মেটা, গুগল ও টিকটকের মতো গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে টাকা দিয়ে পেড মার্কেটিং বা বিজ্ঞাপন প্রচার করা শরিয়তের দৃষ্টিতে কি জায়েজ হবে?
Business and Job · Hanafi
Question
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ব্যবসা পরিচালনা ও প্রসারের জন্য ফেসবুক (মেটা), গুগল ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে পেড অ্যাড বা মিডিয়া বায়িং করা একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনেক ব্যবসা ও ক্রিয়েটিভ এজেন্সি তাদের হালাল পণ্য বা সেবা মানুষের কাছে পৌঁছাতে এই মাধ্যমগুলোতে নিয়মিত বড় অংকের অর্থ খরচ করে থাকে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই বিষয়related একটি তীব্র নৈতিক ও ইমানি সংকট আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। বিষয়টি হলো—এই টেক জায়ান্টগুলো তাদের অর্জিত আয়ের বড় একটি অংশ বা পরোক্ষ ট্যাক্স এমন রাষ্ট্র ও শক্তির অর্থনীতিতে অবদান রাখে, যা ফিলিস্তিনে আমাদের মুসলিম ভাইদের ওপর বর্বরোচিত হামলা ও নির্যাতনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
“আপনি অবশ্যই ঈমানদারদের জন্য মানুষের মধ্যে সবচেয়ে শত্রু হিসেবে পাবেন ইহুদী ও মুশরিকদেরকে।” (সূরা মায়িদা: ৮২)
পাশাপাশি হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
“পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির দিক থেকে মুমিনদের উদাহরণ হলো একটি দেহের মতো। যখন তার একটি অঙ্গ অসুস্থ হয়, তখন তার সমস্ত দেহ জাগরণ (অনিদ্রা) ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।” (সহীহ বুখারি: ৬০১১, সহীহ মুসলিম: ৬৩৫০)
এই প্রেক্ষাপটে কিছু হক্কানী ওলামায়ে কেরাম মনে করেন যে, এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন চালানো মানে পরোক্ষভাবে জালিমদের ফান্ড শক্তিশালী করা এবং মুসলিম হত্যায় সহযোগিতা করার শামিল। অন্যদিকে, বর্তমান আধুনিক ব্যবসায়িক বাস্তবতায় হালাল রিজিক অন্বেষণ, প্রচার-প্রসার এবং বিজনেস টিকে রাখার জন্য এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করা ছাড়া বিকল্প কোনো শক্তিশালী গ্লোবাল মাধ্যমও আমাদের হাতে নেই।
এই জটিল বাস্তবতার আলোকে আপনার কাছে আমাদের বিনীত জিজ্ঞাসাগুলো নিম্নরূপ:
১. একজন মুসলিম ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তার জন্য মেটা (ফেসবুক), গুগল ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে অর্থ প্রদান করে পেড অ্যাড বা মার্কেটিং করা শরিয়তের দৃষ্টিতে কি সম্পূর্ণ নাজায়েজ, নাকি পরিস্থিতির কারণে এর কোনো ভিন্ন হুকুম রয়েছে?
২. এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মালিকপক্ষ বা করপোরেট পলিসি যদি ইসলামবিরোধী বা আগ্রাসী শক্তির সহায়তাকারী হয়, তবে তাদের সেবা ব্যবহার করে হালাল ব্যবসা পরিচালনা করাকে কোন দৃষ্টিতে দেখা হবে?
৩. বর্তমান গ্লোবাল ইকোনমিতে সম্পূর্ণ স্বাধীন বা বিকল্প কোনো মুসলিম টেক প্ল্যাটফর্ম না থাকায়, নিজের হালাল ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এবং অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হয়ে উম্মাহর খেদমত করার উদ্দেশ্যে এই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করার ক্ষেত্রে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো 'জরুরত' বা ছাড়ের অবকাশ আছে কি না?
