মহিলাদের চুল কালার করা যাবে কি? কালো ছাড়া মেহেদি, কাতাম বা অন্য রং জায়েয কি?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
মহিলাদের চুল কালার করা যাবে কি? (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বিস্তারিত উত্তর)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
কালো রং দিয়ে চুল কালার করা নাজায়েজ — চাই পুরুষ হোক বা মহিলা, চাই চুলে হোক বা দাড়িতে। তবে কালো ছাড়া অন্য রং (যেমন: মেহেদি/লাল, বাদামি, ব্লন্ড ইত্যাদি) দিয়ে চুল রং করা জায়েজ, শর্ত হলো—
- এটি সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য হবে, স্বামীর অনুমতিতে (মহিলাদের ক্ষেত্রে)।
- তাতে কোনো প্রতারণা/ধোঁকা না থাকবে (যেমন: বুড়োকে যুবক দেখানোর উদ্দেশ্য না হওয়া)।
- ব্যবহৃত রং/পদার্থ হারাম ও নাপাক (নাজাসাত) থেকে পবিত্র হবে।
- চুলে রং লাগানোর কারণে ওজুর পানি চুলের গোড়ায় পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি হবে না (অর্থাৎ রং যদি এমন পুরু স্তর হয় যা পানি আটকে দেয়, তবে ওজু-গোসল সহিহ হবে না)।
কুরআন ও হাদিসের দলিল
১. কালো রং নিষিদ্ধ হওয়ার দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
«غَيِّرُوا هَذَا الشَّيْبَ وَاجْتَنِبُوا السَّوَادَ»
"এই (দাড়ির) শুভ্রতাকে পরিবর্তন করো এবং কালো রং থেকে বেঁচে থাকো।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪২০৩; সুনানে নাসাঈ, হাদিস ৫০৭৭; মুসনাদে আহমাদ
আরেক হাদিসে:
«إِنَّ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى لَا يَصْبُغُونَ فَخَالِفُوهُمْ»
"ইহুদি ও খ্রিস্টানরা (বার্ধক্যের শুভ্রতা) রং করে না, সুতরাং তোমরা তাদের বিরোধিতা করো।"
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৮৯৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১০৩
ইমাম তিরমিজি (রহ.) এই হাদিসগুলোর ব্যাখ্যায় বলেন, আহলে ইলমের সর্বসম্মত মত হলো কালো রং দিয়ে শুভ্রতা ঢাকা মাকরুহ/নিষিদ্ধ। (জামে তিরমিজি, হাদিস ১৭৫১-এর ব্যাখ্যা)
২. কালো ছাড়া অন্য রং জায়েয হওয়ার দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ أَحْسَنَ مَا غَيَّرْتُمْ بِهِ الشَّيْبَ الْحِنَّاءُ وَالْكَتَمُ»
"নিশ্চয়ই শুভ্রতা পরিবর্তনের সর্বোত্তম উপকরণ হলো মেহেদি (লাল) ও কাতাম (কালচে-নীল/বাদামি)।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪২০৫; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৭৫২; সুনানে নাসাঈ
এছাড়া হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.) মেহেদি ও কাতাম দিয়ে চুল/দাড়ি রং করতেন — যা সাহাবাদের আমল হিসেবে প্রমাণিত। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা; আল-মুগনি)
হানাফি ফিকহের বিস্তারিত আলোচনা
ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) — রাদ্দুল মুহতার
«وَيُكْرَهُ الْخِضَابُ بِالسَّوَادِ لِلرَّجُلِ وَالْمَرْأَةِ»
"পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্যই কালো রং দিয়ে খিদাব (রং) করা মাকরুহ (নিষিদ্ধ)।"
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৭৫৬ (দারুল ফিকর সংস্করণ)
তিনি আরও উল্লেখ করেন, যদি কারো স্বামী বা পিতা কালো রং করতে আদেশ দেয়, তবে তা মানা যাবে না; কারণ এটি সুস্পষ্ট নিষিদ্ধ কাজে সহযোগিতা। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৭৫৭)
ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানি (রহ.) — আল-হিদায়া
«وَلَا بَأْسَ بِالْخِضَابِ بِالْحِنَّاءِ وَالْكَتَمِ، وَأَمَّا بِالسَّوَادِ فَلَا»
"মেহেদি ও কাতাম দিয়ে রং করা দোষণীয় নয়; কিন্তু কালো দিয়ে রং করা যাবে না।"
