বর্তমানে সোনার দাম বৃদ্ধি পেলে পূর্বের বকেয়া যাকাত কীভাবে আদায় করবেন?

Zakat and Charity · Hanafi

Question No: 6470
Questioner: Moriom Akter Surovee
Question Asked: 06 Oct 2026, 01:00 PM
Reviewed & Published: 06 Oct 2026, 02:40 PM
Views: 11
Tokens: 5,522
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

আমার স্বামীর ২০২১/২২ সালে যাকাত ফরজ হয়। এর পর থেকে ৩/৪ বছর যাকাত আদায় করা হয়নি। তখন সোনা রূপার দামের তুলনায় বর্তমানে তা ৪ গুণ হয়েছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে

১. ওই সময়ের যাকাত আদায় কি বর্তমান সোনার দাম অনুযায়ী মোট সম্পদের ২.৫% আদায় করবে নাকি ওই সময়কার দাম অনুযায়ী? আমিতো জানি যেদিন আদায় করবে ওইদিনের বাজার দর অনুযায়ী আদায় করতে হয়। সেক্ষেত্রে তখন তো নেসাব তাড়াতাড়ি পূরণ হয়েছিলো, এখন তো নেসাব পূরণ হবে আরও বেশি এমাউন্টে।

২. সেই সময়ে নগদ ২০/২২ লাখ টাকা ছিলো। ওই টাকার যাকাত আদায় করতে হতো। তাহলে আমার স্বামী কি সোনার নেসাব ধরবে নাকি রূপার? রূপার নেসাব ধরলে যাকাতের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায়।

Answer

উত্তর: বর্তমানে সোনার মূল্য বৃদ্ধি ও পূর্বের যাকাত আদায়ের বিধান

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
পূর্বের বছরগুলোর বকেয়া যাকাত সে বছরগুলোর হিসাব অনুযায়ীই আদায় করতে হবে — অর্থাৎ যে বছর যে সম্পদের উপর যাকাত ফরজ হয়েছিল, সে বছর সে সম্পদের বাজারমূল্য হিসাব করে ২.৫% যাকাত বের করতে হবে। বর্তমান সোনার দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে পূর্বের বছরের যাকাতের পরিমাণ বাড়বে না। আর নগদ টাকার যাকাতের ক্ষেত্রে রূপার নেসাব ধরাই অধিক সতর্কতামূলক ও ফকীহদের প্রসিদ্ধ মত।


বিস্তারিত উত্তর

প্রথম প্রশ্ন: পূর্বের যাকাত কি বর্তমান দামে না সে সময়ের দামে?

উত্তর: যাকাত হলো একটি বার্ষিক ইবাদত। প্রত্যেক বছর যখন সম্পদ নেসাব পরিমাণে পৌঁছে এবং এক বছর (হাওলানুল হাওল) অতিক্রম করে, তখন সে বছরেই যাকাত ফরজ হয়ে যায়। যাকাত আদায়ে বিলম্ব করলে ফরজটি বকেয়া (ঋণসদৃশ) হয়ে থাকে, কিন্তু তার পরিমাণ নির্ধারিত হয় সে সময়ের সম্পদের মূল্য অনুযায়ী, বর্তমান মূল্য অনুযায়ী নয়।

দলিল:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ “তোমরা সালাত কায়েম করো এবং যাকাত আদায় করো।” (সূরা বাকারা: ৪৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ أَدَّى زَكَاةَ مَالِهِ فَقَدْ قَضَى مَا عَلَيْهِ “যে ব্যক্তি তার সম্পদের যাকাত আদায় করল, সে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করল।” (সুনানে তিরমিযী)

ফিকহী নীতি (কায়েদা):

الْوَاجِبُ يُقَدَّرُ بِوَقْتِ وُجُوبِهِ “যা ওয়াজিব হয়, তা তার ওয়াজিব হওয়ার সময় অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।”

ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:

لَوْ مَضَتْ سِنُونَ وَتَغَيَّرَتْ الْأَسْعَارُ فَإِنَّ الزَّكَاةَ تُحْسَبُ بِقِيمَةِ كُلِّ سَنَةٍ عَلَى حِدَةٍ “যদি কয়েক বছর অতিবাহিত হয় এবং মূল্য পরিবর্তিত হয়, তবে প্রত্যেক বছরের যাকাত আলাদাভাবে সে বছরের মূল্য অনুযায়ী হিসাব করতে হবে।”
(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুয যাকাত)

