তালিম শেষে সম্মিলিত মোনাজাত ধরা কি বিদআত? মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা কি জায়েয? খাওয়া-দাওয়ার বিধান কী?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
তাহলে এত এত হুজুর আছে যাদেরকে সম্মিলিত মোনাজাত মোনাজাত ধরে দোয়া করতে দেখি মানুষের জন্য ইসালে সওয়াবের জন্য। বাকিরা আমিন আমিন বলে। তাহলে এটাও কি বিদআত? আমরা যদি মুনাজাত ধরে দুআ করতাম মৃত ব্যাক্তির জন্য তাহলে এটা কি বিদআত হতো??
আমরা যে অবস্থা শীল মানুষ রা খেলাম এটা কি খারাপ হলো??
আপা বললো শ্বশুর এর জন্য খাওয়ানো উদ্দেশ্য হলে খাবনা।
Answer
সম্মিলিত মোনাজাত ও ঈসালে সাওয়াব: একটি বিশ্লেষণ
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রশ্নে উল্লিখিত বিশেষ পদ্ধতিতে (তালিম শেষে বিশেষভাবে ঘোষণা করে সম্মিলিত মোনাজাত ধরা এবং বিশেষভাবে মৃত ব্যক্তির নাম নিয়ে ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে দোয়া করা) বিদআত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তবে মোনাজাত নিজে বিদআত নয়; বরং এটিকে বিশেষ ইবাদত হিসেবে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পালন করাই বিদআত। আর শুধু খাওয়া-দাওয়া করা (ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত ছাড়া) জায়েয।
বিস্তারিত আলোচনা
১. বিদআতের সংজ্ঞা
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ
"যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন বিষয় সৃষ্টি করল যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।" — সহীহ বুখারী: ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম: ১৭১৮
ইমাম শাতিবী (রহ.) বলেন, বিদআত হলো দ্বীনের মধ্যে এমন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা যা শরীয়তের দলিল দ্বারা প্রমাণিত নয়, অথচ তাকে দ্বীনি ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। (আল-ই'তিসাম)
২. সম্মিলিত মোনাজাতের বিধান
মূলত দোয়া ও মোনাজাত একটি বৈধ ইবাদত। তবে কোনো নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান বা তালিমের শেষে বাধ্যতামূলক বা সুন্নত হিসেবে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সম্মিলিত মোনাজাত ধরা — যা রাসূল ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত নয় — তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।
ইমাম ইবনে আবিদিন শামী (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:
"দ্বীনের মধ্যে এমন বিষয় সংযোজন করা যা সালাফে সালেহীন থেকে প্রমাণিত নয়, তা বিদআত।" — রাদ্দুল মুহতার: ১/৩৭৬
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়া-য় বলেন:
"মোনাজাত নিজে জায়েয, কিন্তু তাকে নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বানানো এবং সবাই মিলে একসাথে উচ্চস্বরে মোনাজাত করা — এ পদ্ধতি সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত নয়।" — ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/২৪৫
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী জেওর-এ বলেন:
"মোনাজাতের জন্য হাত উঠানো সুন্নত, কিন্তু সম্মিলিতভাবে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মোনাজাত করা এবং তাকে আবশ্যক মনে করা বিদআত।" — বেহেশতী জেওর
৩. মৃত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে দোয়া
মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা সম্পূর্ণ জায়েয ও মুস্তাহাব। রাসূল ﷺ জানাযার পর মৃতের জন্য দোয়া করতেন। (সহীহ মুসলিম: ৯৬৩)
তবে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, বিশেষভাবে ঘোষণা দিয়ে, সম্মিলিতভাবে মোনাজাত ধরে মৃতের জন্য ঈসালে সাওয়াবের নিয়তে দোয়া করা — এ বিশেষ পদ্ধতি শরীয়তে প্রমাণিত নয়। এটি "বিদআত"-এর অন্তর্ভুক্ত।
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানী-তে বলেন:
"মৃতের জন্য দোয়া করা জায়েয, কিন্তু বিশেষ অনুষ্ঠান করে সম্মিলিত মোনাজাতের মাধ্যমে ঈসালে সাওয়াবের যে প্রথা প্রচলিত হয়েছে, তা সালাফ থেকে প্রমাণিত নয়; তাই পরিহার করা উচিত।" — ফাতাওয়া উসমানী: ১/৩৪৫
