প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বাবার অনুমতি ছাড়া নিকাহ সহিহ হবে কি? দুই পরিবারের অজান্তে গোপন নিকাহের বিধান, শর্ত ও শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি কী? বিস্তারিত জানতে চাই?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম।
আমি হানাফি মাজহাব অনুযায়ী একটি মাসআলা জানতে চাই।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ছেলে ও একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম মেয়ে পরস্পরের সম্মতিতে নিকাহ করতে চায়। তাদের দুই পরিবারের কেউই এই বিয়ের বিষয়ে জানবেন না। মেয়ের বাবা জীবিত আছেন, কিন্তু তাঁর অনুমতি নেওয়া হবে না। নিকাহের সময় দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত থাকবেন, দেনমোহর নির্ধারণ করা হবে এবং ইজাব-কবুল হবে। কাজির মাধ্যমে নিকাহ ও নিবন্ধন করানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
আমার প্রশ্ন হলো, হানাফি মাজহাব অনুযায়ী দুই পরিবারের কাউকে না জানিয়ে এবং মেয়ের বাবার অনুমতি ছাড়া এভাবে নিকাহ করলে নিকাহ সহিহ হবে কি? এ ক্ষেত্রে নিকাহ সহিহ হওয়ার জন্য আর কোনো শর্ত আছে কি? কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য হানাফি ফিকহের দলিলসহ উত্তর দিলে উপকৃত হব।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমতী (আকিল-বালিগা) মেয়ে নিজের সম্মতিতে নিকাহ করলে তার বাবার অনুমতি শর্ত নয়। বাবা জীবিত থাকলেও প্রাপ্তবয়স্ক কন্যার নিকাহ তার নিজের ইজাব-কবুলে সহিহ হয়ে যাবে, বাবার অনুমতি ছাড়া। তবে এতে পারিবারিক কলহ, সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও দ্বীনি দৃষ্টিতে নানা অপছন্দনীয় দিক থাকতে পারে—যা শরীয়ত সমর্থন করে না।
তবে দুই পরিবারের কাউকে না জানানো নিকাহ সহিহ হওয়ার শর্ত নয়; নিকাহ সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো—সাক্ষী, দেনমোহর, ইজাব-কবুল ইত্যাদি পূর্ণ হওয়া। পরিবারকে না জানানো নিকাহকে বাতিল করে না, কিন্তু এটি সুন্নাহসম্মত ও কল্যাণকর পদ্ধতি নয়।
বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা
১. প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের নিকাহে বাবার অনুমতি কি শর্ত?
হানাফি মাজহাবের মূলনীতি হলো: আকিল-বালিগা (প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমতী) নারী নিজের নিকাহ নিজেই সম্পাদন করতে পারে; তার উপর ওলি (অভিভাবক)-এর কোনো বাধ্যতামূলক অধিকার নেই। এটি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বিখ্যাত মত, যা ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) থেকেও বর্ণিত।
দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا فَعَلْنَ فِي أَنفُسِهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ» “অতঃপর যখন তারা তাদের ইদ্দত পূর্ণ করে, তখন তাদের নিজেদের ব্যাপারে ন্যায়সংগতভাবে যা তারা করে, তাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই।” (সূরা বাকারা: ২৩৪)
«وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا فَعَلْتُم بِهِ مِن مَّعْرُوفٍ» “তোমরা তাদের সাথে ন্যায়সংগতভাবে যা করবে, তাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই।” (সূরা বাকারা: ২৩৫)
এই আয়াতগুলোতে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নিজের ব্যাপারে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈধতা প্রমাণিত।
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
«الْأَيِّمُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا، وَالْبِكْرُ تُسْتَأْمَرُ، وَإِذْنُهَا صُمَاتُهَا» “বিধবা নিজের ব্যাপারে তার অভিভাবকের চেয়ে বেশি অধিকারী; আর কুমারী মেয়ের সম্মতি নেওয়া হবে, তার সম্মতি হলো তার চুপ থাকা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪২১; সহিহ বুখারি, হাদিস ৫১৩৬)
ইমাম তহাবি (রহ.) «শরহু মাআনিল আসার»-এ এবং ইমাম সারাখসি (রহ.) «আল-মাবসুত»-এ উল্লেখ করেন যে, প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের নিকাহ নিজে সম্পাদন করতে পারে; ওলি-এর অনুমতি শর্ত নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতই প্রাধান্যপ্রাপ্ত।
ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
“فَإِنَّ الْبَالِغَةَ الْعَاقِلَةَ تَزَوَّجُ نَفْسَهَا بِلَا وَلِيٍّ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ” “নিশ্চয়ই প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমতী নারী ইমাম আবু হানিফার মতে ওলি ছাড়াই নিজের নিকাহ করতে পারে।” (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তেও এ মতই উদ্ধৃত হয়েছে:
