গর্ভাবস্থায় স্ত্রীর শারীরিক অসহিষ্ণুতা
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
১. গর্ভাবস্থায় স্ত্রীর প্রতি সদাচরণের বিধান
কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — সূরা আন-নিসা: ১৯
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ "পুরুষদের উপর নারীদের যে অধিকার আছে, নারীদের উপরও পুরুষদের তেমন অধিকার আছে — ন্যায়সংগতভাবে।" — সূরা আল-বাকারা: ২২৮
ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ.) আহকামুল কুরআন-এ উল্লেখ করেন যে, "বিল-মা'রূফ" অর্থ হলো এমন সদাচরণ যা শরীয়ত ও বিবেক উভয়ই অনুমোদন করে; স্ত্রীর গর্ভকালীন দুর্বলতা এ সদাচরণের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
হাদীসের নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম; আর আমি আমার পরিবারের প্রতি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।" — সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৭৭ (হাসান)
اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا "নারীদের ব্যাপারে তোমাদেরকে সদুপদেশ দিচ্ছি (তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করো)।" — সহীহ বুখারী: ৫১৮৬; সহীহ মুসলিম: ১৪৬৮
لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ "কোনো মুমিন পুরুষ কোনো মুমিন নারীকে (সম্পূর্ণ) ঘৃণা করবে না; যদি তার কোনো স্বভাব অপছন্দ হয়, তবে অপর স্বভাবে সন্তুষ্ট হবে।" — সহীহ মুসলিম: ১৪৬৯
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
- আল-হিদায়া (কিতাবুন-নিকাহ) ও রাদ্দুল মুহতার (৩/১০১, দারুল ফিকর) — এ উল্লেখ আছে যে, স্ত্রীর ভরণপোষণ (নাফাকা) ও সদাচরণ স্বামীর উপর ওয়াজিব; গর্ভাবস্থায় এ দায়িত্ব আরও বর্ধিত হয়।
- ফাতাওয়া আলমগিরি (১/৫৬৩, কিতাবুন-নিকাহ) — এ স্পষ্ট করা হয়েছে যে, স্ত্রীর প্রতি কঠোরতা ও অবহেলা শরীয়তবিরোধী; স্বামীকে "মা'রূফ" অনুযায়ী আচরণ করতে হবে।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৯৪) — মুফতি আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন: "স্ত্রী গর্ভবতী হলে তার সেবা-যত্ন করা স্বামীর জন্য ইবাদতস্বরূপ; এ সময় তাকে কষ্ট দেওয়া আল্লাহর কাছে জবাবদিহিমূলক।"
২. স্বামীর পরিচ্ছন্নতার অবহেলা — শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি
পবিত্রতা ইসলামের অর্ধেক ঈমান
الطُّهُورُ شَطْرُ الْإِيمَانِ "পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।" — সহীহ মুসলিম: ২২৩
দৈহিক পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধি ব্যবহার
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ يُحِبُّ الطَّيِّبَ، نَظِيفٌ يُحِبُّ النَّظَافَةَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্রতা পছন্দ করেন; পরিচ্ছন্ন, তিনি পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন।" — সুনানে তিরমিজি: ২৭৯৯ (হাসান)
রাসূল ﷺ নিজে সর্বদা পরিচ্ছন্ন থাকতেন, মিসওয়াক করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং সাহাবীদেরও তা নির্দেশ দিতেন। শামায়েলে তিরমিজি-তে বর্ণিত আছে, তিনি ﷺ বলেন:
إِنَّ الْمَلَائِكَةَ تَتَأَذَّى مِمَّا يَتَأَذَّى مِنْهُ بَنُو آدَمَ "মানুষ (আদম সন্তান) যা দ্বারা কষ্ট পায়, ফেরেশতারাও তা দ্বারা কষ্ট পান।" — সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৬৫ (সহীহ)
হানাফী ফিকহের নির্দেশনা
- রাদ্দুল মুহতার (১/১৬৬, দারুল ফিকর) — ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "শরীরের দুর্গন্ধ ও অপরিচ্ছন্নতা দাম্পত্য সম্পর্কে বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে; স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য পরস্পরের প্রতি পরিচ্ছন্ন থাকা কর্তব্য।"
- বাহিশতী জেওর (বিবাহ অধ্যায়) — মুফতি আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন: "স্বামী-স্ত্রীর জন্য পরস্পরের সামনে পরিচ্ছন্ন, সুগন্ধিযুক্ত ও সুন্দর পোশাকে উপস্থিত হওয়া সুন্নত; অপরিচ্ছন্নতা দাম্পত্য ভালোবাসা নষ্ট করে।"
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৩৩৫) — মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: "স্ত্রীর প্রতি স্বামীর পরিচ্ছন্নতার অবহেলা কেবল অস্বাস্থ্যকরই নয়, বরং স্ত্রীর বৈবাহিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।"
৩. গর্ভাবস্থায় সহবাসের বিধান
কুরআনের নির্দেশনা
نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ "তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য ক্ষেত্রস্বরূপ; সুতরাং তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তাদের নিকট যাও।" — সূরা আল-বাকারা: ২২৩
তবে শর্ত হলো — "বিল-মা'রূফ" এবং ক্ষতির অনুপস্থিতি।
