যাকাতে নিসাব কত? বিস্তারিত জানতে চাই

Zakat and Charity · Hanafi

Question No: 90
Questioner: Habiba 0299
Question Asked: 14 May 2026, 07:54 PM
Reviewed & Published: 16 May 2026, 04:00 PM
Views: 53
Tokens: 3,635
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

যাকাতের নিসাব

Answer

যাকাতের নিসাব: হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত

যাকাতের নিসাব অর্থ হলো যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সম্পদের পরিমাণ। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, কোনো মুসলিমের কাছে যদি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ (নিসাব পরিমাণ) থাকে এবং তা এক চান্দ্র বছর অতিক্রম করে, তাহলে তার ওপর যাকাত ফরজ হয়। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাবের আলোকে নিসাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


১. নিসাবের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব

যাকাত ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তাদের সম্পদ থেকে সাদকা (যাকাত) গ্রহণ করুন, যা দ্বারা আপনারা তাদের পবিত্র করেন এবং পরিচ্ছন্ন করেন।" (সূরা আত-তাওবা: ১০৩)

নিসাব নির্ধারণের মূল উদ্দেশ্য হলো ধনী ও গরিবের মধ্যে পার্থক্য করা। যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই, তার ওপর যাকাত ফরজ নয়। হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

"তোমাদের কারো কাছে যদি বিশটি (সোনার) দীনার থাকে এবং এক বছর অতিবাহিত হয়, তবে তার ওপর অর্ধ দীনার যাকাত ফরজ। আর যদি কারো কাছে দুইশত রৌপ্য দিরহাম থাকে এবং এক বছর অতিবাহিত হয়, তবে তার ওপর পাঁচ দিরহাম যাকাত ফরজ।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৭২; ইমাম আহমাদ ও আলবানী সহীহ বলেছেন)


২. হানাফী ফিকহ অনুযায়ী নিসাবের পরিমাণ

হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগীরী), আল-হিদায়াইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) অনুযায়ী নিসাবের পরিমাণ নিম্নরূপ:

ক. সোনা ও রূপার নিসাব:

| সম্পদ | নিসাবের পরিমাণ | ওজন (গ্রামে) | |---------|---------------|--------------| | সোনা | ২০ দীনার (মিসকাল) | প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম (১ মিসকাল = ৪.৩৭৪ গ্রাম) | | রূপা | ২০০ দিরহাম | প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম (১ দিরহাম = ৩.০৬১৮ গ্রাম) |

উল্লেখ্য: বর্তমানে অধিকাংশ হানাফী ফকিহ (যেমন মুফতি তাকী উসমানী ও মুফতি মুহাম্মদ শফী) রূপার নিসাবকে বেশি গুরুত্ব দেন, কারণ এটি সাধারণ মানুষের জন্য সহজ। যেহেতু বর্তমান মুদ্রার মূল্য সোনা-রূপার সাথে তুলনীয় নয়, তাই দারিদ্র্য বিচারে রূপার নিসাব (৬১২ গ্রাম) অধিক সহায়ক।

খ. নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য ও অন্যান্য সম্পদের নিসাব:

নগদ অর্থ (টাকা, ডলার, ইত্যাদি), ব্যাংক ব্যালান্স, শেয়ার, বন্ড, ব্যবসায়িক স্টক এবং স্বর্ণ-রৌপ্য ছাড়া অন্য ধাতুর তৈরি অলংকারের নিসাব নির্ধারণ করা হয় রূপার নিসাবের মূল্যের সমতুল্য। অর্থাৎ, বর্তমান বাজারে ৬১২.৩৬ গ্রাম রূপার মূল্য যদি ১০০,০০০ টাকা হয়, তাহলে কারো কাছে যদি ১০০,০০০ টাকার বেশি সম্পদ থাকে এবং বছর শেষে নিসাবের চেয়ে বেশি থাকে, তবে যাকাত ফরজ।

উল্লেখ্য: হানাফী মতে, নিসাব গণনার সময় সোনা ও রূপা একত্রিত করা হয় না। তবে নগদ অর্থের সাথে ব্যবসায়িক পণ্য ও স্টককে একত্রিত করে নিসাব পূর্ণ করা বৈধ।


৩. কুরআন ও হাদিসের দলিল

কুরআনের দলিল:

  • সূরা আত-তাওবায় যাকাতের বিধান দেওয়া হয়েছে এবং যাকাত প্রদানের আদেশ দেওয়া হয়েছে (৯:৩৪-৩৫)। এখানে নির্দিষ্ট নিসাবের উল্লেখ না থাকলেও হাদিসে তা বিস্তারিত এসেছে।

হাদিসের দলিল:

  • সোনার নিসাব: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যার কাছে বিশ দীনার আছে এবং এক বছর অতিবাহিত হয়, তার ওপর অর্ধ দীনার যাকাত ফরজ।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৫৭২; সহীহ ইবনে হিব্বান: ৩২৪৯)
  • রূপার নিসাব: "পাঁচ উকিয়া (২০০ দিরহাম) রূপা কম হলে যাকাত ফরজ নয়।" (সহীহ বুখারি: ১৪০৫, সহীহ মুসলিম: ৯৭৯)
  • গাভী, মহিষ ও উটের নিসাব: এগুলোর জন্যও নির্দিষ্ট নিসাব ও যাকাতের হার হাদিসে বর্ণিত (বুখারি: ১৪৫৮, মুসলিম: ৯৮৮)।

