সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ইসলামে দুআ করা যাবে কি?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: বন্ধুর নিকাব পরা নিয়ে দুশ্চিন্তা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির দুআ
প্রশ্নের সারমর্ম
একটি বোন জানতে চেয়েছেন—তাঁর এক বান্ধবী নিকাব পরলে বেশি সুন্দর লাগে, কিন্তু বাস্তবতার সাথে মেলে না। বাইরের মানুষেরা ভাবে তিনি অনেক সুন্দর, অথচ তিনি তেমন নন। এই বিষয়টি নিয়ে বান্ধবী মানসিকভাবে কষ্ট পান (depressed)। জানতে চেয়েছেন—সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য দুআ করা যাবে কি? এবং অনেকে তাঁকে দেখে বললে "তুমি তো বাইরে থেকে অনেক সুন্দর দেখাও"—এতে তিনি কষ্ট পান।
১. সৌন্দর্য আল্লাহর দান — এটি নিয়ে হীনম্মন্যতা বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা উচিত নয়
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَاءُ ۚ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ "তিনিই মাতৃগর্ভে তোমাদের আকৃতি দান করেন, যেভাবে তিনি চান। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" — (সূরা আলে ইমরান: ৬)
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ "নিশ্চয়ই আমি আদম-সন্তানকে সম্মানিত করেছি।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ৭০)
সৌন্দর্য আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি নিয়ামত, কিন্তু এটি মানুষের মূল্য বা মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।" — (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৬৪; মুসনাদে আহমাদ)
ফিকহি দৃষ্টিকোণ: নিজের চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, হীনম্মন্যতা বা depression-এ ভোগা ইসলামে নিন্দনীয়। এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। বরং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতে সন্তুষ্ট থাকা ঈমানের علامت। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, কিতাবুল হাযর; মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আলে ইমরান ৬-এর তাফসীর)
২. নিকাব পরা নিয়ে মানুষের মন্তব্য — এটি নিকাবের দোষ নয়
নিকাব শুধু চেহারার কিছু অংশ ঢাকে; এটি সৌন্দর্য "বাড়ায়" না, বরং পর্দার বিধান পালন করে। কেউ নিকাব পরা অবস্থায় সুন্দর দেখালে বা না দেখালে—এটি নিকাবের উদ্দেশ্য নয়। নিকাবের উদ্দেশ্য হলো সতর ঢাকা ও আল্লাহর হুকুম পালন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ "তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তবে যা প্রকাশ পায় তা ছাড়া; এবং তারা যেন নিজেদের ওড়না বক্ষদেশে ফেলে দেয়।" — (সূরা নূর: ৩১)
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ "হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মুমিন নারীদের বলুন—তারা যেন নিজেদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়।" — (সূরা আহযাব: ৫৯)
গুরুত্বপূর্ণ কথা: মানুষের প্রশংসা বা সমালোচনা—দুটোই ক্ষণস্থায়ী। নিকাব পরিধানের মূল লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি। কেউ যদি বলে "তুমি বাইরে থেকে সুন্দর দেখাও"—এটি তাদের ধারণা মাত্র; এতে কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই। বরং এটি নিকাবের বরকত হিসেবে দেখুন যে, নিকাব মানুষকে সম্মান ও সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখায়।
৩. সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য দুআ করা যাবে কি?
হ্যাঁ, জায়েয। তবে শর্ত হলো—এটি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, কোনো জাদু-টোনা বা হারাম উপায় নয়। নিম্নলিখিত দুআগুলো করা যেতে পারে:
(ক) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো দুআ
اللَّهُمَّ أَنْتَ حَسَّنْتَ خَلْقِي فَحَسِّنْ خُلُقِي "হে আল্লাহ! আপনি আমার আকৃতি সুন্দর করেছেন, সুতরাং আমার চরিত্রও সুন্দর করুন।" — (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৩৮২২; সহীহ ইবনে হিব্বান)
(খ) হাসান-সৌন্দর্যের দুআ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْحُسْنَ وَالْجَمَالَ "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে সৌন্দর্য ও রূপ প্রার্থনা করছি।"
(গ) সর্বোত্তম দুআ — আয়নায় চেহারা দেখার সময়
اللَّهُمَّ كَمَا حَسَّنْتَ خَلْقِي فَحَسِّنْ خُلُقِي (উপরের দুআটিই)
(ঘ) সূরা ত্বীন পাঠ করা
কিছু আলেম সৌন্দর্য ও আকৃতির জন্য সূরা ত্বীন (সূরা ৯৫) নিয়মিত পাঠ করার পরামর্শ দেন, কারণ এতে "أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ" (সর্বোত্তম আকৃতি) শব্দ রয়েছে। তবে এটি কুরআনের বরকত হিসেবে পড়া যাবে, কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা পদ্ধতি শরীয়তে প্রমাণিত নয়।
সতর্কতা: জাদু, তাবিজ, হারাম উপায়, বা অশরীয় পদ্ধতিতে সৌন্দর্য বৃদ্ধির চেষ্টা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (দেখুন: ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪; রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাযর)
৪. বান্ধবীর depression নিয়ে করণীয়
১. তাকে বোঝান—সৌন্দর্য আল্লাহর দান, এটি নিয়ে দুশ্চিন্তা করা ঈমানের দুর্বলতা। মানুষের মন্তব্য আল্লাহর কাছে কোনো মূল্য রাখে না।
২. নিকাবের উদ্দেশ্য স্মরণ করান—নিকাব সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়, পর্দা ও আল্লাহর হুকুম পালনের জন্য। কেউ সুন্দর দেখুক বা না দেখুক—নিকাবের সওয়াব ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে।
৩. নিজের প্রশংসা বা সমালোচনায় কান না দেওয়া—রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ أَصْبَحَ مُعَافًى فِي بَدَنِهِ، آمِنًا فِي سِرْبِهِ، عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ، فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيَا "যে ব্যক্তি সুস্থ শরীর, নিরাপদ বাসস্থান ও দিনের খাবার পেয়ে সকালে উঠল—সে যেন পুরো দুনিয়া পেয়ে গেল।" — (তিরমিজি, হাদিস নং ২৩৪৬)
৪. দুআ ও যিকির বাড়ান—"আলহামদুলিল্লাহ" বেশি বলুন, আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করুন।