বিকাশে/ নগদে কারো কাছ থেকে চার্জ সহ নিয়ে পরে সেই টাকা অন্য কাউকে পেমেন্ট করে দিলাম অথবা বিল পরিশোধ করলাম অথবা রিচার্জ করে টাকা ক্যাশ করলাম অথবা আবার কিছু টাকা ক্যাশ আউট‌ও করলাম

Business and Job · Hanafi

Question No: 7498
Questioner: MD Murad Hossain
Question Asked: 28 Oct 2026, 06:58 PM
Reviewed & Published: 28 Oct 2026, 09:27 PM
Views: 49
Tokens: 10,301
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ,
আমরা যারা অনলাইনে/ অলাইনে বিজনেস করি অথবা ব্যাক্তিগতভাবেই কারো কাছ থেকে টাকা বিকাশে/ নগদে নেওয়ার সময় বলি যে চার্জ সহ দিতে হাজারে ২০ টাকা হিসেবে অথবা অনেকেই আবার না বললেও নিজে থেকেই চার্জ সহ পাঠায়। আমরা যখন অনলাইনে অর্ডার নেই তখন অর্ডার কনফার্ম করার জন্য ধরেন বললাম ৫১০ টাকা বা ১০২০ টাকা পাঠাতে হবে পরে আপনার মূল টাকা থেকে ৫০০ অথবা ১০০০ টাকা বাদ দিয়ে বাকি টাকা পরিশোধ করবেন। আর উইযে ১০ টাকা অথবা ২০ টাকা বেশি নিয়েছি সেটা চার্জ হিসেবে রাখা হবে। কিন্তু অনেক সময় সেই সবগুলো টাকা ক্যাশ আউট না করে যদি অন্য কোথাও পেমেন্ট করি অথবা বিল পরিশোধ করি অথবা কাউকে পাঠাই দেই অথবা রিচার্জ করি তাহলে আমি যে চার্জ নিচ্ছি সেটা কি নেওয়া যাবে? আবার অনেক সময় কিছু টাকা হয়তো ক্যাশ আউট করে চার্জ দিয়ে ক্যাশ টাকায় রূপান্তর করলাম আর কিছু টাকা অন্য কোনো উপায়ে চার্জ ছাড়াই ক্যাশ টাকায় রূপান্তর করলাম। তাহলে সেই নির্দিষ্ট একটা চার্জ যে কাস্টমার বা অন্য কারো কাছ থেকে নিচ্ছি এটাকি নেওয়া যাবে ? আরো একটি বিষয় হলো বিকাশে ক্যাশ আউট করতে সাধারণত প্রতি হাজারে ১৮.৫০ টাকা , প্রিয় এজেন্ট হলে আরো একটু কম চার্জ কাটে আর নগদেও ক্যাশ আউট করতে ১৫ টাকা এর মতো আবার কিছু ক্ষেত্রে আরো কম কাটে। তাহলে আমরা যে খুচরা ১.৫(দেড়) টাকা বা ৫ টাকা এর ঝামেলা এড়ানোর জন্য আমরা নিজে থেকে কাস্টমার বা অন্য কারো থেকে টাকা নেওয়ার সময় হাজারে ২০ টাকা চার্জ হিসেবে নিচ্ছি।‌ সেটা কি নেওয়া যাবে ? আমরা সেই টাকাটা সবসময় হয়তো ক্যাশ আউট না করেই অন্য মাধ্যমে খরচ হয়ে যায় অথবা কিছু টাকা ক্যাশ আউট কিছু টাকা অন্য কোনো মাধ্যমে খরচ করি সে ক্ষেত্রে চার্জ কম লাগে আবার কিছু ক্ষেত্রে লাগেও না এখন তাহলে এটার সমাধান কি।
আমরা যদি চার্জ টা না নেই তাহলে কখনো কিছু টাকা ক্যাশ আউট করলে মূল টাকা থেকে চলে যাচ্ছে। আবার যদি চার্জ নিয়ে ক্যাশ আউট না করে অন্য মাধ্যমে টাকা খরচ করি বা ক্যাশ টাকায় রূপান্তর করি তাহলে কিছু চার্জ অথবা পুরো চার্জ ই থেকে যায়। এখন এই ক্ষেত্রে আমাদের জন্য কি এই চার্জ টা নেওয়া জায়েজ আছে।