৪. নিসাব সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা (হানাফী ফিকহ)

ক. নিসাব পূর্ণ হওয়ার শর্ত:

  • মালিকানা পূর্ণ হতে হবে।
  • সম্পদ বর্ধনশীল হতে হবে (যেমন: টাকা, ব্যবসায়িক পণ্য, গবাদি পশু)।
  • নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস (বাড়ি, গাড়ি, পোশাক, ঘরের আসবাব) নিসাব গণনায় অন্তর্ভুক্ত নয়।
  • ঋণ থাকলে তা বাদ দিয়ে নিসাব গণনা করতে হবে।

খ. নিসাবের পরিবর্তন:

  • সোনা ও রূপার বাজারমূল্য পরিবর্তনের সাথে সাথে নগদ অর্থের নিসাব পরিবর্তিত হয়। তবে ফুকাহায়ে কেরাম রূপার নিসাবকেই স্থায়ী মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।

গ. মিশ্র সম্পদ:

  • কারো কাছে সোনা, রূপা, নগদ অর্থ ও ব্যবসায়িক পণ্য থাকলে, সব একত্রিত করে নিসাব পূর্ণ হলে যাকাত ফরজ। তবে খাঁটি সোনার নিসাব না পূর্ণ হলেও রূপার মূল্যের ভিত্তিতে নগদ অর্থের নিসাব পূর্ণ হতে পারে।

ঘ. বর্তমান মূল্য অনুযায়ী নিসাব:

  • রূপার নিসাব: ৬১২.৩৬ গ্রাম রূপা। বর্তমান বাজার মূল্য (যেমন ২০২৫ সালের মাঝামাঝি) বাংলাদেশে প্রতি গ্রাম রূপা ১৯৫-২২০ টাকা হলে নিসাব দাঁড়ায় ১,২০,০০০ – ১,৪০,০০০ টাকা (প্রায়)।
  • সোনার নিসাব: ৮৭.৪৮ গ্রাম সোনা। যা বর্তমানে ৭৫,০০০ – ৮০,০০০ টাকা প্রতি গ্রাম ধরে ৬৫ লাখ টাকার বেশি। হানাফী ফকিহগণ রূপার নিসাবকেই প্রাধান্য দেন, কারণ এটি বেশি মানুষের অন্তর্ভুক্ত করে।

সতর্কতা: নিসাবের সঠিক মূল্য জানতে মাসের শুরুতে বা যাকাত দেওয়ার সময় স্থানীয় স্বর্ণ ও রূপার বাজার মূল্য দেখে নিন। মুফতি তাকী উসমানী সাহেব রূপার নিসাবকেই অধিক সহজ ও ন্যায্য বলে মত দিয়েছেন। (বই: "যাকাতের বিধান", শায়খুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানী)।


৫. প্রয়োজনীয় হানাফী কিতাবের রেফারেন্স

| কিতাব | রেফারেন্স | |--------|------------| | রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) | ২/২৯৫-২৯৯ (যাকাতের নিসাব অধ্যায়) | | ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) | ১/১৭৫-১৭৮ | | আল-হিদায়া (মারগীনানী) | ১/৮৫-৮৮ | | ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী) | ২/২৯১-৩০২ | | ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) | ২/২৫-২৮ | | মা’রিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী) | যাকাত সংশ্লিষ্ট আয়াতের তাফসীর | | বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী) | যাকাত অধ্যায় |


৬. সারসংক্ষেপ

  • যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে এবং তা এক বছর স্থায়ী হয়েছে, তার ওপর যাকাত ফরজ।
  • নিসাবের ভিত্তি: ২০ মিসকাল সোনা (৮৭.৪৮ গ্রাম) বা ২০০ দিরহাম রূপা (৬১২.৩৬ গ্রাম)।
  • অর্থ ও পণ্যের ক্ষেত্রে নিসাব রূপার মূল্যের সমান।
  • উত্তম হলো রূপার নিসাবকে মানদণ্ড ধরা (বর্তমানে প্রায় ১.২-১.৪ লাখ টাকা)।
  • সোনার নিসাবের চেয়ে রূপার নিসাব বেশি বাস্তবসম্মত, কারণ এটি অনেক বেশি মানুষকে যাকাতের আওতায় আনে।

যাকাত গণনার সহজ নিয়ম: নিজের মোট সম্পদ (নগদ, ব্যাংক ব্যালান্স, ব্যবসায়িক পণ্য, প্রাপ্য ঋণ, সোনা-রূপা ও বিনিয়োগ) থেকে ঋণ ও প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিন। বাকি টাকা যদি রূপার নিসাবের সমান বা বেশি হয়, তবে মোট সম্পদের ২.৫% যাকাত দিতে হবে।


সতর্কীকরণ: উপযুক্ত আলেম বা মুফতির নিকট থেকে নিজের সম্পদের হিসাব পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি। যাকাত ইবাদত, তাই সঠিক জ্ঞান অর্জন করে দেওয়া উত্তম।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.