দোআ প্রসঙ্গে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার যখন কোনো বিষয় নিয়ে টেনশন কাজ করে বা অশান্তি লাগে মনে তখন আমি হিসনুল মুসলিম অ্যাপে কুরআনের দোআ অংশে গিয়ে দোআগুলো এমনি randomly পড়তে থাকি। মানে স্ক্রল করে যেটা সামনে আসে সেটাই পড়ি এমন। এখন অবস্থা যেটাই হোক না কেন মানে যে কারণেই মন খারাপ হোক, ভালো না লাগুক অবস্থার সাথে মিলে এমন আয়াত পাই আলহামদুলিল্লাহ কিন্তু সাথে এই দুই আয়াত থাকেই : [১০:২২], [১১:৪৪]। এগুলো নৌযান সংক্রান্ত আয়াত। আমার নৌযানে উঠার সাহস নেই। আমি পানি অনেক বেশি ভয় পাই। আমার চড়ার প্রয়োজনও হয়নি কখনো আলহামদুলিল্লাহ।
আমার প্রশ্ন :
১. এই যে এভাবে দোআ পড়াটা কি বিদআত হচ্ছে?
২. প্রতিবার এই আয়াতগুলো কেন আসে? আমি স্ক্রল করি একবার উপরে যাই, আবার নিচে যাই এভাবে করে যেকোন একটা সিলেক্ট করি। যেটা আসে সেটা পড়ে আবার একইভাবে উপর-নিচে স্ক্রল করে যেকোন একটা সিলেক্ট করে পড়ি। নির্দিষ্ট একটার পর একটা পড়তে থাকি না। এই দুই আয়াত একদম ফিক্সড থাকেই। এটার কি কোনো নির্দিষ্ট কারণ আছে? মানে এটা দ্বারা কি পানিতে বিপদ হতে পারে এমন কিছুর জন্য বোঝাচ্ছে?
জাযাকুমুল্লাহু খয়রন ফিদ্দুনইয়া ওয়াল আখিরহ।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার মনে তৈরি হওয়া সংশয় ও উদ্বেগ দূর করার জন্য ফিকহে হানাফী ও প্রামাণ্য ফাতাওয়া কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ দুটি প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট শরঈ ফয়সালা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. ১ম প্রশ্নের উত্তর: এভাবে র্যান্ডমলি দোআ পড়া কি বিদআত হচ্ছে?
মূল সিদ্ধান্ত: না, আপনার এভাবে অ্যাপ থেকে মনের প্রশান্তির জন্য পবিত্র কুরআনের দোআ বা আয়াত বেছে নিয়ে পড়া শরীআতের দৃষ্টিতে বিদআত হবে না; বরং তা জায়েয। তবে উত্তম হল, ধারাবাহিকভাবে একাগ্রতার সাথে কুরআন তিলাওয়াত করা।
ফিকহী ব্যাখ্যা:
১. বিদআতের শরঈ সংজ্ঞা: ফিকহে হানাফী অনুযায়ী বিদআত হলো— দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো নতুন বিষয় বা নিয়ম তৈরি করা যা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়, কিন্তু তাকে শরীআতের সুনির্দিষ্ট আবশ্যক (ওয়াজিব বা সুন্নাত) বিধান মনে করে বাধ্যতামূলকভাবে পালন করা হয়। ২. কুরআন তিলাওয়াত ও দোআর হুকুম: মন খারাপ বা মানসিক অস্থিরতার সময় আল্লাহর জিকির করা, পবিত্র কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা বা দোআ পড়া একটি সাধারণ ও পছন্দনীয় ইবাদত (ইবাদতে আম্মাহ)। ৩. বর্তমান সুরতের বিধান: আপনি অ্যাপ থেকে যখন যে দোআটি চোখের সামনে আসে, তা কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা বাধ্যতামূলক নিয়ম মনে না করে কেবল মনের প্রশান্তি ও আল্লাহর আশ্রয় লাভের জন্য পড়ছেন। শরীআতে এই ধরনের সাধারণ তিলাওয়াত বা দোআ পড়াকে বিদআত বলার কোনো সুযোগ নেই; বরং এটি একটি মুস্তাহাব ও নেক আমল।
