একটি ওষুধ কোম্পানিতে প্রতারণামূলক কাজ ও সিগারেট প্যাকেজিং কোম্পানিতে চাকরির ইসলামিক হুকুম
Business and Job · Hanafi
Question
আমি ওষুধ কোম্পানিতে কোয়ালিটি হেড হিসেবে কর্মরত আছি। দ্বায়িত্বরত হিসেবে অনেক সময় কিছু কিছু সিদ্বান্ত দিতে হয় , যা আসলে স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী দেয়া ঠিক না , ঐসব সিদ্বান্তের কারণে কোনো কোনো সময় ওষুধের কমপ্লেইন্ট আসতে পারে , কোনো কোনো সময় সব নিয়ম সঠিকভাবে মেনে কাজ করার মতো ফেসিলিটি কোম্পানিতে থাকে না , তাই চাকরির কারণে বাধ্য হয়ে কাজ করতে হয় , সেই সাথে টেনশন ও থাকতে হয় যে যদি রোগীর কোনো সমস্যা হয় তাহলে আমি বিপদে পড়তে পারি। আবার রোগী যেহেতো আমাদের উপর বিশ্বাস করে ওষুধ খাচ্ছে তাই কোনো সমস্যা না হলেও , রোগীর অজান্তে আমি তার বিশ্বাস ভঙ্গ করলাম , বান্দার হক নষ্ট করলাম।
এই অবস্থায় আমার কাছে অন্য একটা চাকরির অফার আসছে , যারা প্যাকেজিং মেটেরিয়াল বানায় ফুড এন্ড বেভারেজে কোম্পানির জন্য। এবং ওনারা সিগারেট কোম্পানির জন্য সিগারেট মোড়ানোর কাগজ ও বানায় , সেখানে আমাকে অফার করা হয়েছে সবকিছুর কোয়ালিটি হেড হিসাবে কাজ করার জন্য ,
আমার প্রশ্ন হচ্ছে , ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ এবং প্রাক্টিসিং মুসলিম হিসাবে আমি প্যাকেজিং কোম্পানিতে কাজ করা হালাল হবে কিনা বা ইসলামিক ভাবে জায়েজ হবে কিনা ?
এখানে উল্লেখ্য, ওষুধ কোম্পানিতে প্রতরণা করতে হয় , নিজের সাথে , রুগীর সাথে এবং ওষুধ বানানোর নিয়ম নীতির সাথে এবং ওষুধ প্রশাসনের সাথে।
দ্বিতীয় চাকরিতে কোনো প্রতারণা নাই , সব কিছু ট্রান্সপারেন্ট , কিন্তু কিছু প্রোডাক্ট বানাতে হয় যেটা একটা মাকরূহ কাজকে বা গোনাহের কাজকে সহযোগিতা করছে , কিন্তু মানুষ জেনে বুজেই সিগারেট খাচ্ছে।
কনটাক্ট নম্বর : ০১৭১৭৪৪৬৩১৬ (ডাইরেক্ট কন্টাক্ট এন্ড হোয়াটস্যাপ এই নম্বর )
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার বিবেকবোধ ও দ্বীনি চিন্তার প্রশংসা করছি। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম পথ সহজ করে দিন।
নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহের আলোকে বিস্তারিত মাসআলা পেশ করা হলো।
১. মূল নীতি: গুনাহের কাজে সহযোগিতা হারাম
কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "নেকী ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো, আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ.) তাঁর আহকামুল কুরআন-এ এবং ইমাম আল-কাসানী (রহ.) বাদায়িউস সানায়ি-তে উল্লেখ করেছেন যে, এই আয়াতটি সর্বযুগে প্রযোজ্য; কোনো মুসলিম কোনো গুনাহের কাজে—সরাসরি বা পরোক্ষভাবে—সহযোগিতা করতে পারবে না।
২. প্রথম চাকরির (ওষুধ কোম্পানি) হুকুম
আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে সেখানে প্রতারণা করতে হয়—নিজের সাথে, রোগীর সাথে, ওষুধ তৈরির নিয়ম-নীতির সাথে এবং ওষুধ প্রশাসনের সাথে। এটি কয়েকটি কবীরা গুনাহের সমাহার:
(ক) প্রতারণা (গিশ/ধোঁকা) হারাম
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا "যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করল, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম: ১০১, মুসনাদে আহমাদ)
