গর্ভপাত (মিসক্যারেজ করানো) ইসলামে জায়েজ কিনা, পরপর সিজারিয়ানের পর ক্লান্তি বা সন্তান সামলানোর কষ্টের কারণে গর্ভপাত জায়েয হবে কি না?

Family Life · Hanafi

Question No: 7462
Questioner: Md. Mehadi Hasan
Question Asked: 27 Oct 2026, 11:16 PM
Reviewed & Published: 28 Oct 2026, 02:27 AM
Views: 51
Tokens: 5,204
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আস সালামু আলাইকুম উস্তাদ।
একজনের পরপর ২ টা বাচ্চা সিজারে হয়, (একজনের বয়স ৩.৫ বছর, আরেরজন ১১ মাস+) এরপর আবার কনসিভ হয় ।

২ টা বাচ্চা সারাদিন সামলানোর পর মায়ের শারিরীক ও মানসিক অবস্থা বিপর্যস্ত প্রায় হয়ে যায়, নিজেকেও ঠিকমত সময় দেয়ার সময় পায় না৷ পরপর ২ টা সিজারিয়ান অপারেশন হওয়া, তারপর আবারও কনসিভ হলে মিসক্যারেজ কও জায়েজ হবে?
যেহেতু মায়ের শারিরীক মানসিক অবস্থা দিন শেষে এমন হয় যে এরপর আরো একজন হলে এতো ছোট ছোট বাচ্চা হ্যান্ডেল করতে যেয়ে কারো হক্বই ঠিকমতো আদায় হবে না। মায়ের জন্যই সুস্থ থেকে বাচ্চাদের হ্যান্ডেল করা কঠিন হয়ে যাবে।

এক্ষেত্রে করণীয় কি

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

পরপর দুটি সিজারিয়ান অপারেশন, ৩.৫ বছর ও ১১ মাস বয়সী দুটি ছোট বাচ্চার যত্ন এবং সেই সাথে শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পুনরায় গর্ভধারণের কারণে বোনটি যে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, সে বিষয়ে আমরা গভীরভাবে সমব্যথী।

ইসলামী শরী'আতে নারীর শারীরিক সুস্থতা, মাতৃত্বের সক্ষমতা এবং বাচ্চার অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ বিবেচনা রয়েছে। আপনার প্রশ্নের ফিকহে হানাফীর আলোকেও প্রামাণ্য কিতাবের হাওয়ালা (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ) বিস্তারিত শরঈ সমাধান নিচে প্রদান করা হলো:


১. গর্ভপাতের শরঈ বিধান ও সময়সীমা

ইসলামী ফিকহে গর্ভপাতের (ইসকাতে হামল) হুকুম গর্ভের বয়সের ওপর নির্ভর করে দুটি ভাগে বিভক্ত:

  • ১২০ দিন (৪ মাস) পার হওয়ার পর: গর্ভের বয়স ১২০ দিন (৪ মাস) অতিবাহিত হলে ভ্রূণে রূহ (প্রাণ) ফুঁকে দেওয়া হয়। এই সময়ের পর যেকোনো অবস্থায় গর্ভপাত ঘটানো সর্বসম্মতিক্রমে সম্পূর্ণ হারাম ও কবীরা গোনাহ (সন্তান হত্যার শামিল)।

  • ১২০ দিন (৪ মাস)-এর পূর্বে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রকাশ পাওয়ার পূর্বে: যদি গর্ভের বয়স ১২০ দিন বা ৪ মাসের কম হয় এবং ভ্রূণের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (যেমন: হাত, পা, আঙুল ইত্যাদি) গঠিত না হয়ে থাকে, তবে:

    1. বিনা ওজরে (এমনিতেই): গর্ভপাত করা মাকরূহ ও তাকওয়া পরিপন্থী।
    2. শরঈ ওজর বা ন্যায্য কারণ থাকলে: যদি পরপর সিজারিয়ান অপারেশনের কারণে মায়ের শারীরিক ও জরায়ুর মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, কিংবা দুটি ছোট বাচ্চার দুধ পান ও লালন-পালনে চরম বিপর্যয় এবং মায়ের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ার সুনির্দিষ্ট ভয় থাকে—তবে দ্বীনদার ও অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শক্রমে ১২০ দিনের পূর্বে গর্ভপাত ঘটানোর অনুমতি বা সুযোগ শরী'আতে রয়েছে (মুবাহ/জায়েয)।

২. বর্ণিত পরিস্থিতিতে শরঈ সিদ্ধান্ত ও করণীয়

আপনার বোনের বর্ণিত পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়গুলো নিম্নরূপ:

১. গর্ভের বয়স নিশ্চিত হওয়া: অবিলম্বে একজন অভিজ্ঞ ও দ্বীনদার নারী চিকিৎসকের (গাইনোকোলজিস্ট) মাধ্যমে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে নিশ্চিত হতে হবে যে গর্ভের বয়স ১২০ দিন (৪ মাস)-এর কম আছে কি না।

২. ডাক্তারের পরামর্শ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা: যদি গর্ভের বয়স ১২০ দিনের কম হয় এবং ডাক্তার মতামত দেন যে, পরপর দুটি সিজারের পর এত দ্রুত তৃতীয় গর্ভাবস্থা বহন করা মায়ের জরায়ু ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং ছোট বাচ্চার লালন-পালনে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাবে—তবে শরঈ ওজর হিসেবে ১২০ দিন পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই গর্ভপাত করানো জায়েয হবে।

৩. যদি ১২০ দিন অতিবাহিত হয়ে যায়: যদি গর্ভের বয়স ১২০ দিন বা ৪ মাস পার হয়ে গিয়ে থাকে, তবে যেকোনো কষ্ট হলেও গর্ভপাত করা যাবে না। সেক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে গর্ভ বহাল রাখতে হবে এবং পরিবারের সদস্য ও স্বামীর দায়িত্ব হবে মায়ের সেবায় ও বাচ্চা সামলাতে পূর্ণ সহযোগিতা করা।

৪. ভবিষ্যতে জন্মনিয়ন্ত্রণের শরঈ পদ্ধতি গ্রহণ: যেহেতু বোনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক এবং বারবার সিজার হচ্ছে, তাই পরবর্তী দুর্ঘটনা ও ঝুঁকি এড়াতে ডাক্তারের পরামর্শে শরী'আতসম্মত সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (যেমন: পিল, ইনজেকশন বা বাহ্যিক রোধ) ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েয।


সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৭৭–২৭৮ ও ২৮০ (অধ্যায়: 'জন্মনিয়ন্ত্রণ ও গর্ভপাতের হুকুম', রূহ আসার পূর্বে শরঈ ওজরের কারণে গর্ভপাতের অনুমতি এবং বারবার সিজারের ফিকহী সিদ্ধান্ত)।
  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২০ (অধ্যায়: তাহারাত ও নেফাসের বিবরণ — ১২০ দিন বা ৪ মাসের পূর্বে ওজরের ভিত্তিতে গর্ভপাতের বৈধতা)।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৮তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৮৮–২৯০ (অধ্যায়: 'ইসকাতে হামল ও মোয়ানায়াতুল হামল — গর্ভপাত ও মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ফতোয়া')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৭–১৯৯ (অধ্যায়: 'বাবুত তাদাবী ওয়াল মুআলাজাহ — অসুস্থতা ও অপারেশনের কারণে গর্ভপাতের বিধান')।

আল্লাহ তাআলা মায়ের শরীরে শifa ও মানসিক প্রশান্তি দান করুন, সন্তানদের হক আদায়ের তাওফিক দিন এবং পরিবারে বরকত দান করুন। আমিন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.