২. ২য় প্রশ্নের উত্তর: নির্দিষ্ট দুই আয়াত (১০:২২ ও ১১:৪৪) বারবার আসা এবং পানিতে বিপদের আশঙ্কা সংক্রান্ত বিধান
মূল সিদ্ধান্ত: না, এটি আপনার পানিতে কোনো বিপদ হওয়ার সংকেত বা অমঙ্গলের লক্ষণ নয়। এ নিয়ে ভয় পাওয়া বা চিন্তিত হওয়ার কোনো শরঈ বা বাস্তব কারণ নেই।
ফিকহী ও আকীদাগত ব্যাখ্যা:
১. প্রযুক্তিগত (Digital) কারণ: হিসনুল মুসলিম অ্যাপের স্ক্রলিং বা অ্যালগরিদমের নিজস্ব লেআউট/ইন্ডেক্সিংয়ের কারণে ওই নির্দিষ্ট অংশে স্ক্রল করলে বারবার একই আয়াত সামনে চলে আসতে পারে। এটি অ্যাপের একটি সাধারণ কারিগরি বিষয়; এর সাথে কোনো গায়েবী সংকেত বা অশুভ ইশারার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।
২. অশুভ লক্ষণ (বদফাল / Ṭiyarah) মনে করার শরঈ নিষেধাজ্ঞা: ইসলামে কোনো ঘটনা, সংখ্যা বা বারবার দৃশ্যমান কোনো বিষয় দেখে নিজের ভবিষ্যতে বিপদ আসবে মনে করাকে 'বদফাল' (بدشگونی / Ṭiyarah - অশুভ লক্ষণ) বলা হয়, যা শরীআতে অকাট্যভাবে নিষিদ্ধ ও গোনাহের কাজ। রাসুলুল্লাহ ﷺ স্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেছেন:
«لاَ طِيَرَةَ» (অর্থ: "ইসলামে কোনো অশুভ লক্ষণ বা বদশগুনের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।") (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম; ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ২১/৩৩)।
৩. শয়তানি ওয়াসওয়াসা (ভীতি সৃষ্টি): যেহেতু আপনার পানি ও নৌযানের প্রতি আগে থেকেই একটি স্বাভাবিক ভয় রয়েছে, তাই শয়তান এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আপনার মনে ভীতি ও দুশ্চিন্তা ঢুকিয়ে দিচ্ছে । পবিত্র কুরআনের প্রতিটি আয়াতই বরকতময় ও শিফা। সুরা ইউনুসের [১০:২২] ও সুরা হুদের [১১:৪৪] আয়াত দুটি আল্লাহর কুদরত ও পানি/নৌযানের নিয়ামতের আলোচনা মাত্র; একে নিজের জন্য ক্ষতিকর মনে করা কেবলই শয়তানের ওয়াসওয়াসা।
সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
-
ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (৩য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩২, ৩৩ (মাহমুদিয়া ৩/৩২, ৩৩) (অধ্যায়: বাবুল বিদআত ওয়াল রুসূম — 'বিদআতের শরঈ সংজ্ঞা ও ইবাদতের নিজস্ব সীমানা') ।
- পৃষ্ঠা: ৯৫ (মাহমুদিয়া ৩/৯৫) (অধ্যায়: বাবুল বিদআত — 'সওয়াবের নিয়তে সাধারণ দোআ ও তিলাওয়াত বিদআত না হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া')।
-
ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩৩ (মাহমুদিয়া ২১/৩৩) (অধ্যায়: বাবুল বদশগূনী — 'ما يتعلق بالسعادة والنحوسة — অশুভ লক্ষণ বা বদফাল গণনার শরঈ নিষেধাজ্ঞা এবং لا طيرة হাদীসের বিবরণ')।
-
ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৯৫, ১৯৬ (মাহমুদিয়া ১/১৯৫, ১৯৬) (অধ্যায়: বাবুল ওয়াসওয়াসাহ — 'دينيات میں وسوسہ اور اس كا علاج — শয়তানি ওয়াসওয়াসা ও মন থেকে অহেতুক ভয় দূর করার শরঈ উপায়')।
والله أعلم بالصواب