মহিলাদের চুল কালার করা যাবে কি? কালো ছাড়া মেহেদি, কাতাম বা অন্য রং জায়েয কি?

Sunnah and Bid'ah · Hanafi

Question No: 7505
Questioner: Sadia Afrin
Question Asked: 28 Oct 2026, 08:16 PM
Reviewed & Published: 28 Oct 2026, 09:12 PM
Views: 44
Tokens: 4,141
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

মহিলাদের চুল কালার করা যাবে কিনা? কালো কালার বাদে অন্য কালার করা যাবে কি ?

Answer

মহিলাদের চুল কালার করা যাবে কি? (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বিস্তারিত উত্তর)

সংক্ষিপ্ত উত্তর

কালো রং দিয়ে চুল কালার করা নাজায়েজ — চাই পুরুষ হোক বা মহিলা, চাই চুলে হোক বা দাড়িতে। তবে কালো ছাড়া অন্য রং (যেমন: মেহেদি/লাল, বাদামি, ব্লন্ড ইত্যাদি) দিয়ে চুল রং করা জায়েজ, শর্ত হলো—

  1. এটি সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য হবে, স্বামীর অনুমতিতে (মহিলাদের ক্ষেত্রে)।
  2. তাতে কোনো প্রতারণা/ধোঁকা না থাকবে (যেমন: বুড়োকে যুবক দেখানোর উদ্দেশ্য না হওয়া)।
  3. ব্যবহৃত রং/পদার্থ হারাম ও নাপাক (নাজাসাত) থেকে পবিত্র হবে।
  4. চুলে রং লাগানোর কারণে ওজুর পানি চুলের গোড়ায় পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি হবে না (অর্থাৎ রং যদি এমন পুরু স্তর হয় যা পানি আটকে দেয়, তবে ওজু-গোসল সহিহ হবে না)।

কুরআন ও হাদিসের দলিল

১. কালো রং নিষিদ্ধ হওয়ার দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

«غَيِّرُوا هَذَا الشَّيْبَ وَاجْتَنِبُوا السَّوَادَ»

"এই (দাড়ির) শুভ্রতাকে পরিবর্তন করো এবং কালো রং থেকে বেঁচে থাকো।"

— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪২০৩; সুনানে নাসাঈ, হাদিস ৫০৭৭; মুসনাদে আহমাদ

আরেক হাদিসে:

«إِنَّ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى لَا يَصْبُغُونَ فَخَالِفُوهُمْ»

"ইহুদি ও খ্রিস্টানরা (বার্ধক্যের শুভ্রতা) রং করে না, সুতরাং তোমরা তাদের বিরোধিতা করো।"

— সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৮৯৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১০৩

ইমাম তিরমিজি (রহ.) এই হাদিসগুলোর ব্যাখ্যায় বলেন, আহলে ইলমের সর্বসম্মত মত হলো কালো রং দিয়ে শুভ্রতা ঢাকা মাকরুহ/নিষিদ্ধ। (জামে তিরমিজি, হাদিস ১৭৫১-এর ব্যাখ্যা)

২. কালো ছাড়া অন্য রং জায়েয হওয়ার দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِنَّ أَحْسَنَ مَا غَيَّرْتُمْ بِهِ الشَّيْبَ الْحِنَّاءُ وَالْكَتَمُ»

"নিশ্চয়ই শুভ্রতা পরিবর্তনের সর্বোত্তম উপকরণ হলো মেহেদি (লাল) ও কাতাম (কালচে-নীল/বাদামি)।"

— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪২০৫; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৭৫২; সুনানে নাসাঈ

এছাড়া হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.) মেহেদি ও কাতাম দিয়ে চুল/দাড়ি রং করতেন — যা সাহাবাদের আমল হিসেবে প্রমাণিত। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা; আল-মুগনি)


হানাফি ফিকহের বিস্তারিত আলোচনা

ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) — রাদ্দুল মুহতার

«وَيُكْرَهُ الْخِضَابُ بِالسَّوَادِ لِلرَّجُلِ وَالْمَرْأَةِ»

"পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্যই কালো রং দিয়ে খিদাব (রং) করা মাকরুহ (নিষিদ্ধ)।"

— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৭৫৬ (দারুল ফিকর সংস্করণ)

তিনি আরও উল্লেখ করেন, যদি কারো স্বামী বা পিতা কালো রং করতে আদেশ দেয়, তবে তা মানা যাবে না; কারণ এটি সুস্পষ্ট নিষিদ্ধ কাজে সহযোগিতা। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৭৫৭)

ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানি (রহ.) — আল-হিদায়া

«وَلَا بَأْسَ بِالْخِضَابِ بِالْحِنَّاءِ وَالْكَتَمِ، وَأَمَّا بِالسَّوَادِ فَلَا»

"মেহেদি ও কাতাম দিয়ে রং করা দোষণীয় নয়; কিন্তু কালো দিয়ে রং করা যাবে না।"

— আল-হিদায়া, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ

ফতোয়ায়ে আলমগিরি (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া)

«الْخِضَابُ بِالسَّوَادِ حَرَامٌ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ وَمُحَمَّدٍ، وَقَالَ أَبُو يُوسُفَ: يُكْرَهُ»

"ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে কালো রং করা হারাম; ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে মাকরুহ তাহরিমি।"

— ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫৮

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) — মাআরিফুল কুরআন

সূরা বাকারার ১৩৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি লেখেন, "আল্লাহর রং" তথা ইসলামের স্বাভাবিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা কর্তব্য; কৃত্রিমভাবে চেহারা-চুল পরিবর্তন করে নিজের বয়স বা পরিচয় গোপন করা ইসলামের শিক্ষা নয়। (মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃ. ৪১৬)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) — ফতোয়ায়ে উসমানি

"কালো রং দিয়ে চুল বা দাড়ি রং করা নাজায়েজ। তবে মেহেদি, কাতাম বা অন্যান্য রঙ ব্যবহার করা জায়েয।"

— ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৬৭ (খিদাব অধ্যায়)

হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) — বেহেশতি জেওর

"দাড়ি-চুলে কালো রং লাগানো নিষিদ্ধ। হ্যাঁ, মেহেদি বা অন্য রঙ লাগানো জায়েয।"

— বেহেশতি জেওর, খণ্ড ৩ (পর্দা ও সৌন্দর্য অধ্যায়)


মহিলাদের জন্য বিশেষ বিবেচনা

  1. স্বামীর অনুমতি: মহিলারা সাধারণত স্বামীর সন্তুষ্টির জন্য সাজেন। কালো ছাড়া অন্য রং স্বামীর অনুমতিতে করতে পারবেন। তবে স্বামী যদি কালো রং করতে বলে, তবে তা মানা যাবে না — কারণ এটি হারাম কাজে সহযোগিতা (সূরা মায়িদা: ২)।

  2. গায়রে মাহরামের সামনে প্রদর্শন: চুলে রং করা নিজে জায়েয হলেও গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন করা হারাম। (সূরা নূর: ৩১; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৭)

  3. কেমিক্যাল রং ও ওজুর বিধান: আধুনিক স্থায়ী চুলের রং (permanent hair dye) যদি চুলে এমন পুরু স্তর তৈরি করে যা ওজুর সময় পানি চুলের গোড়ায় পৌঁছাতে বাধা দেয়, তবে ওজু-গোসল সহিহ হবে না। এমতাবস্থায় ওজু-গোসলের আগে রং উঠিয়ে ফেলা আবশ্যক। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১৫৪; ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৯)

  4. নাপাক উপাদান: যদি রঙে হারাম বা নাপাক (যেমন: শূকরের চর্বিজাত, অ্যালকোহলযুক্ত) উপাদান থাকে, তবে তা ব্যবহার নাজায়েজ। উপাদান হালাল ও পবিত্র হতে হবে। (ফতোয়ায়ে রহিমিয়্যাহ, খণ্ড ৬, পৃ. ২৫৪)

  5. নকল চুল/উইগ: চুলে কৃত্রিম চুল (wig/extension) লাগানো হানাফি মতে নাজায়েজ (যদি না জরুরত হয়)। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৩৪; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৭৫০)


সারসংক্ষেপ সিদ্ধান্ত

| বিষয় | হুকুম | |---|---| | কালো রং দিয়ে চুল/দাড়ি রং করা | নাজায়েজ/হারাম (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মুহাম্মদ) | | মেহেদি (লাল) দিয়ে রং করা | জায়েয (সুন্নতসদৃশ) | | কাতাম (কালচে-বাদামি) দিয়ে রং করা | জায়েয | | ব্লন্ড/বাদামি/অন্য রং (হালাল উপাদানে) | জায়েয (শর্তসাপেক্ষে) | | স্বামীর আদেশে কালো রং | মানা যাবে না | | গায়রে মাহরামের সামনে প্রদর্শন | হারাম | | ওজু আটকে দেয় এমন পুরু রং | ওজু সহিহ হবে না |


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.