এড ভিডিওতে কার্টুন ক্যারেক্টার রাখা যাবে কি না ? ছবি আঁকার হুকুম, চোখ-মুখ বাদ দিলে হুকুম বদলাবে কি না, এবং ব্যবসায়িক প্রচারে নিরাপদ বিকল্প কী ?

Business and Job · Hanafi

Question No: 7453
Questioner: Mahmud Hasan
Question Asked: 27 Oct 2026, 08:37 PM
Reviewed & Published: 27 Oct 2026, 08:47 PM
Views: 41
Tokens: 6,905
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। একটি মাসআলা জানতে চাই।
আমার একটি আতরের অনলাইন ব্যবসা আছে। ফেসবুকে প্রচারের জন্য ছোট অ্যানিমেটেড ভিডিও বানাচ্ছি। ভিডিওতে একটি কার্টুন চরিত্র আছে, যা কম্পিউটারে আঁকা।

চরিত্রটির বিবরণ:
- পুরো শরীর আঁকা: মাথা, শরীর, হাত। পা বা কোমরের নীচ নেই।
- মুখে চোখ, ভ্রু, নাক ও মুখ আছে। কথার সাথে ঠোঁট নড়ে, চোখের পলক পড়ে।
- আঁকাটা সরল রেখার কার্টুন, বাস্তব মানুষের মতো নিখুঁত ছবি নয়।
- চেহারাটা আমার নিজের আদলে আঁকা: টুপি, চশমা, দাড়ি।
- চরিত্রটি দর্শকদের আতর আর আমাদের ওয়েবসাইটের কুইজ সম্পর্কে বুঝিয়ে বলে।
- কণ্ঠ আমার নিজের রেকর্ড করা।

আমার প্রশ্ন:
১. চোখ-মুখসহ এ ধরনের কার্টুন চরিত্র আঁকা এবং ব্যবসার প্রচারে ব্যবহার করা কি জায়েজ?
২. মুখের অংশ (চোখ, নাক, মুখ) বাদ দিয়ে শুধু মাথার আকৃতি, টুপি, চশমা ও দাড়ি রাখলে কি হুকুম বদলাবে?
৩. যদি দুটোর কোনোটিই জায়েজ না হয়, তাহলে প্রচারের ভিডিওতে কোন ধরনের ছবি বা উপস্থাপন ব্যবহার করা নিরাপদ?

দলিলসহ জানালে উপকৃত হব। জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর: প্রশ্নে বর্ণিত পূর্ণাঙ্গ (চোখ-মুখসহ) কার্টুন চরিত্র আঁকা ও ব্যবসায়িক প্রচারে ব্যবহার করা হানাফি মাযহাব অনুযায়ী জায়েয নয়; বরং এটি নিষিদ্ধ (হারাম) ছবি আঁকার অন্তর্ভুক্ত। আর চোখ-নাক-মুখ বাদ দিয়ে শুধু মাথার আকৃতি, টুপি, চশমা ও দাড়ি রাখলে—যদি তা এমন অস্পষ্ট/অসম্পূর্ণ আকৃতি হয় যা দেখে জীবন্ত প্রাণীর ছবি বলা যায় না—তাহলে হুকুম বদলে যাবে এবং তা জায়েয হবে। আর তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়: প্রচারের ভিডিওতে জীবন্ত প্রাণীর ছবি/কার্টুন পরিহার করে শুধু আতরের বোতল, ফুল, গাছপালা, প্রকৃতি, স্থাপনা, ক্যালিগ্রাফি, লেখা, গ্রাফিক্স ইত্যাদি ব্যবহার করা নিরাপদ।


১ম প্রশ্ন: চোখ-মুখসহ কার্টুন চরিত্র আঁকা ও ব্যবসায়িক প্রচারে ব্যবহার

হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য অভিমত হলো—জীবন্ত প্রাণীর (মানুষ, পশু-পাখি) পূর্ণাঙ্গ বা এমন ছবি আঁকা, যাতে প্রাণীর মুখ/চেহারা স্পষ্ট থাকে, তা নিষিদ্ধ। এতে মুখের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকা-না থাকা মূল বিষয় নয়; বরং মুখ/চেহারা স্পষ্ট থাকাই নিষেধের কারণ। কেননা হাদিসে এসেছে:

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ» — সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৫০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১০৯

অর্থ: “কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে তারা, যারা ছবি তৈরি করে।”

আরেক হাদিসে:

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الَّذِينَ يُضَاهُونَ بِخَلْقِ اللَّهِ» — সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৫৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১০৭

অর্থ: “কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে তারা, যারা আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণ করে।”

হানাফি ফিকহের দলিল:

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর অভিমত: ছায়া/আকৃতির (যার ছায়া নেই এমন আঁকা ছবি) ক্ষেত্রেও যদি তা জীবন্ত প্রাণীর আকৃতি হয় এবং মুখ স্পষ্ট থাকে, তবে তা নিষিদ্ধ। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫৫৮; ফাতাওয়া আলমগিরি, ৫/৩৫৭)
  • ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেছেন: «وَالْمَنْعُ فِي صُورَةِ الْحَيَوَانِ الَّتِي لَهَا رَأْسٌ»—অর্থাৎ নিষেধ সেই প্রাণীর ছবিতে, যার মাথা আছে। (রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫৫৮)
  • ফাতাওয়া উসমানি (১/৪৯৫-৪৯৬) ও ইমদাদুল ফাতাওয়ায় (৪/৩৩০) স্পষ্ট করা হয়েছে: আধুনিক ছাপা/ডিজিটাল ছবি ও কার্টুন, যাতে জীবন্ত প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ বা মুখসহ আকৃতি থাকে, তা নিষিদ্ধ ছবির অন্তর্ভুক্ত।

আপনার কার্টুন সম্পর্কে: চরিত্রটিতে মাথা, শরীর, হাত, চোখ, ভ্রু, নাক, মুখ—সবই আছে; কথার সাথে ঠোঁট নড়ে, চোখের পলক পড়ে। এটি জীবন্ত প্রাণীর অনুকরণ; তাই আঁকা ও ব্যবসায়িক প্রচারে ব্যবহার—উভয়ই জায়েয নয়। ব্যবসায়িক প্রচারে ব্যবহারের কারণে এটি আরও গুরুতর, কারণ এতে নিষিদ্ধ কাজের প্রচার ও সহযোগিতা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ — সূরা মায়িদা: ২

অর্থ: “পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।”

তবে আপনার নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করা অডিও, লেখা, কুইজের বর্ণনা ইত্যাদি ব্যবহারে সমস্যা নেই; সমস্যা শুধু জীবন্ত প্রাণীর ছবি/কার্টুনে।


২য় প্রশ্ন: চোখ-নাক-মুখ বাদ দিয়ে শুধু মাথার আকৃতি, টুপি, চশমা ও দাড়ি রাখলে

হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো: যদি আকৃতিটি এমন অস্পষ্ট/অসম্পূর্ণ হয় যে দেখে জীবন্ত প্রাণীর ছবি বলা যায় না, তবে তা নিষিদ্ধ ছবির অন্তর্ভুক্ত নয়। ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন:

«وَالْمَنْعُ فِي صُورَةِ الْحَيَوَانِ الَّتِي لَهَا رَأْسٌ، فَأَمَّا مَا لَا رَأْسَ لَهُ مِنْ صُورَةِ الْحَيَوَانِ فَلَيْسَ بِمَنْعٍ» — রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫৫৮

অর্থ: “নিষেধ সেই প্রাণীর ছবিতে, যার মাথা আছে; আর যার মাথা নেই, তা নিষিদ্ধ নয়।”

আরেক জায়গায়:

«وَلَوْ كَانَتْ الصُّورَةُ مَقْطُوعَةَ الرَّأْسِ لَا يُكْرَهُ» — রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫৫৯