৪. "এত হুজুর আছেন যারা সম্মিলিত মোনাজাত ধরেন" — এর জবাব
কোনো আমল বহু লোকের practiced হওয়া তার বৈধতার দলিল নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ
"যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের আনুগত্য করেন, তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।" — সূরা আল-আনআম: ১১৬
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর উসূল অনুযায়ী, সংখ্যাধিক্যের অনুসরণ নয়; বরং দলিলের অনুসরণ। (উসূলুশ শাশী)
৫. খাওয়া-দাওয়ার বিষয়
ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত ছাড়া শুধু খাওয়া-দাওয়া করা জায়েয। কিন্তু যদি বিশেষভাবে মৃতের ঈসালে সাওয়াবের নিয়তে খাবার আয়োজন করা হয় এবং লোকদেরকে জমায়েত করা হয় — তবে তা বিদআতের সূচনা হতে পারে, বিশেষত যদি তা নিয়মিত প্রথায় পরিণত হয়।
ইমাম আহমাদ রেযা খান বেরলভী-এর মতের বিপরীতে হানাফী ফিকহের মূল অবস্থান হলো: মৃতের জন্য খাবার বিতরণ করা জায়েয, তবে বিশেষ অনুষ্ঠান ও জমায়েত করে করা বিদআত।
ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:
"মৃতের জন্য খাবার বিতরণ করা জায়েয, তবে তা নিয়মিত প্রথা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।" — ফাতাওয়া আলমগীরী: ১/১৬৬
৬. প্রশ্নকর্তার নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | তালিম শেষে সম্মিলিত মোনাজাত ধরা কি বিদআত? | হ্যাঁ, বিশেষ পদ্ধতিতে ঘোষণা করে সম্মিলিত মোনাজাত ধরা বিদআত। তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে দোয়া করলে জায়েয। | | মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা কি বিদআত? | না, মৃতের জন্য দোয়া করা জায়েয ও মুস্তাহাব। কিন্তু বিশেষ অনুষ্ঠান করে সম্মিলিত মোনাজাতের পদ্ধতি বিদআত। | | হুজুররা সম্মিলিত মোনাজাত ধরেন — এটা কি বিদআত? | হ্যাঁ, যদি তা বিশেষ পদ্ধতিতে হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ দোয়া ও মোনাজাত জায়েয। | | অবস্থাশীল মানুষরা খেলাম — খারাপ হলো? | না, শুধু খাওয়া-দাওয়া করা জায়েয। তবে ঈসালে সাওয়াবের নিয়তে বিশেষ আয়োজন হলে সতর্কতা প্রয়োজন। | | শ্বশুরের জন্য খাওয়ানো উদ্দেশ্য হলে খাব না — এটা কি ঠিক? | এটা ঠিক নয়। মৃতের জন্য খাবার বিতরণ করা জায়েয; তবে বিশেষ অনুষ্ঠান ও জমায়েত করে করা বিদআত। |
সতর্কতা ও পরামর্শ
১. তালিমের পর সম্মিলিত মোনাজাত ধরা — যদি এটি নিয়মিত প্রথা হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে তা বিদআত। তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে দোয়া করলে কোনো সমস্যা নেই।
২. মৃতের জন্য দোয়া করা — সম্পূর্ণ জায়েয। তবে বিশেষ অনুষ্ঠান করে, বিশেষ ঘোষণা দিয়ে, সম্মিলিতভাবে মোনাজাত ধরে ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত করা — এ পদ্ধতি শরীয়তে প্রমাণিত নয়।
৩. খাওয়া-দাওয়া — শুধু খাওয়া-দাওয়া করা জায়েয। তবে ঈসালে সাওয়াবের নিয়তে বিশেষ আয়োজন ও জমায়েত করা বিদআতের সূচনা হতে পারে।
৪. সর্বোত্তম পন্থা — মৃতের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দোয়া করা, সদকা করা, কুরআন তিলাওয়াত করে সাওয়াব পৌঁছানো। এগুলো শরীয়তসম্মত।
উপসংহার
প্রশ্নে উল্লিখিত পদ্ধতিতে (তালিম শেষে বিশেষভাবে ঘোষণা করে সম্মিলিত মোনাজাত ধরা এবং বিশেষভাবে মৃতের নাম নিয়ে ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে দোয়া করা) বিদআত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তবে মোনাজাত নিজে বিদআত নয়; বরং এটিকে বিশেষ ইবাদত হিসেবে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পালন করাই বিদআত। আর শুধু খাওয়া-দাওয়া করা (ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত ছাড়া) জায়েয।
সর্বোত্তম পন্থা: মৃতের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দোয়া করা, সদকা করা, কুরআন তিলাওয়াত করে সাওয়াব পৌঁছানো। সম্মিলিত মোনাজাতের প্রথা পরিহার করা।