মায়ের কথা শুনা কি সর্বাবস্থায় ফরজ? গর্ভাবস্থায় স্ত্রীর রক্তক্ষরণ হলে মায়ের কথা শুনে চিকিৎসা বিলম্ব করা যাবে কি?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর (ফতোয়া)
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
এ অবস্থায় মায়ের কথা শুনে চিকিৎসা বিলম্ব করা জায়েয নয়; বরং দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করানো কর্তব্য। কারণ প্রাণ ও স্বাস্থ্য রক্ষা শরীয়তের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য (মাকাসিদে শরীয়াহ)। গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ মারাত্মক ঝুঁকির লক্ষণ হতে পারে; চিকিৎসা বিলম্বে জান ও গর্ভের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে মায়ের অবাধ্যতা এখানে গুনাহ নয়, বরং শরীয়তের নির্দেশ পালন।
বিস্তারিত আলোচনা
১) জান ও স্বাস্থ্য রক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তোমরা নিজেদের হত্যা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।”
(সূরা নিসা: ২৯)
আরও ইরশাদ হয়েছে,
“আর তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।”
(সূরা বাকারা: ১৯৫)
হাদিসে নবী ﷺ বলেছেন,
“তোমাদের কেউ যেন নিজের ক্ষতিসাধন না করে এবং অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত না করে।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১; মুসনাদে আহমাদ: ২৮৬৭ — হাসান)
গর্ভবতী নারীর রক্তক্ষরণে সময়মতো চিকিৎসা না করালে জান ও গর্ভের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে; তাই এটি “নিজেকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ” বা “ক্ষতিসাধন” এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
২) মায়ের আনুগত্যের সীমা:
শরীয়তে পিতা-মাতার আনুগত্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। আল্লাহ বলেন,
“তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।”
(সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
তবে হাদিসে আনুগত্যের মূলনীতি হলো:
“আনুগত্য কেবল নেক কাজে; গুনাহের কাজে আনুগত্য নেই।”
(সহিহ বুখারি: ৭২৫৭; সহিহ মুসলিম: ১৮৪০)
ইমাম নববী রহ. বলেন, “সৃষ্টির আনুগত্যে স্রষ্টার অবাধ্যতা করা যাবে না; আর যেখানে দ্বীনি বা দুনিয়াবি স্পষ্ট ক্ষতির আশঙ্কা আছে, সেখানে পিতা-মাতার পরামর্শ বাধ্যতামূলক নয়।” (শরহু সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮৪০-এর ব্যাখ্যা)
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
“الضرر لا يكون مشروعًا” — ক্ষতি করা শরীয়তসম্মত নয়।
“دفع الضرر مقدم على جلب المنفعة” — ক্ষতি প্রতিরোধ করা উপকার অর্জনের চেয়ে অগ্রগণ্য।
(আল-আশবাহ ওয়ান-নাযায়ির, ইবনে নুজাইম, পৃ. ৭৫; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, মাদ্দা ৩০)
৩) চিকিৎসা গ্রহণ করা:
রাসূল ﷺ বলেছেন,
“আল্লাহ যে রোগ দিয়েছেন, তার চিকিৎসাও দিয়েছেন; তাই তোমরা চিকিৎসা করাও।”
(সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫; সুনানে তিরমিজি: ২০৩৮ — হাসান সহিহ)
ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. চিকিৎসা গ্রহণকে বৈধ ও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বলেছেন; বিশেষত যখন প্রাণ বা অঙ্গের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৫-৩৬৬, দারুল ফিকর)
করণীয়
- মাকে সম্মান ও ভালোবাসার সাথে বুঝান যে এটি চিকিৎসকের জরুরি পরামর্শ; বিলম্বে ঝুঁকি আছে।
- অবিলম্বে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান বা নিকটস্থ হাসপাতালে জরুরি বিভাগে দেখান।
- মায়ের অবাধ্যতার নিয়ত নয়; বরং জান রক্ষার শরীয়তসম্মত ওযর হিসেবে চিকিৎসা করান।
- সম্ভব হলে মাকে সাথে নিন বা কোনো বিশ্বস্ত আত্মীয়কে সাথে নিয়ে বুঝিয়ে নিন, যাতে পারিবারিক কলহ না হয়।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্রুত করান; গর্ভস্থ সন্তানের জীবনও আমানত।
সারকথা: এ অবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা করানোই শরীয়তসম্মত ও নিরাপদ; মায়ের নিষেধাজ্ঞা মানার কারণে চিকিৎসা বিলম্ব করা জায়েয নয়।
والله أعلم بالصواب