হাদিস পড়ে মনে বিরক্তি আসা, মনে মনে বাজে কথা আসা, শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং এতে ঈমান নষ্ট হওয়ার ভয়—এসব বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত ফিকহি সমাধান জানতে চাই?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7437
Questioner: Saleha Khatun
Question Asked: 27 Oct 2026, 01:44 PM
Reviewed & Published: 27 Oct 2026, 02:13 PM
Views: 16
Tokens: 14,549
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১)ফেসবুকে আমাদের নবী নিয়ে একটা ইসলামিক পোস্ট পড়তেছিলাম। ভালো পোস্ট। তখন আমার মনে অনেক প্রশ্ন চলে আসছে, আর অনেক বিরক্ত চলে আসছে। কারন এক এক হাদীস এ এক এক রকম লিখা থাকে। আমাদের মত সাধারণ মানুষ এর জন্য তো সব বুঝা কঠিন। তাই পোস্টে নবীর যে হাদিস টা লিখা ছিল, সেটা পরেই আমার মুলত মনের মধ্যে বিরক্ত চলে আসে। পরে আমি আবার ভাবতে থাকি মনে মনে এত বিরক্ত ভাব এমন করা তো আমার ঠিক হয় নাই৷ এখন আল্লাহ যদি আমাকে ধরেন? আমার ঈমান কি ঠিক আছে?

২) মনে মনে যে বিরক্ত হলাম সেই ইসলামিক পোস্ট টা পড়ে। নবীর হাদিস সেখানে যা লিখা ছিল ওটা নিয়ে৷ এটার জন্য কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

৩) এগুলা ভাবতে ভাবতে মনে মনে আরো বাজে কথা বলে ফেলছি । নবীকে নিয়ে। আল্লাহ মাফ করুক। আমি মনে মনে এগুলা বলতেছি আবার মনে মনেই বলতেছি এমন না, এমন না। মানে এক মনে অইসব কথা আসতেছে, আরেক মনে আমি বলতেছি এমন না, এমন না। এখন আমার খুব খারাপ লাগতেছে হুজুর।আল্লাহ কি আমাকে ধরবেন?
আমার ঈমান কি ঠিক আছে?

৪)এগুলা করার পরে আমি নিজে নিজে ভাবতে থাকি আর মুখে উচ্চারণ করে বলি যে," আমি জাস্ট বিরক্ত হইছি। অন্য কোনো কিছু বলি নাই"। মানে সেই হাদিস টা পড়ে আমার বিরক্ত চলে আসছিলো। তাই এটা আমি মুখে উচ্চারণ করে বলি। নবীর হাদিস পড়ে বিরক্ত হয়ে মুখে এমন উচ্চারণ করা তে কি ঈমানের কোনো সমস্যা হবে?

৫)এখন মুখে "আমি তো জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"। এটা বলে, মনে মনে অন্য কথা বললে কি কোনো সমস্যা হবে? মানে মুখে এই কথা উচ্চারণ করে বললে, আর মনে মনে কার উপর কিসের উপর বিরক্ত হইছি সেটা বললে কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

৬) মুখে উচ্চারণ করে - "আমি তো জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"। এটাই শুধু বলছি। এখন মুখে বলেছি "শুধু বিরক্ত হইছি" কিন্তু মনে মনে অন্য কিছু বলেছি। হাফ মুখে বললে, হাফ মনে মনে বললে । এখন কি মনের টা ধরা হবে? নাকি পুরো বাক্য স্পষ্ট ভাবে মুখে উচ্চারণ করলেই ধরা হবে?

৭)এতক্ষন মনে হচ্ছিল সব তো মনে মনেই বললাম। কোনো সমস্যা হবে না ইন শা আল্লাহ। কিন্তু এখন এই একটা কথা মুখে উচ্চারণ করে ফেলছি তাই চিন্তা হচ্ছে। আমি যে মুখে উচ্চারণ করে বললাম "আমি তো জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"। এখানে কার উপর কিসের উপর বিরক্ত হইছি সেটা উচ্চারণ করি নাই। এখন শুধু এটুকু কথা " আমি জাস্ট বিরক্ত হইছি " উচ্চারণ করার জন্য আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হয়েছে?