৪. এই বিষয়ে একজন মুমিন ব্যবসায়ীর জন্য সঠিক ও ইমানসম্মত কর্মপন্থা কী হওয়া উচিত? বিষয়টি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।
Answer
ফেসবুক (মেটা), গুগল ও টিকটকে পেইড অ্যাড/মার্কেটিং-এর শরয়ী হুকুম
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সূক্ষ্ম ও সময়োপযোগী। এতে ইবাদত-বন্দেগি, হালাল রিজিক, উম্মাহর প্রতি দায়বদ্ধতা এবং বাস্তব বাণিজ্যিক প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্ন জড়িত। নিচে কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহে হানাফীর মূলনীতির আলোকে ধাপে ধাপে উত্তর পেশ করা হলো।
ভূমিকা: মাসআলার মূলনীতি (তাহকীক)
ফিকহে ইসলামীর একটি সর্বজনীন মূলনীতি হলো—
«الوسائل لها أحكام المقاصد» "উপায়-মাধ্যমের হুকুম তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের হুকুমের অধীন।"
অর্থাৎ কোনো কাজ নিজে যদি হারাম না হয়, কিন্তু তা সরাসরি হারাম বা জুলুমের সহায়ক হয়, তবে তা নিষিদ্ধ; আর যদি তা হারামের সহায়ক না হয়, বরং বৈধ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তবে তা বৈধ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
«وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ» "তোমরা নেকী ও তাকওয়ায় পরস্পরকে সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
«وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ» "তোমরা জালিমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, তাহলে আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে।" (সূরা হুদ: ১১৩)
এই দুটি আয়াতই আমাদের আলোচনার মূল ভিত্তি। এখন প্রশ্নের প্রতিটি অংশের উত্তর দেওয়া হলো।
১ম প্রশ্ন: পেইড অ্যাড/মার্কেটিং করা কি সম্পূর্ণ নাজায়েজ, নাকি পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হুকুম?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দেওয়া নিজে স্বভাবতই মুবাহ (বৈধ); কারণ এটি একটি বৈধ সেবার (বিজ্ঞাপন প্রচারের) বিনিময়। তবে এর হুকুম নির্ভর করে কী বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে এবং কোন উদ্দেশ্যে ও কোন পরিস্থিতিতে দেওয়া হচ্ছে—এর উপর।
ক. যে অবস্থায় সম্পূর্ণ জায়েজ
১. হালাল পণ্য/সেবার বিজ্ঞাপন — যেমন হালাল খাদ্য, শরীয়তসম্মত পোশাক, হালাল ব্যবসা, দ্বীনি শিক্ষা, কুরআন শিক্ষা ইত্যাদি। ২. বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু শরীয়তসম্মত — ছবি, সংগীত, অশ্লীলতা, মিথ্যা ওয়াদা, প্রতারণা, সুদ-জুয়া-মদ ইত্যাদি থেকে মুক্ত। ৩. প্ল্যাটফর্মের মূল সেবা (বিজ্ঞাপন প্রচার) নিজে হারাম নয়; বরং এটি একটি প্রচারমাধ্যম।
ফিকহে হানাফীর মূলনীতি হলো—«الأصل في الأشياء الإباحة» (প্রত্যেক বস্তুর মূল হুকুম বৈধতা), যতক্ষণ না কোনো হারাম দলিল পাওয়া যায়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ এবং «ফাতাওয়া আলমগিরি»-তে এ মূলনীতি বহু স্থানে উল্লেখ করেছেন।
খ. যে অবস্থায় নাজায়েজ বা মাকরুহ
১. হারাম পণ্যের বিজ্ঞাপন — মদ, সুদ, জুয়া, অশ্লীলতা, হারাম খাদ্য, ছবি-সংগীতপ্রধান বিজ্ঞাপন ইত্যাদি। এগুলোতে অর্থ ব্যয় করা সরাসরি হারাম; কারণ এটি ইসম ও উদওয়ানে (পাপ ও সীমালঙ্ঘনে) সহযোগিতা। ২. প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন — মিথ্যা দাবি, অতিরঞ্জন, ভোক্তাকে ধোঁকা দেওয়া। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—«مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا» "যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোঁকা দিল, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম: ১০১) ৩. যেখানে অর্থ সরাসরি জুলুমে ব্যবহৃত হয় — এ বিষয়ে বিস্তারিত ২য় প্রশ্নে।
সারকথা: প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার নিজে হারাম নয়; বরং বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্য এর হুকুম নির্ধারণ করে।
২য় প্রশ্ন: প্ল্যাটফর্মের মালিকপক্ষ ইসলামবিরোধী/আগ্রাসী শক্তির সহায়ক হলে সেবা ব্যবহারের হুকুম কী?