“الْبَالِغَةُ الْعَاقِلَةُ إِذَا زَوَّجَتْ نَفْسَهَا بِكُفْءٍ صَحَّ النِّكَاحُ” “প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমতী নারী সমকক্ষ (কুফু) পুরুষের সাথে নিজের নিকাহ করলে তা সহিহ।” (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুন নিকাহ)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক কন্যা বাবার অনুমতি ছাড়া নিকাহ করলে নিকাহ সহিহ হবে; তবে বাবা-মায়ের সন্তুষ্টি ও সম্মতি নেওয়া কর্তব্য এবং পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে এটি অত্যন্ত জরুরি।
২. নিকাহ সহিহ হওয়ার শর্তসমূহ (হানাফি মাজহাব)
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী নিকাহ সহিহ হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূর্ণ হতে হবে:
- ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) — একই মজলিসে, স্পষ্টভাবে।
- দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিমান, মুসলিম পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত থাকা। (সূরা বাকারা: ২৮২-এর আলোকে; হাদিস: «لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَيْ عَدْلٍ» — তবে হানাফিরা এ হাদিসকে ওলি-এর ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর স্বাধীনতার সাথে সমন্বয় করেন।)
- দেনমোহর নির্ধারণ (মাহর) — কমপক্ষে ১০ দিরহাম বা সমপরিমাণ; স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা।
- দুই পক্ষের সম্মতি — জবরদস্তি নয়।
- শরীয়তসম্মত বাধা না থাকা — যেমন: রক্তসম্পর্ক, দুধসম্পর্ক, ইদ্দত, ইত্যাদি।
- সাক্ষীদের সামনে সম্পাদন — গোপন নিকাহ নয়।
ইমাম সারাখসি (রহ.) «আল-মাবসুত»-এ বলেন:
“النِّكَاحُ يَنْعَقِدُ بِالْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ وَشَهَادَةِ شَاهِدَيْنِ” “নিকাহ ইজাব, কবুল ও দুই সাক্ষীর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।”
«আল-হিদায়া»-তে উল্লেখ আছে:
“وَيَنْعَقِدُ النِّكَاحُ بِالْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ وَشَهَادَةِ رَجُلَيْنِ أَوْ رَجُلٍ وَامْرَأَتَيْنِ” “নিকাহ ইজাব, কবুল ও দুই পুরুষ সাক্ষী (বা এক পুরুষ ও দুই নারী) দ্বারা সম্পন্ন হয়।” (আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ)
৩. পরিবারকে না জানিয়ে নিকাহ করা—শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি
নিকাহ সহিহ হওয়ার জন্য পরিবারকে জানানো শর্ত নয়; কিন্তু গোপন নিকাহ (নিকাহ সিররি) ইসলাম সমর্থন করে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
«أَعْلِنُوا النِّكَاحَ» “নিকাহের ঘোষণা দাও।” (মুসনাদ আহমাদ, তিরমিজি)
আরও ইরশাদ:
«فَصْلُ مَا بَيْنَ الْحَلَالِ وَالْحَرَامِ الدُّفُّ وَالصَّوْتُ فِي النِّكَاحِ» “হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য হলো নিকাহে দফ ও ঘোষণা।” (তিরমিজি, হাদিস ১০৮৮)
আশরাফ আলী থানভি (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেন, নিকাহ গোপন রাখা উচিত নয়; ঘোষণা করা সুন্নাহ। পরিবার-সমাজকে না জানিয়ে নিকাহ করলে নানা ফিতনা ও পারিবারিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, যা শরীয়ত অপছন্দ করে।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা নিসার ৩৫ নং আয়াতের আলোচনায় বলেন, নিকাহ কেবল দুটি ব্যক্তির ব্যাপার নয়; বরং দুই পরিবার ও সমাজের সাথে সম্পৃক্ত। তাই পরিবারের সম্মতি ও অংশগ্রহণ নিকাহের স্থায়িত্ব ও কল্যাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. বিশেষ সতর্কতা
- বাবার অনুমতি না নিয়ে নিকাহ সহিহ হবে, কিন্তু বাবা-মায়ের সন্তুষ্টি লঙ্ঘন করা ইসলামে নিন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: «رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ» — “আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতামাতার সন্তুষ্টিতে।”
- কুফু (সমকক্ষতা) বিবেচনা করা উচিত; অসমকক্ষ নিকাহতে পারিবারিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।
- কাজির মাধ্যমে নিবন্ধন করা ভালো; এটি নিকাহের প্রমাণ ও অধিকার রক্ষায় সহায়ক।
- গোপন নিকাহ পরবর্তীতে দেনমোহর, নাফাকা, তালাক, میراث ইত্যাদি বিষয়ে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
- জবরদস্তি বা প্রতারণা থাকলে নিকাহ সহিহ হবে না।
উপসংহার
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমতী মেয়ে নিজের সম্মতিতে নিকাহ করলে বাবার অনুমতি ছাড়াও নিকাহ সহিহ হবে, যদি ইজাব-কবুল, দুই প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ সাক্ষী, দেনমোহর নির্ধারণ ইত্যাদি শর্ত পূর্ণ হয়। তবে পরিবারকে না জানিয়ে গোপন নিকাহ করা সুন্নাহসম্মত নয় এবং এটি পারিবারিক ও সামাজিক ফিতনার কারণ হতে পারে। তাই বাবা-মায়ের সম্মতি নিয়ে, ঘোষণাসহ, শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে নিকাহ সম্পাদন করাই সর্বোত্তম ও কল্যাণকর।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