— আল-হিদায়া, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
ফতোয়ায়ে আলমগিরি (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া)
«الْخِضَابُ بِالسَّوَادِ حَرَامٌ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ وَمُحَمَّدٍ، وَقَالَ أَبُو يُوسُفَ: يُكْرَهُ»
"ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে কালো রং করা হারাম; ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে মাকরুহ তাহরিমি।"
— ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫৮
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) — মাআরিফুল কুরআন
সূরা বাকারার ১৩৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি লেখেন, "আল্লাহর রং" তথা ইসলামের স্বাভাবিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা কর্তব্য; কৃত্রিমভাবে চেহারা-চুল পরিবর্তন করে নিজের বয়স বা পরিচয় গোপন করা ইসলামের শিক্ষা নয়। (মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃ. ৪১৬)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) — ফতোয়ায়ে উসমানি
"কালো রং দিয়ে চুল বা দাড়ি রং করা নাজায়েজ। তবে মেহেদি, কাতাম বা অন্যান্য রঙ ব্যবহার করা জায়েয।"
— ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৬৭ (খিদাব অধ্যায়)
হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) — বেহেশতি জেওর
"দাড়ি-চুলে কালো রং লাগানো নিষিদ্ধ। হ্যাঁ, মেহেদি বা অন্য রঙ লাগানো জায়েয।"
— বেহেশতি জেওর, খণ্ড ৩ (পর্দা ও সৌন্দর্য অধ্যায়)
মহিলাদের জন্য বিশেষ বিবেচনা
-
স্বামীর অনুমতি: মহিলারা সাধারণত স্বামীর সন্তুষ্টির জন্য সাজেন। কালো ছাড়া অন্য রং স্বামীর অনুমতিতে করতে পারবেন। তবে স্বামী যদি কালো রং করতে বলে, তবে তা মানা যাবে না — কারণ এটি হারাম কাজে সহযোগিতা (সূরা মায়িদা: ২)।
-
গায়রে মাহরামের সামনে প্রদর্শন: চুলে রং করা নিজে জায়েয হলেও গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন করা হারাম। (সূরা নূর: ৩১; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৭)
-
কেমিক্যাল রং ও ওজুর বিধান: আধুনিক স্থায়ী চুলের রং (permanent hair dye) যদি চুলে এমন পুরু স্তর তৈরি করে যা ওজুর সময় পানি চুলের গোড়ায় পৌঁছাতে বাধা দেয়, তবে ওজু-গোসল সহিহ হবে না। এমতাবস্থায় ওজু-গোসলের আগে রং উঠিয়ে ফেলা আবশ্যক। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১৫৪; ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৯)
-
নাপাক উপাদান: যদি রঙে হারাম বা নাপাক (যেমন: শূকরের চর্বিজাত, অ্যালকোহলযুক্ত) উপাদান থাকে, তবে তা ব্যবহার নাজায়েজ। উপাদান হালাল ও পবিত্র হতে হবে। (ফতোয়ায়ে রহিমিয়্যাহ, খণ্ড ৬, পৃ. ২৫৪)
-
নকল চুল/উইগ: চুলে কৃত্রিম চুল (wig/extension) লাগানো হানাফি মতে নাজায়েজ (যদি না জরুরত হয়)। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৩৪; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৭৫০)
সারসংক্ষেপ সিদ্ধান্ত
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | কালো রং দিয়ে চুল/দাড়ি রং করা | নাজায়েজ/হারাম (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মুহাম্মদ) | | মেহেদি (লাল) দিয়ে রং করা | জায়েয (সুন্নতসদৃশ) | | কাতাম (কালচে-বাদামি) দিয়ে রং করা | জায়েয | | ব্লন্ড/বাদামি/অন্য রং (হালাল উপাদানে) | জায়েয (শর্তসাপেক্ষে) | | স্বামীর আদেশে কালো রং | মানা যাবে না | | গায়রে মাহরামের সামনে প্রদর্শন | হারাম | | ওজু আটকে দেয় এমন পুরু রং | ওজু সহিহ হবে না |
আল্লাহ ভালো জানেন।