এটি প্রশ্নের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে কয়েকটি দিক পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।
ক. সরাসরি যুদ্ধ ও হত্যায় সহায়তা (الإعانة على القتل)
যদি প্রমাণিত হয় যে, কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি মুসলিম হত্যায় অস্ত্র, অর্থ বা সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, তবে তার সাথে লেনদেন ও তাকে অর্থ প্রদান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
«وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ» (সূরা মায়িদা: ২)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ (কিতাবুল জিহাদ ও কিতাবুল কারাহিয়্যাহ) উল্লেখ করেন যে, আহলুল হারব (যুদ্ধরত শত্রু)-কে অস্ত্র বা যুদ্ধসামগ্রী বিক্রি করা নাজায়েজ; কারণ তা সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহায়তা। এই মূলনীতির আলোকে—যদি কোনো প্ল্যাটফর্মের অর্থ সরাসরি মুসলিম হত্যার অস্ত্রে রূপান্তরিত হয়, তবে তার সেবায় অর্থ ব্যয় করা জায়েজ নয়।
খ. পরোক্ষ কর/রাজস্ব (الضرائب غير المباشرة)
কিন্তু বাস্তবতা হলো—একটি গ্লোবাল কোম্পানির কর্পোরেট ট্যাক্স, কর্মচারী বেতন, শেয়ারহোল্ডার লভ্যাংশ, অবকাঠামো ব্যয় ইত্যাদি বহুমুখী খাতে ব্যয় হয়। এর একটি অংশ বিভিন্ন রাষ্ট্রের কোষাগারে যায়, যার মধ্যে কোনো রাষ্ট্রের নীতির সাথে আমাদের অসন্তোষ থাকতে পারে। কিন্তু প্রত্যেক করদাতার করের প্রতিটি অংশ কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধে ব্যয় হয়—এটি প্রমাণ করা কঠিন; বরং তা একটি সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় বাজেটের অংশ।
ফিকহের মূলনীতি এখানে হলো—
«إذا تَعَذَّرَ الْيَقِينُ يُعْمَلُ بِالظَّاهِرِ» এবং «الْأَصْلُ بَرَاءَةُ الذِّمَّةِ»
অর্থাৎ সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো বৈধ লেনদেনকে হারাম সাব্যস্ত করা যায় না। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ (খণ্ড ৬, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা) এবং ইমাম তহতাবী «হাশিয়াতু তহতাবী আলা মিরকাত»-এ উল্লেখ করেছেন যে, কোনো বস্তু বা লেনদেনের মধ্যে হারাম উপাদান নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হলে তাকে হারাম বলা যায় না।
গ. মুসলিম ব্যবসায়ীর করণীয় পার্থক্য
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে:
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | সরাসরি অস্ত্র/যুদ্ধে অর্থায়ন প্রমাণিত | নাজায়েজ (হারাম) | | সাধারণ কর্পোরেট ট্যাক্স/ব্যয় (যার নির্দিষ্ট গন্তব্য অজ্ঞাত) | মুবাহ/জায়েজ, তবে সতর্কতা উত্তম | | প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে হারাম পণ্যের বিজ্ঞাপন | নাজায়েজ | | প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে হালাল পণ্যের বিজ্ঞাপন | জায়েজ |
সারকথা: প্ল্যাটফর্মের মালিকপক্ষের সামগ্রিক নীতি নিয়ে অসন্তোষ থাকা সত্ত্বেও, সরাসরি যুদ্ধে অর্থায়ন প্রমাণিত না হলে শুধু "সম্ভাব্য পরোক্ষ সহায়তা"র ভিত্তিতে হালাল ব্যবসার প্রচারকে সম্পূর্ণ হারাম বলা যায় না। তবে সতর্কতা ও বিকল্প অন্বেষণ অবশ্যই করণীয় (৩য় প্রশ্নে বিস্তারিত)।
৩য় প্রশ্ন: বিকল্প না থাকায় 'জরুরত' বা ছাড়ের অবকাশ আছে কি?
ক. জরুরতের শরয়ী মূলনীতি
ফিকহে ইসলামীর একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মূলনীতি—
«الضَّرُورَاتُ تُبِيحُ الْمَحْظُورَاتِ» "জরুরত নিষিদ্ধ বস্তুকে বৈধ করে।"
তবে এর সাথে একটি অপরিহার্য শর্ত জড়িত—
«الضَّرُورَةُ تُقَدَّرُ بِقَدَرِهَا» "জরুরত তার পরিমাণ অনুযায়ী অনুমোদিত।"
অর্থাৎ জরুরতের কারণে যে ছাড় দেওয়া হয়, তা শুধু জরুরত পরিমাণেই সীমাবদ্ধ থাকবে; এর বেশি নয়। এই মূলনীতি ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ (খণ্ড ৫, কিতাবুল হাযর) এবং «ফাতাওয়া আলমগিরি»-তে বহু স্থানে উদ্ধৃত হয়েছে। ইমাম শাতিবী (রহ.) «আল-মুওয়াফাকাত»-এও এ মূলনীতির বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
ক. জরুরতের স্তরভেদ
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করতে হবে:
১. জরুরত হাকিকি (প্রকৃত জরুরত): জীবন রক্ষা, প্রাণনাশ থেকে বাঁচা ইত্যাদি। এখানে ছাড় সর্বাধিক।