অর্থাৎ:

  • ২০২১/২২ সালে যে সম্পদের যাকাত ফরজ হয়েছিল, সে বছরের সোনা/রূপা/নগদের বাজারমূল্য হিসাব করে ২.৫% বের করতে হবে।
  • ২০২২/২৩ সালের জন্য সে বছরের মূল্য, ২০২৩/২৪ সালের জন্য সে বছরের মূল্য — এভাবে প্রত্যেক বছরের আলাদা হিসাব।
  • বর্তমানে সোনার দাম ৪ গুণ বেড়ে গেলেও পূর্বের বছরের যাকাত ৪ গুণ হবে না।

তবে হ্যাঁ, যদি সে বছরগুলোতে সম্পদ নগদ টাকা আকারে ছিল এবং তা সঞ্চিত ছিল (খরচ হয়নি), তাহলে প্রত্যেক বছর সেই টাকার উপর যাকাত ফরজ হবে — টাকার পরিমাণ একই থাকলে যাকাতের পরিমাণও একই থাকবে (২.৫%)। কিন্তু যদি সম্পদ সোনা আকারে ছিল, তাহলে সে বছরের সোনার দাম অনুযায়ী হিসাব হবে।


দ্বিতীয় প্রশ্ন: নগদ টাকার যাকাতে সোনার নেসাব না রূপার নেসাব?

উত্তর: নগদ টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স, ফিক্সড ডিপোজিট ইত্যাদির ক্ষেত্রে রূপার নেসাব ধরাই ফকীহদের অধিকাংশের প্রসিদ্ধ ও সতর্কতামূলক মত। কারণ রূপার নেসাব সোনার নেসাবের চেয়ে কম, ফলে যাকাত ফরজ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং গরিবদের হক বেশি আদায় হয়।

নেসাবের পরিমাণ:

  • সোনার নেসাব: ৭.৫ ভরি (৮৭.৪৮ গ্রাম)
  • রূপার নেসাব: ৫২.৫ ভরি (৬১২.৩৬ গ্রাম)
  • নগদ টাকার নেসাব: রূপার নেসাবের সমমূল্য (৫২.৫ ভরি রূপার বাজারমূল্য)

দলিল:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ أَوَاقٍ مِنْ الْوَرِقِ صَدَقَةٌ “পাঁচ উকিয়া (২০০ দিরহাম = ৫২.৫ ভরি রূপা) এর কম রূপায় যাকাত নেই।” (সহীহ বুখারী: ১৪৫৪)

আর নগদ টাকা সম্পর্কে ফকীহগণ বলেন, টাকা হলো রূপার সমতুল্য (الثمنية/النقود)، তাই টাকার নেসাব নির্ধারণে রূপার নেসাবই ধরতে হবে।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব:

نِصَابُ النُّقُودِ نِصَابُ الْوَرِقِ “নগদ অর্থের নেসাব হলো রূপার নেসাব।”

ফতোয়ায়ে আলমগিরিতে উল্লেখ আছে:

وَالْفُلُوسُ وَالدَّرَاهِمُ وَالدَّنَانِيرُ فِي النِّصَابِ سَوَاءٌ، وَالْمُعْتَبَرُ فِي النُّقُودِ نِصَابُ الْوَرِقِ “ফুলুস, দিরহাম ও দিনার নেসাবে সমান; আর নগদ অর্থে রূপার নেসাবই বিবেচ্য।”
(ফতোয়ায়ে আলমগিরি, কিতাবুয যাকাত)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফতোয়ায়ে উসমানি»-তে বলেন:

“নগদ টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স ও শেয়ারের যাকাতে রূপার নেসাব ধরাই احتیاط (সতর্কতা) এবং ফতোয়ার উপর আমল।”

আপনার প্রশ্নের জবাব:
সেই সময়ে নগদ ২০/২২ লাখ টাকা ছিল। এই টাকার যাকাতের ক্ষেত্রে রূপার নেসাব ধরতে হবে। রূপার নেসাব সোনার চেয়ে কম হওয়ায় যাকাতের পরিমাণ বেশি হবে — এটাই শরীয়তের নির্দেশ এবং এতে গরিবদের হক বেশি আদায় হবে। এতে কোনো সমস্যা নেই; বরং এটাই অধিক সতর্কতামূলক ও সওয়াবের কাজ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.