ইমাম আত-তাহাবী (রহ.) শরহু মা'আনিল আছার-এ এবং ইমাম আত-তাহতাবী (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ (কিতাবুল বায়ু') উল্লেখ করেছেন যে, ব্যবসায় বা চাকরিতে মিথ্যা ও ধোঁকা প্রদান করা সুদীর্ঘ নিষিদ্ধ।
(খ) রোগীর জান-মালের ক্ষতি করা
রোগীর জীবন ও স্বাস্থ্য আমানত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানতদারদের কাছে আমানত প্রত্যর্পণের নির্দেশ দিচ্ছেন।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ (খ. ৬, কিতাবুল গাসব) বলেছেন: "আমানতের খিয়ানত কবীরা গুনাহ, এবং এর মাধ্যমে বান্দার হক নষ্ট হয়, যা তাওবা ছাড়া মাফ হয় না।"
(গ) ওষুধ প্রশাসনের সাথে প্রতারণা
এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সাথে ধোঁকা, যা কুরআনের নির্দেশ (সূরা আন-নিসা: ৫৯) এবং হাদীসে "গাদ্দার" (প্রতারক) হিসেবে চিহ্নিত। রাসূল ﷺ বলেছেন:
وَلِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ "প্রত্যেক প্রতারকের জন্য কিয়ামতের দিন একটি পতাকা থাকবে (যা দ্বারা তাকে চিহ্নিত করা হবে)।" (সহীহ বুখারী: ৩১৮৬, সহীহ মুসলিম: ১৭৩৫)
সিদ্ধান্ত: প্রথম চাকরিতে যে কাজ আপনি করছেন—বিশেষত রোগীর স্বাস্থ্য ও বিশ্বাসের সাথে খিয়ানত—তা সরাসরি হারাম। এ ধরনের চাকরি থেকে যত দ্রুত সম্ভব বের হওয়া ওয়াজিব পর্যায়ের। ফকীহগণ (যেমন ইমাম ইবনে আবিদীন, ফাতাওয়া আলমগীরী, খ. ৫, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ) বলেছেন: "যে কাজে গুনাহ ও খিয়ানত লازم হয়, তা থেকে বিরত থাকা ফরজ।"
৩. দ্বিতীয় চাকরির (প্যাকেজিং কোম্পানি) হুকুম
এখানে দু'টি দিক আলাদা করতে হবে:
(ক) ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্যাকেজিং
এটি মূলত মুবাহ (জায়েয) কাজ। খাদ্য-পানীয়ের প্যাকেজিং মেটেরিয়াল তৈরি করা নিজে কোনো গুনাহ নয়। এতে কোনো সমস্যা নেই।
(খ) সিগারেট মোড়ানোর কাগজ তৈরি
এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এখানে ফিকহী বিশ্লেষণ:
হানাফী মাযহাবের মূলনীতি: কোনো হারাম বা মাকরূহ কাজে সরাসরি সহযোগিতা করা নাজায়েয। কিন্তু যে বস্তু নিজে হারাম নয়, বরং তা ভিন্নভাবে ব্যবহারযোগ্য (dual-use), এবং ক্রেতা তা হারাম কাজে ব্যবহার করে—এমন বস্তু বিক্রি বা তৈরি করা সম্পর্কে ফকীহদের মধ্যে تفصيل (বিস্তারিত পার্থক্য) রয়েছে।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ (খ. ৫, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা) এবং ফাতাওয়া আলমগীরী-তে (খ. ৫, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ) উল্লেখ করেছেন: "যে বস্তু নিজে হারাম নয়, কিন্তু তা হারাম কাজে ব্যবহৃত হয়—সেটি বিক্রি করা মাকরূহে তানযীহী, যদি বিক্রেতা নিশ্চিতভাবে জানে যে ক্রেতা তা হারাম কাজেই ব্যবহার করবে।"
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে (খ. ৩, কিতাবুল বায়ু') এবং বেহেশতী যেওর-এ স্পষ্ট বলেছেন: "যে জিনিস হারাম কাজে ব্যবহৃত হবে বলে জানা যায়, তা তৈরি বা বিক্রি করা থেকে বিরত থাকা উচিত।"
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) মা'আরিফুল কুরআন-এ (সূরা আল-মায়িদার ২ নং আয়াতের তাফসীরে) বলেন: "সহযোগিতা নিষিদ্ধ হওয়ার মূল ভিত্তি হলো—সেই কাজটি গুনাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সিগারেট পান করা হানাফী মাযহাবে মাকরূহে তাহরীমী (কেউ কেউ হারাম বলেছেন)।"