২. হাজত (প্রয়োজন): ব্যবসা টিকিয়ে রাখা, জীবিকা অর্জন। এটি জরুরতের চেয়ে নিম্নস্তরের; তবে ফিকহে হানাফীতে হাজতও কিছু ছাড়ের কারণ হয় (যেমন—সালাম ও ইস্তিসনা চুক্তির বৈধতা)।
৩. তাসহীল (সুবিধা): শুধু আরাম-আয়েশ। এখানে ছাড় নেই।
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে: হালাল ব্যবসা টিকিয়ে রাখা ও উম্মাহর খেদমতের সামর্থ্য অর্জন—এটি হাজত স্তরের, যা ফিকহে হানাফীতে কিছু ছাড়ের কারণ হতে পারে। কিন্তু এটি জরুরত হাকিকি নয়; তাই এর ভিত্তিতে সরাসরি হারাম কাজ (যেমন হারাম পণ্যের বিজ্ঞাপন) জায়েজ হবে না।
খ. বাস্তব প্রয়োগ
১. হালাল পণ্যের বিজ্ঞাপন — এটি মূলত জায়েজ; জরুরতের প্রশ্নই আসে না। কারণ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার নিজে হারাম নয়। ২. যদি কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের অর্থ সরাসরি যুদ্ধে যায় বলে নিশ্চিত প্রমাণ থাকে — তবে জরুরতের ভিত্তিতে তা ব্যবহার করা যাবে না; বরং বিকল্প খুঁজতে হবে। কারণ জরুরত হারামকে বৈধ করে না, বরং নিষিদ্ধ বস্তুর ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হলে তা সীমিত আকারে অনুমোদিত হয়। কিন্তু এখানে বিকল্প (অন্য প্ল্যাটফর্ম, স্থানীয় প্রচার, সরাসরি বিপণন) বিদ্যমান। ৩. বিকল্প না থাকা — বর্তমানে সম্পূর্ণ বিকল্প না থাকলেও আংশিক বিকল্প (যেমন—ইমেইল মার্কেটিং, স্থানীয় বিজ্ঞাপন, ওয়েবসাইট, ইউটিউব, ইসলামি প্ল্যাটফর্ম) বিদ্যমান। তাই "কোনো বিকল্প নেই" —এ কথা সম্পূর্ণ সঠিক নয়।
সারকথা: হালাল ব্যবসার প্রচারে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার মূলত জায়েজ; তবে সরাসরি যুদ্ধে অর্থায়ন প্রমাণিত হলে জরুরতের অজুহাতে তা জায়েজ হবে না। আর সতর্কতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি (যেমন—যতটা সম্ভব বিকল্প ব্যবহার, বিজ্ঞাপনের পরিমাণ কমিয়ে আনা) ইমানদারের কর্তব্য।
৪. একজন মুমিন উদ্যোক্তার জন্য সঠিক ও ঈমানসম্মত কর্মপন্থা (রোডম্যাপ):
মেটা, গুগল বা টিকটকে বিজ্ঞাপন দেওয়ার অবকাশ থাকলেও একজন দায়িত্বশীল মুমিন উদ্যোক্তার শরঈ কর্মপন্থা নিম্নরূপ হওয়া উচিত:
১. বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু শতভাগ হালাল ও শরীয়াহসম্মত রাখা: বিজ্ঞাপনে কোনো বাদ্যযন্ত্র (Music), অশালীন ছবি, বেপর্দা নারী, মিথ্যা দাবি বা প্রতারণামূলক কথা যুক্ত করা যাবে না। কেবল হালাল পণ্য/সেবার শালীন উপস্থাপনা থাকতে হবে।
- রেফারেন্স: ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৯তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৭০–২৭৪; দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৯৯–৪০০।
২. অপ্রয়োজনীয় অপচয় রোধ করা: বিজ্ঞাপনে অতিরিক্ত অংক অপচয় না করে অর্গানিক প্রচার, কাস্টমার সার্ভিস ও নিজস্ব ইমেইল/ওয়েবসাইট ভিত্তিক মার্কেটিং ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া।
৩. উম্মাহর সাহায্য ও দান-সদকা বৃদ্ধি করা: ব্যবসায়ের অর্জিত হালাল মুনাফা থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিত ফিলিস্তিন ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের নির্যাতিত ও অসহায় মুসলিমদের ত্রাণ ও সাহায্য ফান্ডে দান করা।
৪. বিকল্প মুসলিম টেক প্ল্যাটফর্ম গঠনে ভূমিকা রাখা: সামর্থ্য অনুযায়ী মুসলিম আইটি বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের স্বাধীন টেক প্ল্যাটফর্ম গঠনে উৎসাহিত করা ও বিনিয়োগ করা, যাতে ভবিষ্যতে বিজাতীয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা যায়।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৯ ও ১৩৩ (অধ্যায়: 'ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও মুসলিম উম্মাহকে সহায়তার গুরুত্ব'); এবং ১৬তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২১–১২৩।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯২–১৯৩ (অধ্যায়: 'হালাল উপার্জনের বরকত ও মুসলিম অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করার দায়িত্ব')।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে হালাল উপার্জনে বরকত দান করুন এবং উম্মাহর জন্য কল্যাণকর ব্যবসায়ী হিসেবে কবুল করুন। আমীন।