি বা ইনভেস্টমেন্ট প্রয়োজন।
(উল্লেখ্য, আমরা ইনভেস্টর দেরকে কোম্পানির মালিকানা দিবো না। প্রফিট শেয়ার করবো।)
আমরা সম্পূর্ণ শরীয়াহ সম্মত উপায়ে ইনভেস্টরদের কাছ থেকে "মুদারাবাহ" (Mudarabah) নিয়মে ইনভেস্টমেন্ট নেওয়ার জন্য একটি ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করেছি। মডেলটির শর্তসমূহ নিম্নরূপ:
১. বিনিয়োগ ও শ্রমের বিন্যাস: ইনভেস্টর শুধু পুঁজি দেবেন (তিনি হবেন রাব্বুল মাল) এবং আমাদের কোম্পানি মেধা ও শ্রম দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করবে (আমরা হব মুদারিব)।
২. মুনাফার উৎস স্পষ্টকরণ: আমাদের চলমান প্রথম প্রজেক্টের আয় এই চুক্তির বাইরে থাকবে। ইনভেস্টরের টাকা আসার পর, আমাদের এই রেডি সফটওয়্যারটি নতুন যেসব হসপিটালে বিক্রি বা লাইসেন্সিং করা হবে, শুধুমাত্র সেই নতুন প্রজেক্টগুলোর অর্জিত নেট প্রফিট (খরচ বাদে শুদ্ধ লাভ) থেকে ইনভেস্টরকে লভ্যাংশ দেওয়া হবে।
৩. লভ্যাংশের অনুপাত (PSR): প্রতি ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে ইনভেস্টরকে নতুন প্রজেক্টগুলোর মাসিক নেট প্রফিটের ১০% দেওয়া হবে। এভাবে তিনজন ইনভেস্টরের বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যেককে ১০% করে মাসিক নেট প্রফিটের ৩০% দেওয়া হবে। বাকি ৭০% আমাদের কোম্পানির তহবিলে থাকবে। (লাভ না হলে ইনভেস্টর কোনো টাকা পাবেন না)।
৪. প্রফিট ক্যাপ ও চুক্তি সমাপ্তি (Exit Cap): আমরা চুক্তিতে সফটওয়্যার কোম্পানির ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী একটি "১.৫X কিংবা ২X প্রফিট ক্যাপ" বা মুনাফার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছি। এর অর্থ হলো, প্রতি মাসে ১০% হারে নেট প্রফিটের লাভ দিতে দিতে যেদিন ইনভেস্টরের মোট প্রাপ্ত লভ্যাংশ তার মূল পুঁজির দেড়গুন কিংবা দ্বিগুণ (অর্থাৎ ১০ লাখের বিপরীতে মোট ১৫ লাখ কিংবা ২০ লাখ টাকা) পূর্ণ হবে, সেদিন চুক্তিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাপ্ত হয়ে যাবে। এরপর কোম্পানির লাভে তার আর কোনো অধিকার থাকবে না।
৫. লোকসানের দায়: ব্যবসায় স্বাভাবিক নিয়মে কোনো আর্থিক লোকসান হলে তা ইনভেস্টর তার পুঁজি থেকে বহন করবেন এবং আমাদের শ্রম ও সময় নষ্ট হবে। লস হলেও আসল টাকা ফেরত দিতে হবে—এমন কোনো শর্ত চুক্তিতে নেই।
সম্মানিত মুফতি সাহেবের কাছে আমাদের প্রশ্নসমূহ:
প্রশ্ন ১: মুদারাবাহ চুক্তিতে এভাবে লভ্যাংশ দিতে দিতে মোট মুনাফার একটি সর্বোচ্চ সীমা (২X প্রফিট ক্যাপ) নির্ধারণ করে চুক্তি সমাপ্ত করার এই পদ্ধতিটি শরীয়াহ অনুযায়ী বৈধ কি না?
প্রশ্ন ২: কোম্পানির সার্বিক লাভ থেকে অংশ না দিয়ে, শুধুমাত্র এই বিনিয়োগের পর অর্জিত "নতুন ক্লায়েন্ট বা প্রজেক্টের লাভ" থেকে ইনভেস্টরকে লভ্যাংশ দেওয়ার শর্ত করা কি শরীয়াহ সম্মত?
প্রশ্ন ৩: এই সামগ্রিক মডেলটির ওপর ভিত্তি করে আমরা ব্যবসা পরিচালনা এবং চুক্তিপত্র সই করতে পারব কি না? দয়া করে শরীয়াহর আলোকে বিস্তারিত জানাবেন।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রস্তাবিত মুদারাবাহ মডেলটি শরী‘আহ সম্মত কিনা তা বিচারের জন্য আমাদেরকে কুরআন, সহীহ হাদীস এবং সালাফে সালেহীনের (বিশেষ করে ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়িম, শাইখ ইবন বায, শাইখ আলবানী, শাইখ উসাইমীন ও শাইখ সালেহ আল-ফাওযান) ফতোয়ার আলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে।
নিচে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া হলো:
প্রশ্ন ১: মুদারাবাহ চুক্তিতে এভাবে লভ্যাংশ দিতে দিতে মোট মুনাফার একটি সর্বোচ্চ সীমা (২X প্রফিট ক্যাপ) নির্ধারণ করে চুক্তি সমাপ্ত করার পদ্ধতিটি শরীয়াহ অনুযায়ী বৈধ কি না?
