ওয়াসওয়াসা বা বাজে কল্পনা দ্বারা কি হুরমত সাব্যস্ত হয়? তালাক পতিত হয় কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7459
Questioner: Suraia Shova
Question Asked: 27 Oct 2026, 09:52 PM
Reviewed & Published: 28 Oct 2026, 02:35 AM
Views: 5
Tokens: 5,141
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

শুধুমাত্র ওয়াসওয়াসা বা মাহরাম পুরুষকে নিয়ে বাজে চিন্তা বা কল্পনা এলেই কী হুরমতে সাব্যস্ত হয়?
এই বিষয়ে জানার পর থেকেই ভাই- শ্বশুড় এবং অন্যান্য মাহরামদের নিয়ে বেশি ওয়াসওয়াসা আসে তারা সামনে এলে বা দূরে থেকেই।
বাজে বাজে কল্পনা চলে আসে হুট করে। (অন্তর থেকে কোনোরূপ এসবের নিয়ত থাকেনা)

এটা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য করণীয় কী?
তালাক নিয়ে খুব ভয় এবং শংকায় থাকি।
সন্দেহ কাজ করে বেশি।।

Answer

ওয়াসওয়াসা বা বাজে কল্পনা দ্বারা হুরমত সাব্যস্ত হয় না — বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা ও করণীয়

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

আপনার মনে আসা ভয়, শঙ্কা ও মানসিক অস্থিরতা অত্যন্ত অনুধাবনযোগ্য। প্রথমেই আপনাকে সম্পূর্ণ আশ্বস্ত করে বলা হচ্ছে—আপনার বিবাহ ও দাম্পত্য সম্পর্ক শতভাগ নিরাপদ ও বহাল রয়েছে। এ নিয়ে তালাক হওয়া বা বিবাহ ভেঙে যাওয়ার বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ নেই।

আপনার উত্থাপিত প্রতিটি প্রশ্নের হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য কিতাব থেকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ বিস্তারিত শরঈ সমাধান নিচে প্রদান করা হলো:


১. শুধুমাত্র ওয়াসওয়াসা, বাজে চিন্তা বা কল্পনায় হুরমতে মুসাহারা সাব্যস্ত হয় কি?

উত্তর: না, কখনোই নয়। কেবল মনে বাজে চিন্তা আসা, মাথায় অশুভ কল্পনা ভেসে ওঠা বা শয়তানী ওয়াসওয়াসা (Waswasa) আসার কারণে কখনোই হুরমতে মুসাহারা সাব্যস্ত হয় না।

শরঈ কারণ ও ফিকহী বিশ্লেষণ: ইসলামী ফিকহের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হুরমতে মুসাহারা সাব্যস্ত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট শারীরিক মাধ্যম বা ক্রিয়া (যেমন: শাহওয়াত বা কামভাব সহকারে শারীরিক স্পর্শ, বা শাহওয়াত সহকারে সতর/লজ্জাস্থানের ভেতরের অংশ দেখা, কিংবা সহবাস) শর্ত।

কেবল অন্তরে খেয়াল আসা, অবচেতন মনে বাজে কল্পনা ভেসে ওঠা বা অনিচ্ছাকৃত চিন্তার কারণে হুরমতে মুসাহারা সাব্যস্ত হওয়া তো দূরের কথা, এতে কোনো গুনাহও লেখা হয় না।

  • সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
    • দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৪৪–১৪৭ (অধ্যায়: 'হুরমতে মুসাহারাত: কিছু জটিলতা ও সমাধান — স্পর্শ ও দৃষ্টি ব্যতীত কেবল মনস্তাত্ত্বিক চিন্তায় হুরমাত সাব্যস্ত না হওয়ার ফিকহী বিবরণ')।
    • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৭৪–২৭৫; এবং ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮ (কিতাবুন নিকাহ, ৩য় পরিচ্ছেদ: 'মুহাররামাত ও হুরমতে মুসাহারা')।
    • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২০তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৩–৮৫ ও ৯০ (অধ্যায়: 'মানসিক ওয়াসওয়াসা, অশুভ চিন্তা ও হুরমতে মুসাহারা সংক্রান্ত বিভ্রান্তি নিরসন')।

২. অনিচ্ছাকৃত কুচিন্তা ও হাদিস শরীফের শরঈ ছাড়:

