পিরিয়ড অবস্থায় কুরআন এর সুরাহ লেখা যাবে কি?
Sunnah and Bid'ah · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তরঃ পিরিয়ড অবস্থায় কুরআনের সুরা লেখা জায়েয
সারসংক্ষেপঃ পিরিয়ড অবস্থায় (হায়েয) নারী কুরআনের আয়াত বা সুরা লিখতে পারেন। এতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে শর্ত হলো, তিনি যেন সরাসরি মুসহাফ (কুরআনের কিতাব) স্পর্শ না করেন। লেখার মাধ্যমে তিনি মুসহাফ স্পর্শ করছেন না, বরং কাগজ বা বোর্ডে লিখছেন। এটি জায়েয হওয়ার পক্ষে কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফি আলেমদের ফতোয়া বিদ্যমান।
১. কুরআন ও হাদিসের দলিল
কুরআনে এসেছে, "লা ইয়ামাসসুহু ইল্লাল মুতাহহারূন" (সূরা আল-ওয়াক্বিয়া ৫৬:৭৯) — "এটি কেবল পবিত্র ব্যক্তিরাই স্পর্শ করে।" তাফসিরে প্রসিদ্ধ যে, এখানে "স্পর্শ করা" বলতে মুসহাফের উপর হাত রাখাকে বোঝানো হয়েছে, যা অপবিত্র অবস্থায় নিষিদ্ধ। কিন্তু লেখা স্পর্শের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কখনো পিরিয়ড অবস্থায় নারীদের কুরআন লিখতে নিষেধ করেননি। বরং তিনি আয়েশা (রাঃ)-কে হায়েয অবস্থায় মসজিদে এসে হজ্জের কাজ করতে দিয়েছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে ইবাদতের কিছু কাজ (যেমন কুরআন লেখা) নিষিদ্ধ নয়। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২৯৬)
মূলনীতি: যে কাজের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহতে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই, তা জায়েয। পিরিয়ড অবস্থায় কুরআন লেখার ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
২. সালাফি আলেমদের ফতোয়া
(ক) শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন:
“হায়েয অবস্থায় নারী কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে স্মৃতি থেকে, এবং পর্দা বা বাধার মাধ্যমে মুসহাফ স্পর্শ করতে পারে।” (মাজমু’ ফাতাওয়া, ২১/৪৬০)
এ থেকে বোঝা যায়, লেখার মাধ্যমে তিনি সরাসরি মুসহাফ স্পর্শ করেন না, তাই তা জায়েয।
**(খ) শায়খ ইবনে বায (রহঃ)**কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “একজন হায়েয অবস্থায় নারী কি তার সন্তানদের শেখানোর জন্য কুরআনের আয়াত লিখতে পারে?” তিনি উত্তর দেন:
“হ্যাঁ, সে কুরআনের আয়াত লিখতে পারে, কারণ এটি মুসহাফ স্পর্শ করার মতো নয়। তবে সে যেন নিজের হাতের মাধ্যমে সরাসরি আয়াতগুলো না ধরে (অর্থাৎ লিখার সময়ও যদি সে আয়াতের উপর হাত রাখে, তবে তা ঠিক নয়; তবে সে যদি কলম দিয়ে লিখে বা টাচ-স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাহলে কোনো সমস্যা নেই)।” (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ, ১/২৪২)
(গ) শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহঃ) বলেন:
“হায়েয অবস্থায় নারী কুরআনের আয়াত লিখতে পারে। এটি তার জন্য জায়েয, কারণ তিনি মুসহাফ স্পর্শ করছেন না। বরং তিনি কাগজে বা বোর্ডে লিখছেন। তবে উত্তম হলো যে তিনি লিখার সময় পর্দা (যেমন গ্লাভস) ব্যবহার করুন, যদি তিনি সরাসরি লিখিত আয়াত স্পর্শ করতে চান। কিন্তু সাধারণ নিয়মে কলম দিয়ে লেখায় কোনো বাধা নেই।” (মাজমু’ ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন, ১১/৯৯)
(ঘ) শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
“হায়েয অবস্থায় নারী কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে স্মৃতি থেকে, এবং সে কুরআনের আয়াত লিখতে পারে শিক্ষার জন্য। তবে তিনি যেন সরাসরি মুসহাফের পাতায় হাত না দেন। আর যদি তিনি ডিজিটাল ডিভাইস (মোবাইল, ট্যাব) থেকে কুরআন পড়েন বা লিখেন— সেটাও জায়েয।” (আল-মুনতাকা, ১/২৪৫)
৩. ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সতর্কতা
১. মুসহাফ স্পর্শ না করা: তিনি যদি কুরআনের একটি কপি (মুসহাফ) হাতে নিয়ে তা থেকে দেখে লিখতে চান, তাহলে সরাসরি মুসহাফ স্পর্শ করবেন না। বরং টেবিলে রেখে, বা কাপড়ের মাধ্যমে ধরবেন। ২. লিখিত কাগজের হুকুম: তিনি যে কাগজে কুরআন লিখেছেন, সেই কাগজকে মুসহাফের মতো সম্মান করতে হবে। কিন্তু তা স্পর্শ করার জন্য পবিত্রতা (ওযু) আবশ্যক নয়, কারণ এটি মুসহাফ নয় (এটি নোট বা খাতা)। তবে উত্তম হলো সম্মানসূচকভাবে পবিত্র হাতে স্পর্শ করা। ৩. রুকু-সিজদার আয়াত না লেখা: যদি তিনি সিজদার আয়াত লেখেন, তাহলে সেই কাগজ পড়ে গেলে সিজদা ওয়াজিব নয়, কারণ সিজদা শুধু তিলাওয়াতের সময় আবশ্যক। তবে এটি শুধু একটি সতর্কতা। ৪. ইলমি উদ্দেশ্য: লেখা যদি ইলম শিক্ষা, বা সন্তানদের শেখানো, অথবা নিজের মুখস্থ করার জন্য হয়— তাহলে তা অধিক উত্তম।
৪. খোলাসা
পিরিয়ড অবস্থায় একজন নারী কুরআনের সুরা বা আয়াত লিখতে পারেন। এটি জায়েয এবং কোনো গুনাহ নয়। নিষেধাজ্ঞা কেবল মুসহাফকে সরাসরি স্পর্শ করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আর লেখা স্পর্শের অন্তর্ভুক্ত নয়। সালাফি আলেমদের (ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনে বায, উসাইমীন, ফাওযান) ফতোয়া দ্বারা এটি প্রমাণিত।
আল্লাহু আলাম।