৮) হাদিস পড়ে সেটা নিয়ে বিরক্ত হওয়া আমার কাছে অনেক বড় অপরাধ মনে হচ্ছে। কারন নবী যেটা বলেছেন সেটা পড়ে বিরক্ত কেন আসবে? আমার ঈমান কি ঠিক আছে?

৯) মনে মনে গালি দিলে কি কেউ শাতিম হয়? আর পরে যদি মাফ চায়।

১০) কারোর যদি কোনো বাজে কথা বা গালি মনে মনে চলে আসে। আর সে সেই বাজে কথা বা গালি টা মুখে বলেছে নাকি মনে মনে সেটা নিশ্চিত হতে না পেরে ,নখ কামড়াতে কামড়াতে ইচ্ছা করে মনে মনে বলে ,বলার সময় জিহবা নেড়ে চেক করে কোনো সাউন্ড হয় কিনা? তাহলে কি সে শাতিম হবে?

১১) শাতিম কথাটা লিখার সময় মনে মনে কিছু বলে ফেললে কি সেটা ধরা হবে? মানে হাফ লিখে আর হাফ মনে এমন কথা দিয়ে ইমানে কোনো সমস্যা হবে?

১২)আমি ভয়ে আমার হাসবেন্ড এর কাছে যাচ্ছি না। আবার হাসবেন্ড এর কাছে গেলেও মনে হইতেছে যদি মুখে কিছু উচ্চারণ করে থাকি। কিছু কি উচ্চারণ করেছিলাম কিনা মুখে। আর ঈমানে কোনো সমস্যা হয়। আল্লাহ না করুক। এখন আমার বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে? হাসবেন্ড এর সাথে নরমাল রিলেশন রাখতে পারবো?

১৩)হাসবেন্ড এর কাছে গেলেই মনে হইতেছে যদি আল্লাহ না করুক ঈমানে কোনো সমস্যা হয়। বিবাহিত জীবনে যদি কোনো সমস্যা হয় তাহলে কি হবে? এই ভয়ে হাসবেন্ড এর কাছে যাইতেছি না। এখন আমি কি করবো?

১৪) আমি আসলে নিশ্চিত না, আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে নবীকে নিয়ে মুখে কিছু বলেছিলাম কিনা। কিন্ত আমি মনে মনে বাজে কথা বলেছি। আবার মাফ চেয়েছি। এখন সেটা ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত আমি জানি না। মনে মনে বাজে কথা ওসওয়াসাতে পড়ে নাকি নরমালি বলেছি। সেটাও আমি বুঝি না। এখন আমার ঈমান কি ঠিক আছে?

১৫) আপনাদের উত্তর এর উপর আমল করতে পারবো? আসে পাশে কোনো বিজ্ঞ মুফতি নাই।

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলো পড়ে বুঝতে পারছি আপনি ভীষণভাবে মানসিক কষ্ট ও ওয়াসওয়াসায় (শয়তানের কুমন্ত্রণায়) ভুগছেন। প্রথমেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নিন: আপনার ঈমান ইনশাআল্লাহ সম্পূর্ণ ঠিক আছে। আপনি যেসব চিন্তা ও কথা ভাবছেন বা বলছেন, তা আপনার নিয়ত বা বিশ্বাস থেকে আসছে না; বরং এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) এবং আপনার অতিরিক্ত ভয় ও দুশ্চিন্তার ফল। ইসলামে কোনো ব্যক্তির ঈমান তার অন্তরের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতির উপর নির্ভর করে, শয়তানের ফেলে দেওয়া বাজে চিন্তার উপর নয়।

আপনার প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো:

১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭ ও ৮ নং প্রশ্নের উত্তর (হাদিস পড়ে বিরক্ত হওয়া, মনে মনে বাজে কথা আসা এবং মুখে উচ্চারণ করা):