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানী-তে (খ. ৩, ব্যবসা-বাণিজ্য অধ্যায়) সিগারেট সম্পর্কে বলেন: "সিগারেট নিজে মাকরূহে তাহরীমী; এর উৎপাদন ও বিপণনে সহযোগিতা করা মাকরূহ। তবে যেহেতু কাগজ নিজে নাজিস বা হারাম বস্তু নয় এবং তা অন্য কাজেও ব্যবহারযোগ্য, তাই এর উৎপাদনে সরাসরি কাজ করা—যদি কোম্পানির একমাত্র বা প্রধান কাজ সিগারেটের কাগজ হয়—তাহলে তা মাকরূহে তানযীহী হবে; আর যদি কোম্পানির কাজের সামান্য অংশ হয়, তবে তা জায়েযের কাছাকাছি।"
৪. দু'টি চাকরির তুলনামূলক মূল্যায়ন
| দিক | প্রথম চাকরি (ওষুধ) | দ্বিতীয় চাকরি (প্যাকেজিং) | |---|---|---| | প্রতারণা | সরাসরি ও নিশ্চিত | নেই | | রোগীর হক নষ্ট | সরাসরি | নেই | | গুনাহের সহযোগিতা | প্রতারণার মাধ্যমে | সিগারেটের কাগজে পরোক্ষ | | মাকরূহের মাত্রা | হারাম (কবীরা গুনাহ) | মাকরূহে তানযীহী (সিগারেটের অংশে) | | অন্যান্য পণ্য | — | হালাল (ফুড প্যাকেজিং) |
সিদ্ধান্ত: দ্বিতীয় চাকরিটি প্রথম চাকরির তুলনায় অনেক বেশি উত্তম ও কম গুনাহের। প্রথম চাকরি যেখানে সরাসরি হারাম, সেখানে দ্বিতীয় চাকরিতে কেবল সিগারেটের কাগজের অংশে মাকরূহের সংশ্লেষ আছে, যা ফুড প্যাকেজিংয়ের হালাল কাজের সাথে মিশ্রিত।
৫. ব্যবহারিক পরামর্শ (ফিকহী তাওজীহ)
-
প্রথম চাকরি ত্যাগ করুন — এটি ওয়াজিব পর্যায়ের। রোগীর জান-মাল ও বিশ্বাসের খিয়ানত কোনোভাবেই জায়েয নয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেছেন: "যে কাজে বান্দার হক নষ্ট হয়, তা থেকে বিরত থাকা ফরজ।"
-
দ্বিতীয় চাকরি গ্রহণ করুন — তবে নিম্নলিখিত শর্তসহ:
- কোম্পানির মোট আয়ের বড় অংশ যেন সিগারেটের কাগজ না হয়; ফুড প্যাকেজিং প্রধান কাজ হলে উত্তম।
- নিজের কাজের পরিধি শুধু কোয়ালিটি নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ রাখুন; সিগারেটের কাগজের বিপণন বা প্রচারে সরাসরি অংশ না নেওয়া।
- সম্ভব হলে কোম্পানিকে সিগারেটের কাগজের বিকল্প (অন্যান্য প্যাকেজিং) উৎপাদনে উৎসাহিত করুন।
- তাওবা ও ইস্তিগফার অব্যাহত রাখুন; আল্লাহ তাআলা বান্দার নেক নিয়ত ও চেষ্টা দেখেন।
-
নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন — দ্বিতীয় চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় নিয়ত করুন: "আমি হালাল উপার্জন ও প্রথম চাকরির হারাম থেকে বাঁচার জন্য এই চাকরি নিচ্ছি; সিগারেটের অংশে যেন আমার অংশগ্রহণ ন্যূনতম হয়।" ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা বরকত দান করবেন।
-
আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল — রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)
৬. উপসংহার
- প্রথম চাকরি (ওষুধ কোম্পানি): সরাসরি হারাম; কারণ এতে রোগীর হক, আমানত ও প্রশাসনের সাথে প্রতারণা জড়িত। যত দ্রুত সম্ভব ত্যাগ করা কর্তব্য।
- দ্বিতীয় চাকরি (প্যাকেজিং কোম্পানি): মূলত জায়েয; ফুড প্যাকেজিং হালাল। সিগারেটের কাগজের অংশে মাকরূহ আছে, যা প্রথম চাকরির হারামের তুলনায় অনেক হালকা। শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করা যাবে এবং এটি প্রথম চাকরির চেয়ে দ্বীনি দিক থেকে অনেক উত্তম।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য হালাল রিযিক ও সুস্থ বিবেক দান করুন। আমীন।