রসূলুল্লাহ ﷺ স্পষ্ট ইরশাদ করেছেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের অন্তরে জেগে ওঠা অশুভ চিন্তা ও ভাবনাসমূহকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা বাস্তবে রূপ দেয় কিংবা মুখে উচ্চারণ করে।" (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।

যেহেতু আপনার মন থেকে এসবের কোনো ইচ্ছা বা নিয়ত থাকে না, বরং হুট করে ভেসে ওঠে এবং আপনি এতে লজ্জিত ও চিন্তিত হন—এটাই প্রমাণ করে যে আপনার ঈমান ঠিক আছে এবং এগুলো সম্পূর্ণ শয়তানের পক্ষ থেকে আসা ওয়াসওয়াসা (মনস্তাত্ত্বিক চক্রান্ত)।

  • সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
    • কাওয়াইদুল ফিক্বহ: পৃষ্ঠা: ১৮০–১৮১ (ফিকহী কায়দা: 'الحرمة الموهومة أو المشكوكة فيها' — নিছক সংশয়, কুচিন্তা ও শয়তানী ওয়াসওয়াসার ওপর শরঈ হুকুম বা হারাম সাব্যস্ত না হওয়া)।
    • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭০ (অধ্যায়: 'তাজদীদে নিকাহ — ওয়াসওয়াসা ও অযথা সন্দেহের কারণে বিবাহ না ভাঙার ফতোয়া')।

৩. তালাকের ভয় ও সন্দেহ থেকে মুক্ত থাকার শরঈ সমাধান:

শয়তানের অন্যতম প্রধান কাজ হলো দ্বীনদার মুসলিমদের অন্তরে পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন নিয়ে ভীতি, সন্দেহ ও মানসিক যাতনা তৈরি করা। যখন সে দেখে যে আপনি তালাক ও হুরমাতের মাসআলা নিয়ে ভীত থাকেন, তখন সে এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আপনার মনে মাহরামদের নিয়ে আরও বেশি ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে।

মনে রাখবেন: ১. কোনো স্পর্শ বা কাজ ছাড়া কেবল চিন্তার কারণে কখনোই তালাক হয় না। ২. সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে শরী'আতে কোনো বিধান পরিবর্তিত হয় না।


৪. এই ওয়াসওয়াসা থেকে আত্মরক্ষার সুনির্দিষ্ট পথ ও করণীয়:

১. সম্পূর্ণ উপেক্ষা বা অবহেলা করা (التجاهل): ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো এটিকে পুরোপুরি আমল না দেওয়া। যখনই মাথায় বাজে চিন্তা আসবে, তখন মনে মনে ভাববেন—"এটি শয়তানের চক্রান্ত, এর কোনো মূল্য আমার কাছে নেই। আমার ঈমান ও সংসার সম্পূর্ণ ঠিক আছে।" কোনোভাবেই চিন্তাটি নিয়ে কৌতূহল দেখাবেন না বা বিশ্লেষণ করতে যাবেন না।

২. তাআউউজ পাঠ করা: চিন্তা আসা মাত্রই মুখে বলুন:

"أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ" (আ'ঊজু বিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম) এবং বাম দিকে হালকা থুথু ফেলার ইঙ্গিত করুন।

৩. মাসনূন যিকির ও ফুঁ দেওয়া: প্রতিদিন সকালে ও রাতে ঘুমের আগে ৩ বার সূরা ইখলাস, ৩ বার সূরা ফালাক ও ৩ বার সূরা নাস পাঠ করে নিজের হাতে ফুঁ দিয়ে শরীর মুছে নিন। এছাড়া বেশি বেশি "আস্তাগফিরুল্লাহ" এবং "লা-হাউলা ওয়া লা-কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" পাঠ করুন।

৪. মাহরামদের সামনে স্বাভাবিক থাকা: ভাই বা শ্বশুর সামনে এলে অপরাধবোধে ভুগবেন না বা দূরে সরে যাবেন না। নিজেকে অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত রাখুন।

আল্লাহ তা'আলা আপনাকে শয়তানের যাবতীয় ওয়াসওয়াসা ও মানসিক উৎকণ্ঠা থেকে পূর্ণ হিফাযত ও প্রশান্তি দান করুন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.