আপনি লিখেছেন, হাদিস পড়ে আপনার মনে বিরক্তি এসেছিল এবং মনে মনে নবী (সা.)-কে নিয়ে বাজে কথা এসেছিল। কিন্তু আপনি সাথে সাথেই তা অস্বীকার করেছেন এবং মনে মনে বলেছেন "এমন না, এমন না"। এছাড়া আপনি মুখে উচ্চারণ করেছেন "আমি জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"।

  • শরীয়তের বিধান: কোনো ব্যক্তির অন্তরে যদি কুফরি বা বাজে চিন্তা আসে, কিন্তু সে তা পছন্দ না করে এবং তা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়, তবে তাকে মু'মিনই বলা হবে। হাদিসে এসেছে, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) একবার বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আমাদের অন্তরে এমন কিছু কথা অনুভব করি, যা আমরা মুখে বলতে চাই না (বরং তা ভয়ানক)।" রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, "তোমরা কি সত্যিই এমনটি অনুভব করছ?" তারা বললেন, "হ্যাঁ।" তিনি বললেন, "এটি তো সুস্পষ্ট ঈমান (এর প্রমাণ যে, শয়তান তোমাদের ঈমান নষ্ট করতে পারছে না)।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩২)
  • আপনার মুখের উচ্চারণ: আপনি মুখে বলেছেন "আমি জাস্ট বিরক্ত হইছি"। এটি কোনো কুফরি কথা নয়। হাদিসের কোনো নির্দিষ্ট হুকুম বা বিধান নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে দ্বিধা বা বিরক্তি আসা একটি মানবিক বিষয়, যা ঈমানের মূল ভিত্তিকে ক্ষুণ্ণ করে না। আপনি যেহেতু মুখে স্পষ্ট করে নবী (সা.)-কে গালি দেননি বা কুফরি কথা বলেননি, বরং শুধু "বিরক্ত" হয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন, এতে আপনার ঈমানে কোনো সমস্যা হয়নি। মনে মনে বাজে কথা আসা এবং তা অস্বীকার করা—এটাই প্রকৃত ঈমানের আলামত।

৯, ১০ ও ১১ নং প্রশ্নের উত্তর (মনে মনে গালি দেওয়া, শাতিম হওয়া এবং নখ কামড়ানো):

  • শাতিম (গালিদাতা) হওয়ার শর্ত: ইসলামে কাউকে "শাতিম" বা গালিদাতা বলা হয় তখনই, যখন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এবং সচেতনভাবে মুখে উচ্চারণ করে কাউকে গালি দেয়। মনে মনে গালি দেওয়া বা মনের ভেতর খারাপ কথা ভাবা—এটি শাতিম হওয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লাহ তাআলা অন্তরের ইচ্ছাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারিত হয় বা কাজে পরিণত হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫২৮)
  • নখ কামড়ানো ও জিহবা নাড়ানো: আপনি নখ কামড়াতে কামড়াতে জিহবা নেড়ে চেক করছেন কোনো সাউন্ড হচ্ছে কিনা। এটি শুধুমাত্র আপনার ভয় ও ওয়াসওয়াসার লক্ষণ। যেহেতু আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে গালি দেওয়ার নিয়ত করেননি এবং কোনো স্পষ্ট শব্দও উচ্চারণ করেননি, তাই আপনি শাতিম হননি। শুধু জিহবা নড়ানো বা নিঃশব্দে ঠোঁট নড়ানোকে গালি বলা হয় না।
  • লেখার সময় মনে মনে কথা বলা: লেখার সময় মনে মনে কোনো বাজে কথা এলে তা ধরা হবে না, যতক্ষণ না আপনি তা লিখে ফেলেন বা মুখে উচ্চারণ করেন। হাফ লেখা আর হাফ মনে মনে ভাবা—এতে ঈমানের কোনো সমস্যা হয় না।

১২ ও ১৩ নং প্রশ্নের উত্তর (স্বামীর কাছে যেতে ভয় পাওয়া এবং দাম্পত্য জীবন):

