মায়ের কথা শুনা কি সর্বাবস্থায় ফরজ? গর্ভাবস্থায় স্ত্রীর রক্তক্ষরণ হলে মায়ের কথা শুনে চিকিৎসা বিলম্ব করা যাবে কি?

Family Life · Hanafi

Question No: 7526
Questioner: Tawhidul Islam
Question Asked: 29 Oct 2026, 06:19 AM
Reviewed & Published: 29 Oct 2026, 07:30 AM
Views: 77
Tokens: 3,401
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারহমাতুল্লাহ, আমার প্রশ্নটি হল, আমার ওয়াইফ ৭ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট, গত দুইদিন যাবৎ তার ব্লিডিং হচ্ছে। ডাক্তারের সাথে ফোনে আলোচনা করেছি ডাক্তার বলেছে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু আমার মা বলছেন এখন না জাওয়ার জন্য। এখন আমি কি করবো? মায়ের কথা শুনব না ডাক্তারের?

Answer

উত্তর (ফতোয়া)

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
এ অবস্থায় মায়ের কথা শুনে চিকিৎসা বিলম্ব করা জায়েয নয়; বরং দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করানো কর্তব্য। কারণ প্রাণ ও স্বাস্থ্য রক্ষা শরীয়তের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য (মাকাসিদে শরীয়াহ)। গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ মারাত্মক ঝুঁকির লক্ষণ হতে পারে; চিকিৎসা বিলম্বে জান ও গর্ভের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে মায়ের অবাধ্যতা এখানে গুনাহ নয়, বরং শরীয়তের নির্দেশ পালন।


বিস্তারিত আলোচনা

১) জান ও স্বাস্থ্য রক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার:
আল্লাহ তাআলা বলেন,

“তোমরা নিজেদের হত্যা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।”
(সূরা নিসা: ২৯)

আরও ইরশাদ হয়েছে,

“আর তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।”
(সূরা বাকারা: ১৯৫)

হাদিসে নবী ﷺ বলেছেন,

“তোমাদের কেউ যেন নিজের ক্ষতিসাধন না করে এবং অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত না করে।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১; মুসনাদে আহমাদ: ২৮৬৭ — হাসান)

গর্ভবতী নারীর রক্তক্ষরণে সময়মতো চিকিৎসা না করালে জান ও গর্ভের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে; তাই এটি “নিজেকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ” বা “ক্ষতিসাধন” এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

২) মায়ের আনুগত্যের সীমা:
শরীয়তে পিতা-মাতার আনুগত্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। আল্লাহ বলেন,

“তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।”
(সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)

তবে হাদিসে আনুগত্যের মূলনীতি হলো:

“আনুগত্য কেবল নেক কাজে; গুনাহের কাজে আনুগত্য নেই।”
(সহিহ বুখারি: ৭২৫৭; সহিহ মুসলিম: ১৮৪০)

ইমাম নববী রহ. বলেন, “সৃষ্টির আনুগত্যে স্রষ্টার অবাধ্যতা করা যাবে না; আর যেখানে দ্বীনি বা দুনিয়াবি স্পষ্ট ক্ষতির আশঙ্কা আছে, সেখানে পিতা-মাতার পরামর্শ বাধ্যতামূলক নয়।” (শরহু সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮৪০-এর ব্যাখ্যা)

হানাফি ফিকহের মূলনীতি:

“الضرر لا يكون مشروعًا” — ক্ষতি করা শরীয়তসম্মত নয়।
“دفع الضرر مقدم على جلب المنفعة” — ক্ষতি প্রতিরোধ করা উপকার অর্জনের চেয়ে অগ্রগণ্য।
(আল-আশবাহ ওয়ান-নাযায়ির, ইবনে নুজাইম, পৃ. ৭৫; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, মাদ্দা ৩০)

৩) চিকিৎসা গ্রহণ করা:
রাসূল ﷺ বলেছেন,

“আল্লাহ যে রোগ দিয়েছেন, তার চিকিৎসাও দিয়েছেন; তাই তোমরা চিকিৎসা করাও।”
(সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫; সুনানে তিরমিজি: ২০৩৮ — হাসান সহিহ)

ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. চিকিৎসা গ্রহণকে বৈধ ও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বলেছেন; বিশেষত যখন প্রাণ বা অঙ্গের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৫-৩৬৬, দারুল ফিকর)


করণীয়

  • মাকে সম্মান ও ভালোবাসার সাথে বুঝান যে এটি চিকিৎসকের জরুরি পরামর্শ; বিলম্বে ঝুঁকি আছে।
  • অবিলম্বে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান বা নিকটস্থ হাসপাতালে জরুরি বিভাগে দেখান।
  • মায়ের অবাধ্যতার নিয়ত নয়; বরং জান রক্ষার শরীয়তসম্মত ওযর হিসেবে চিকিৎসা করান।
  • সম্ভব হলে মাকে সাথে নিন বা কোনো বিশ্বস্ত আত্মীয়কে সাথে নিয়ে বুঝিয়ে নিন, যাতে পারিবারিক কলহ না হয়।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্রুত করান; গর্ভস্থ সন্তানের জীবনও আমানত।

সারকথা: এ অবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা করানোই শরীয়তসম্মত ও নিরাপদ; মায়ের নিষেধাজ্ঞা মানার কারণে চিকিৎসা বিলম্ব করা জায়েয নয়।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.