অর্থ: “যদি ছবির মাথা কাটা থাকে, তবে মাকরুহ হবে না।”

তবে সতর্কতা: শুধু চোখ-নাক-মুখ মুছে ফেললেই যথেষ্ট নয়; বরং আকৃতিটি এমন হতে হবে যা সাধারণ দৃষ্টিতে জীবন্ত প্রাণীর ছবি বলে প্রতীয়মান না হয়। যদি টুপি, চশমা, দাড়িসহ মাথার আকৃতি এমনভাবে থাকে যে তা দেখে মানুষ/মুখ বলে মনে হয়, তবে সেটিও নিষেধের আওতায় আসতে পারে। আর যদি তা সম্পূর্ণ অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ বা প্রতীকী (যেমন শুধু টুপি ও চশমার রূপরেখা, মুখ/চেহারা ছাড়া) হয়, তবে জায়েয হবে। ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়ায় এ মূলনীতি সমর্থিত। (ফাতাওয়া উসমানি, ১/৪৯৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৩০)


৩য় প্রশ্ন: নিরাপদ বিকল্প

প্রচারের ভিডিওতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো ব্যবহার করা নিরাপদ ও দ্বীনি দৃষ্টিতে সমস্যামুক্ত:

  1. আতরের বোতল, প্যাকেজিং, লোগো—পণ্যের নিজস্ব ছবি।
  2. প্রকৃতি ও নিসর্গ: ফুল, গাছপালা, বাগান, পাহাড়, নদী, আকাশ, চাঁদ-তারা ইত্যাদি।
  3. স্থাপনা ও বস্তু: মসজিদের গম্বুজ/মিনার (জীবন্ত প্রাণীর ছবি ছাড়া), দোকান, ঘর, বই, কলম, কাগজ, ক্যালিগ্রাফি।
  4. লেখা ও গ্রাফিক্স: আরবি/বাংলা ক্যালিগ্রাফি, টেক্সট অ্যানিমেশন, আইকন (জীবন্ত প্রাণীর আকৃতি ছাড়া), রঙিন ব্যাকগ্রাউন্ড।
  5. আপনার নিজের কণ্ঠ: অডিও বর্ণনা, কুইজের প্রশ্ন-উত্তর, আতরের গুণাগুণ বর্ণনা।
  6. হাতের লেখা/স্ক্রিন রেকর্ডিং: পণ্য দেখানো, ব্যবহারের পদ্ধতি (জীবন্ত প্রাণীর ছবি ছাড়া)।
  7. সাধারণ প্রতীক: তারকা, চাঁদ, ফুল, পাতা, জ্যামিতিক নকশা ইত্যাদি।

বিশেষভাবে: যদি চেহারা/মুখ সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে শুধু টুপি, চশমা ও দাড়ির প্রতীকী রূপরেখা রাখতে চান, তবে তা এমন অস্পষ্ট হতে হবে যেন কেউ তাকে জীবন্ত প্রাণীর ছবি না বলে। তবে সবচেয়ে নিরাপদ ও দ্বীনি দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় হলো—জীবন্ত প্রাণীর কোনো আকৃতিই না রাখা; শুধু পণ্য, প্রকৃতি, লেখা ও আপনার কণ্ঠ ব্যবহার করা।


উপসংহার:

  • চোখ-মুখসহ পূর্ণাঙ্গ কার্টুন চরিত্র আঁকা ও ব্যবসায়িক প্রচারে ব্যবহার—জায়েয নয়।
  • চোখ-নাক-মুখ বাদ দিয়ে যদি আকৃতি এমন অস্পষ্ট/অসম্পূর্ণ হয় যে জীবন্ত প্রাণীর ছবি বলা যায় না—জায়েয; নইলে নয়।
  • নিরাপদ বিকল্প: পণ্যের ছবি, প্রকৃতি, স্থাপনা, ক্যালিগ্রাফি, লেখা, গ্রাফিক্স ও নিজের কণ্ঠ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জন ও তাঁর সন্তুষ্টিমতো আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.