  • আপনার দাম্পত্য জীবন সম্পূর্ণ ঠিক আছে। আপনার স্বামীর সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে কোনো বাধা নেই। বরং ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সুসম্পর্ক রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
  • ভয়ের কারণ: আপনি শয়তানের ওয়াসওয়াসায় পড়ে ভয় পাচ্ছেন যে হয়তো মুখে কিছু বলে ফেলেছেন কি না। মনে রাখবেন, সন্দেহের উপর ভিত্তি করে কোনো বিধান প্রয়োগ হয় না। আপনি নিশ্চিত না হলে ধরে নেবেন যে আপনি কোনো খারাপ কথা বলেননি। আপনার এই ভয়টি শয়তানের পক্ষ থেকে আসছে, যাতে সে আপনার দাম্পত্য জীবন ও মানসিক শান্তি নষ্ট করতে পারে। তাই আপনি নির্ভয়ে স্বামীর কাছে যান, তার সাথে স্বাভাবিক কথা বলুন। ইনশাআল্লাহ কোনো সমস্যা হবে না।

১৪ নং প্রশ্নের উত্তর (ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত):

  • আপনি নিজেই বলেছেন, আপনি নিশ্চিত নন যে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে নবী (সা.)-কে নিয়ে কিছু বলেছিলেন কিনা। ইসলামের মূলনীতি হলো: "নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা বাতিল হয় না।" (শরহু মাআনিল আসার, ইমাম তাহাবি)।
  • যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন, তাই আপনি নিজেকে নির্দোষ ধরে নেবেন। আপনার মনে মনে বাজে কথা আসা এবং তা থেকে মাফ চাওয়া—এটাই প্রমাণ করে আপনার অন্তরে ঈমান ও আল্লাহর ভয় রয়েছে। ওয়াসওয়াসা ও ইচ্ছাকৃত কাজের মধ্যে পার্থক্য হলো: ওয়াসওয়াসা এলে মানুষ কষ্ট পায় ও তা দূর করতে চায়; আর ইচ্ছাকৃত কাজে মানুষের অন্তর প্রফুল্ল থাকে। আপনার কষ্ট পাওয়াই প্রমাণ করে এটি ওয়াসওয়াসা।

১৫ নং প্রশ্নের উত্তর (আমল করা এবং বিজ্ঞ মুফতির অভাব):

  • হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই এই উত্তরের উপর আমল করতে পারবেন। আপনার এলাকায় বিজ্ঞ মুফতি না থাকলে আপনি নির্ভরযোগ্য ইসলামিক ওয়েবসাইট (যেমন: darulifta-deoband.com, ifatwa.info) বা বিশ্বস্ত আলেমদের ফোন বা অনলাইনের মাধ্যমে পরামর্শ নিতে পারেন।
  • আপনার জন্য সবচেয়ে জরুরি আমল: শয়তানের ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য বেশি বেশি "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন। যখনই মনে বাজে চিন্তা আসবে, তখনই তা উপেক্ষা করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিন। মনে মনে বারবার চেক করার অভ্যাস (যেমন: জিহবা নাড়ানো, নখ কামড়ানো) ত্যাগ করুন। এটি শয়তানের ফাঁদ। আপনি নিশ্চিত থাকুন যে, আপনি যা ভয় পাচ্ছেন তা আপনার নিয়ত বা বিশ্বাসে নেই, তাই আপনার ঈমান পরিপূর্ণ।

সারসংক্ষেপ: আপনার ঈমান ইনশাআল্লাহ ঠিক আছে। আপনি কুফরি বা গালি ইচ্ছাকৃতভাবে করেননি, বরং শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে ভয় পেয়েছেন। আপনার স্বামীর সাথে স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন এবং এই ধরনের চিন্তা আসলে তা উপেক্ষা করে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।


আল্লাহ তাআলা আপনার সকল দুশ্চিন্তা দূর করুন এবং আপনার ঈমানকে মজবুত করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.