Answer

বিকাশ/নগদে চার্জ নিয়ে লেনদেনের শরয়ী বিধান

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

অনলাইন ও অফলাইন ব্যবসায় বিকাশ, নগদ বা অন্যান্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)-এর মাধ্যমে লেনদেন করার সময় 'ক্যাশ আউট চার্জ' বা অতিরিক্ত টাকা নেওয়া সংক্রান্ত আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও আধুনিক বাণিজ্যিক ফিকহের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আপনার উত্থাপিত জটিলতাগুলোর শরঈ কারণ, ফিকহী বিশ্লেষণ এবং প্রামাণ্য কিতাবের হাওয়ালা (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ) সহজ ও স্পষ্ট সমাধান নিচে তুলে ধরা হলো:


১. মূল ফিকহী নীতি ও সমস্যা চিহ্নিতকরণ

বিকাশ বা নগদে টাকা নেওয়ার সময় কাস্টমার থেকে অতিরিক্ত ১০/২০ টাকা নেওয়ার দুটি আলাদা ফিকহী সুরত (অবস্থা) হতে পারে:

সুরত-১: 'বাস্তব ক্যাশ আউট খরচ' (Actual Expenses) হিসেবে দাবি করে টাকা নেওয়া

যদি কাস্টমারকে বলা হয়— "এটি বিকাশের ক্যাশ আউট খরচ বাবদ নেওয়া হচ্ছে"—তবে ফিকহের বিচারে এটি 'তগতীয়াতুল তাকালেফ' ( খরচ বা Reimbursement of Expenses) হিসেবে গণ্য হয়।

  • সমস্যা: আপনি যদি ক্যাশ আউট না করে সেই টাকা দিয়ে ফ্লেক্সিলোড করেন, বিল পে করেন, মার্চেন্ট পেমেন্ট করেন বা কোনো খরচ ছাড়াই ক্যাশ টাকায় রূপান্তর করেন—অথবা ক্যাশ আউট করলেও বিকাশের আসল খরচ ১৮.৫০ টাকা কিন্তু আপনি ২০ টাকা রাখলেন—তবে কাস্টমারকে সত্য না বলে অতিরিক্ত টাকা রাখা ফিকহের দৃষ্টিতে "ধোঁকা ও অসত্য উপায়ে অপরের সম্পদ গ্রহণ" (أكل أموال الناس بالباطل)-এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

সুরত-২: 'প্রসেসিং ফি বা সার্ভিস চার্জ' (Processing/Service Fee) হিসেবে নেওয়া

ইসলামী ফিকহে বিক্রেতা ও গ্রাহকের পারস্পরিক সম্মতিক্রমে (عن تراضٍ) পণ্যের মূল্যের সাথে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ ও অনলাইন সার্ভিস পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট 'সার্ভিস চার্জ' বা 'প্রসেসিং ফি' নির্ধারণ করা সম্পূর্ণ জায়েয।

  • যদি কাস্টমারকে ক্যাশ আউটের দোহাই না দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়— "অনলাইন সার্ভিস/প্রসেসিং ফি বাবদ ২০ টাকা রাখা হচ্ছে"—তবে কাস্টমার তা মেনে নিলে উক্ত টাকা বিক্রেতার জন্য সম্পূর্ণ হালাল হয়ে যায়; তা সে ক্যাশ আউট করুক, বিলে ব্যবহার করুক বা সেভাবে রেখে দিক।

২. আপনার প্রশ্নগুলোর পর্যায়ক্রমিক শরঈ সমাধান

প্রশ্ন ১ ও ২: ক্যাশ আউট না করে বিলে ব্যবহার করলে বা আংশিক ক্যাশ আউট করলে চার্জ রাখা জায়েয কি?

  • উত্তর: যদি আপনি স্পষ্টভাবে এটিকে "ক্যাশ আউট খরচ" বলে থাকেন, তবে ক্যাশ আউট না করলে বা অন্য খাতে খরচ করলে সেই টাকা রাখা জায়েয হবে না; কারণ যে কাজের কথা বলে টাকাটি নিয়েছেন (ক্যাশ আউট), তা বাস্তবে সংঘটিত হয়নি।
  • তবে যদি আপনি কৌশল পরিবর্তন করে এটিকে ক্যাশ আউট খরচ না বলে "এমএফএস প্রসেসিং ফি" বা "সার্ভিস চার্জ" হিসেবে নেন, তবে আপনি তা দিয়ে বিল পে করেন, রিচার্জ করেন বা ক্যাশ আউট করেন—সর্বাবস্থায় উক্ত টাকা নেওয়া আপনার জন্য সম্পূর্ণ জায়েয হবে।

প্রশ্ন ৩: ১৮.৫০ বা ১৫ টাকার জায়গায় গোল সংখ্যা (২০ টাকা) ধরা জায়েয কি?