হাদীসের নির্দেশনা
রাসূল ﷺ বলেন:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ "ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্তও করা যাবে না।" — সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১ (সহীহ)
হানাফী ফিকহের বিধান
- রাদ্দুল মুহতার (৩/২০৪) — ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "স্ত্রী অসুস্থ হলে বা গর্ভাবস্থায় শারীরিক কষ্ট হলে স্বামীর জন্য সহবাসে জোর করা হারাম; কারণ এতে ক্ষতি (দারার) রয়েছে।"
- ফাতাওয়া আলমগিরি (৫/৩২৮) — এ উল্লেখ আছে: "স্ত্রীর শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে সহবাস ত্যাগ করা কর্তব্য।"
- মা'আরিফুল কুরআন (১/৫৫৪) — মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.) সূরা বাকারা ২২৩-এর তাফসীরে বলেন: "স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করা স্বামীর দায়িত্ব; গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ ও স্ত্রীর সম্মতি জরুরি।"
গুরুত্বপূর্ণ: গর্ভাবস্থায় সহবাস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়, তবে —
- স্ত্রীর শারীরিক সামর্থ্য ও সম্মতি আবশ্যক;
- চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞা থাকলে মানা ওয়াজিব;
- জোরপ্রয়োগ বা কষ্ট দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম।
৪. দাম্পত্য কলহ নিরসনে ইসলামী নির্দেশনা
কুরআনের নির্দেশনা
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا "যদি তোমরা তাদের (স্বামী-স্ত্রীর) মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে এক বিচারক স্বামীর পরিবার থেকে এবং এক বিচারক স্ত্রীর পরিবার থেকে নিয়োগ করো।" — সূরা আন-নিসা: ৩৫
وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً "তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।" — সূরা আর-রূম: ২১
হাদীসের নির্দেশনা
الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا "এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য দেয়ালের মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্ত করে।" — সহীহ বুখারী: ৪৮১; সহীহ মুসলিম: ২৫৮৫
مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ "যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।" — সহীহ বুখারী: ৫৯৯৭
হানাফী ফিকহ ও ফাতাওয়ার নির্দেশনা
- রাদ্দুল মুহতার (৩/১০১) — ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "স্ত্রীর সাথে কঠোরতা ও কলহ সৃষ্টি করা মাকরূহ তাহরিমি; স্বামীর জন্য ধৈর্য ও সদাচরণ আবশ্যক।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৯৫) — মুফতি থানভী (রহ.) বলেন: "দাম্পত্য কলহের মূল কারণ হলো অধিকারের অবহেলা; গর্ভবতী স্ত্রীর প্রতি অবহেলা কিয়ামতের দিন জবাবদিহির কারণ হবে।"
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৩৪০) — মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: "স্ত্রীর শারীরিক অসহিষ্ণুতা ও গর্ভাবস্থায় স্বামীর ধৈর্য ধারণ করা ইবাদত; রাগের বশে তালাক দেওয়া থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি।"
৫. ব্যবহারিক সমাধান ও করণীয়
স্বামীর জন্য:
- পরিচ্ছন্নতা: প্রতিদিন গোসল, দাঁত পরিষ্কার (মিসওয়াক/ব্রাশ), পরিষ্কার পোশাক, সুগন্ধি ব্যবহার — এগুলো সুন্নত ও স্ত্রীর অধিকার।
- সহানুভূতি: গর্ভাবস্থায় স্ত্রীর কষ্ট বোঝা ও সহযোগিতা করা।
- সহবাসে সংযম: স্ত্রীর সম্মতি ও শারীরিক সামর্থ্য ছাড়া সহবাস না করা; চিকিৎসকের পরামর্শ মানা।
- কলহ নিরসন: রাগের সময় চুপ থাকা, পরে শান্তভাবে আলোচনা; প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের মধ্যস্থতা।
- দোয়া: রাসূল ﷺ-এর সুন্নত দোয়া — "আল্লাহুম্মা আল্লিফ বাইনানা" (হে আল্লাহ, আমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি করুন)।
স্ত্রীর জন্য:
- সুন্দর আচরণ: রাসূল ﷺ বলেন, "স্ত্রী যদি স্বামীর প্রতি সদাচরণ করে, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে" (মুসলিম: ১৪৬৮-এর আলোকে)।
- অভিযোগের পরিবর্তে আলোচনা: কষ্টের কথা শান্তভাবে জানানো।
- ধৈর্য ও দোয়া: গর্ভাবস্থার কষ্টে ধৈর্য ধারণ করা সওয়াবের কাজ।
উভয়ের জন্য:
- পারিবারিক মধ্যস্থতা: সূরা নিসা ৩৫ অনুযায়ী দুই পক্ষের একজন করে প্রতিনিধি নিয়োগ।
- পারস্পরিক দোয়া ও ক্ষমা: দাম্পত্য জীবনে ক্ষমা ও সহনশীলতা অপরিহার্য।
উপসংহার
গর্ভাবস্থায় স্ত্রীর শারীরিক অসহিষ্ণুতা স্বাভাবিক; স্বামীর পরিচ্ছন্নতার অবহেলা ও কঠোরতা ইসলামে নিন্দনীয়। কুরআন-হাদীস ও হানাফী ফিকহের নির্দেশনা হলো — সদাচরণ, পরিচ্ছন্নতা, সহানুভূতি ও ধৈর্য। আল্লাহ তাআলা উভয়কে তাওফিক দান করুন এবং দাম্পত্য জীবনে মায়া-মহব্বত দান করুন। আমিন।