উত্তর:
মুদারাবাহ চুক্তিতে মূলনীতি হলো লাভের অংশীদারিত্ব। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ إِلَّا شَرْطًا حَرَّمَ حَلَالًا أَوْ أَحَلَّ حَرَامًا»
“মুসলিমরা তাদের শর্তসমূহের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তবে যে শর্ত হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল করে তা ব্যতীত।” (তিরমিযী, হাদীস সহীহ; শাইখ আলবানী সহীহুল জামি‘-এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)
এই হাদীসের ভিত্তিতে চুক্তিতে শর্তের অনুমতি রয়েছে, যতক্ষণ তা হারাম কিছু বৈধ না করে বা বৈধকে হারাম না করে।
- মুনাফার সর্বোচ্চ সীমা (Profit Cap) নির্ধারণ করে চুক্তি সমাপ্তি – এটি একটি শর্ত মাত্র। যেহেতু ইনভেস্টর (রাব্বুল মাল) বুঝে শুনে এই শর্তে রাজি হচ্ছেন, আর এতে সরাসরি কোনো হারাম উপাদান (সুদ, জুয়া, গারার) নেই, তাই এটি বৈধ বলে গণ্য হবে।
- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন: “মুদারাবায় শর্ত আরোপ করা জায়েয, যদি তা মুনাফার ভাগের পদ্ধতি পরিবর্তন না করে বা অন্যায় সুবিধা সৃষ্টি না করে।” (মাজমূ‘ ফতোয়া, ২৯/৩০)
- তবে সতর্কতা: এটি যাতে সূদের মতো নিশ্চিত লাভের প্রতিশ্রুতি না দেয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ক্যাপটি শুধু সর্বোচ্চ সীমা, নিশ্চিত লাভ নয়।
অতএব, এই পদ্ধতি জায়েয, তবে উত্তম হলো চুক্তিটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (যেমন ৫ বছর) করা অথবা কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রজেক্ট শেষ হওয়া পর্যন্ত রাখা, যাতে সূদের সন্দেহ না হয়।
প্রশ্ন ২: কোম্পানির সার্বিক লাভ থেকে অংশ না দিয়ে, শুধুমাত্র এই বিনিয়োগের পর অর্জিত "নতুন ক্লায়েন্ট বা প্রজেক্টের লাভ" থেকে ইনভেস্টরকে লভ্যাংশ দেওয়ার শর্ত করা কি শরীয়াহ সম্মত?
উত্তর:
জী, এটি শরী‘আহ সম্মত। মুদারাবায় মূলধন ব্যবহার করে যে নির্দিষ্ট খাত বা প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়, তার লাভই অংশীদারদের মধ্যে বিতরণ করা যায়।
- আপনার কোম্পানির পুরনো প্রজেক্টে ইনভেস্টরের পুঁজি ব্যবহার হচ্ছে না, তাই সেই লাভ তার জন্য নয়।
- শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.)-এর মতে: “মুদারাবায় লাভ নির্ধারণ করা যায় নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসা বা প্রকল্পের জন্য, পুরো কোম্পানির জন্য নয়।” (আশ-শারহুল মুমতি‘, ৯/২৫৭)
- কুরআনের নির্দেশ:
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ}
“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের মধ্যে অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাস করো না, তবে তা ব্যবসা হলে পারস্পরিক সম্মতিতে ভিন্ন কথা।” (আন-নিসা ৪:২৯)
এখানে পারস্পরিক সম্মতিতে লভ্যাংশের উৎস নির্ধারণ করা জায়েয।
সুতরাং, শুধুমাত্র নতুন প্রজেক্টের লাভ থেকে ইনভেস্টরকে লভ্যাংশ দেয়া বৈধ।
প্রশ্ন ৩: এই সামগ্রিক মডেলটির ওপর ভিত্তি করে আমরা ব্যবসা পরিচালনা এবং চুক্তিপত্র সই করতে পারব কি না?
উত্তর:
হ্যাঁ, আপনি এই মডেলের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা ও চুক্তিপত্র সই করতে পারেন, তবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করুন:
১. লোকসানের দায়িত্ব: ইনভেস্টর (রাব্বুল মাল) শুধু তার পুঁজি হারাবেন। মুদারিব (আপনার কোম্পানি) লোকসানের অংশীদার নয়, তবে যদি গাফিলতি বা অন্যায় হয় তবে দায়ী হবে। এটি ফিকহের মূলনীতি:
الْخَرَاجُ بِالضَّمَانِ
“লাভের অধিকার তারই, যে ঝুঁকি বহন করে।” (আবূ দাউদ, হাদীস সহীহ; শাইখ আলবানী)
২. মুনাফার ভাগ: প্রতিটি পক্ষের ভাগ (৩০% ইনভেস্টর, ৭০% কোম্পানি) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে এবং মাসিক নেট প্রফিট থেকে গণনা করতে হবে (খরচ বাদ দিয়ে)।
৩. প্রফিট ক্যাপ: চুক্তিতে এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন যে, সর্বোচ্চ লভ্যাংশ (যেমন মূলধনের দ্বিগুণ) পাওয়ার পর চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হবে। এটি বৈধ শর্ত।
৪. গারার এড়ানো: চুক্তির সব শর্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হতে হবে। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ বা অনিশ্চিত শর্ত রাখবেন না।
শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেছেন: “মুদারাবায় শুধু লাভের অনুপাত জানা থাকলেই হবে, পুরো লাভের পরিমাণ জানা জরুরি নয়। কিন্তু চুক্তি সমাপ্তির পদ্ধতি স্পষ্ট হতে হবে।” (আল-মুলাখ্খাস আল-ফিকহী, ২/২৪২)
সারসংক্ষেপ:
- প্রস্তাবিত মডেলটি জায়েয।
- তবে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চুক্তিপত্র তৈরি করুন।
- কোনো শর্তে সূদের ছায়া থাকলে তা বাদ দিন।
- আপনার কোম্পানির রেডি সফটওয়্যার ও নতুন প্রজেক্টের খরচ ও লাভের হিসাব স্বচ্ছ রাখুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
(و الله أعلم بالصواب)