  • উত্তর: খুচরা টাকা (১.৫০ বা ৫ টাকা)-এর ঝামেলা এড়াতে "ক্যাশ আউট খরচ" বলে ২০ টাকা নেওয়া ঠিক নয়; কারণ এতে প্রকৃত খরচের চেয়ে বেশি নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যদি চুক্তির সময় উভয়ের সম্মতিতে তা "অর্ডার প্রসেসিং/সার্ভিস চার্জ ২০ টাকা" হিসেবে সাব্যস্ত করে নেওয়া হয়, তবে গোল সংখ্যা হিসেবে ২০ টাকা রাখা সম্পূর্ণ জায়েয ও বৈধ।

৩. ব্যবসার জন্য সবচেয়ে সহজ ও শরী'আহসম্মত ৩টি সমাধান

আপনাদের ব্যবসার সুবিধার্থে এবং অহেতুক সন্দেহ ও গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য নিচে ৩টি সহজ বিকল্প দেওয়া হলো:

  1. পদ্ধতি ১ (সর্বোত্তম ও ঝামেলামুক্ত সমাধান — 'প্রসেসিং ফি' নামকরণ করা): কাস্টমারকে "ক্যাশ আউট চার্জ" না বলে স্পষ্ট ভাষায় বলুন: "অনলাইন এমএফএস প্রসেসিং ফি" (MFS Processing Fee) বা "সার্ভিস চার্জ"।

    • যেমন বলুন: "অর্ডার কনফার্ম করার জন্য ৫০০ টাকা অগ্রিম এবং ২০ টাকা প্রসেসিং ফি সহ মোট ৫২০ টাকা পাঠাতে হবে।"
    • কাস্টমার যখন এটি মেনে নিয়ে টাকা পাঠাবে, তখন এটি একটি বৈধ সার্ভিস ফি হিসেবে আপনার মালিকানায় আসবে। এরপর আপনি ক্যাশ আউট করুন বা না করুন, পুরো টাকাটিই আপনার জন্য শতভাগ হালাল হবে।
  2. পদ্ধতি ২ (পণ্যের মূল্যের সাথে অ্যাডজাস্ট করা): অনলাইন অর্ডারের বিকাশ/নগদ গ্রহণের সার্বিক ঝামেলার কথা বিবেচনা করে পণ্যের বিক্রয়মূল্যের সাথেই ৫/১০/২০ টাকা যুক্ত করে পণ্যের মোট দাম হাঁকানো।

  3. পদ্ধতি ৩ (প্রকৃত খরচই নেওয়া): যদি "ক্যাশ আউট খরচ"-ই বলতে চান, তবে বিকাশ ও নগদের অ্যাপ বা এজেন্টের প্রকৃত চার্জ (যেমন ১৫ বা ১৮.৫০ টাকা)-ই ধরবেন এবং ক্যাশ আউট না করলে বা কম খরচ হলে বাকি টাকা কাস্টমারের মূল বিল থেকে বাদ (অ্যাডজাস্ট) করে দেবেন। (তবে ব্যবসায়িক দিক থেকে এটি জটিল, তাই পদ্ধতি-১ ই সবচেয়ে উত্তম)।


সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৯০–২৯৩ (অধ্যায়: ক্রয়-বিক্রয়, 'দরদাম ও চুক্তি চূড়ান্তকরণের ফিকহী মূলনীতি'); এবং পৃষ্ঠা: ৪৩৪–৪৩৫ (অধ্যায়: মোবাইল সার্ভিস, 'স্ক্র্যাচ কার্ড, সার্ভিস সুবিধা ও ফিসের শরঈ বিধান')।
  • দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৭৫–২৭৬, ২৮৭ এবং ২৯০ (অধ্যায়: 'ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, অনলাইন ট্রানজেকশন, সার্ভিস চার্জ ও এজেন্সির ফিস')।
  • বুহুস ফি কাযায়া ফিকহিয়্যাহ মুয়াসারা (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯৬, ২০১–২০৩ (অধ্যায়: 'ব্যাংকিং সার্ভিস চার্জ, প্রশাসনিক খরচ ও ইজারা/জা'আলাহ-এর ফিকহী মানদণ্ড')।
  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮২–৮৩; এবং ৪থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৯২–৩৯৩ (অধ্যায়: কিতাবুল বুয়ূ' — 'ক্রয়-বিক্রয়ে মূল্য নির্ধারণ, উভয়ের সম্মতি ও স্পষ্টতার বিবরণ')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৬তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫১–১৫৩ ও ১৬৬–১৬৭ (অধ্যায়: কিতাবুল বুয়ূ' — 'নগদ ও বাকিতে দরদাম নির্ধারণ এবং পণ্যের সার্ভিস ফিস')।

ব্যবসায়িক লেনদেনে সততা ও স্পষ্টতা থাকলে আল্লাহ তাআলা কারবারে অশেষ বারাকাহ দান করেন।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.