মুসলিম নারীর মুদি দোকান পরিচালনা: পর্দা রক্ষা করে দোকান চালানো, চকলেট-চিপস বিক্রি করা, এবং সিগারেট, পূজার সামগ্রী বিক্রি করার—শরয়ী বিধান জানতে চাই?

Business and Job · Hanafi

Question No: 6042
Questioner: 0437
Question Asked: 28 Sep 2026, 12:41 AM
Reviewed & Published: 28 Sep 2026, 03:56 AM
Views: 19
Tokens: 5,161
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার একটা মুদিখানার দোকান আছে বাড়িতেই, আমি একজন মেয়ে। আমি ফুল হাতা জামা এবং ফেস টা কভার থাকে নিকাব দিয়ে আমি কি এইভাবে দোকান চালাতে পারব?আমার দোকানে কি বাচ্চাদের খবর যেগুলো খেলে ক্ষতি হয় যেমন বিভিন্ন চকলেট কেক কুর্কুরে চিপস ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে রাখতে পারবো আল্লাহর যাচ্ছে জবাব দিতে হবেনা ত??নেশা জাতীয় দ্রব্য যেমন পান, বিড়ি, দক্তা, সিগারেট, খৈনি, বিমল, শেখর ইত্যাদি রাখতে পারবো? পুজোর কিছু সামগ্রিক বিক্রি করতে পারব?

Answer

মুদি দোকান পরিচালনা: একজন মুসলিম নারীর জন্য শরীয়তের দিকনির্দেশনা

ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আপনার মুদিখানার ব্যবসা এবং বিভিন্ন পণ্য কেনাবেচা সংক্রান্ত মাসআলাগুলোর ফিকহী ফায়সালা ফিকহে হানাফীর নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ নিচে বিস্তারিত পেশ করা হলো:


১. পূর্ণাঙ্গ পর্দা (হিজাব ও নিকাব) বজায় রেখে ঘরে বসে নারী কর্তৃক দোকান পরিচালনার হুকুম:

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত: একজন নারী হিসেবে আপনি যদি নিজ বাড়িতে পূর্ণাঙ্গ শরয়ী পর্দা রক্ষা করে (অর্থাৎ ফুল হাতা পোশাক পরা, মাথায় হিজাব এবং মুখমণ্ডল নিকাব দ্বারা ঢেকে পরপুরুষের সামনে চেহারা না প্রকাশ করে) দোকান পরিচালনা করেন, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ জায়েয ও হালাল।
  • শরয়ী ব্যাখ্যা: ইসলামে নারীদের জন্য শরয়ী পর্দা ও শালীনতা বজায় রেখে নিজ গৃহে বা নিরাপদ পরিবেশে হালাল ব্যবসা-বাণিজ্য ও উপার্জনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।
  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    • ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৭৬, ১৮২–১৮৫ (অধ্যায়: বাবুল হিজাব — পূর্ণাঙ্গ পর্দা বজায় রেখে নারীদের ঘরে থেকে কাজ ও ব্যবসার শরয়ী বৈধতা)।
    • ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৮শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৯৩ (অধ্যায়: কিতাবুল কাসব — পর্দানশীন নারীর হালাল উপার্জনের ফতোয়া)।
    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৪০৭–৪০৮ (অধ্যায়: সতর ও পর্দা — মুমিন নারীর আবৃত থাকার বিধান)।

২. বাচ্চাদের চকলেট, কেক, চিপস, কুড়কুরে ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রী রাখার হুকুম (আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা সংক্রান্ত):

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত: যেসব খাদ্যসামগ্রী মূলত হালাল উপাদান দিয়ে তৈরি (যাতে মদ, শূকরের চর্বি বা কোনো হারাম বা বিষাক্ত উপাদান নেই), যেমন—সাধারণ চকলেট, কেক, চিপস, কুড়কুরে ইত্যাদি বাচ্চাদের খাবার প্রচুর পরিমাণে রাখা ও বিক্রি করা সম্পূর্ণ জায়েয ও হালাল।
  • জবাবদিহিতা সংক্রান্ত ফায়সালা: যেহেতু এসব পণ্য মৌলিকভাবে হালাল খাদ্যবস্তু এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ সম্পদ (মাল-এ-মুতাক্বাব্বিম), তাই এগুলো বিক্রি করার কারণে ইনশাআল্লাহ আল্লাহর দরবারে আপনাকে কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। তবে ব্যবসায়ী হিসেবে মানসম্মত ও ভালো খাবার রাখার চেষ্টা করা উত্তম।
  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৩য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১১৪–১১৫ & ৩ ৪৮–৩৪৯ (অধ্যায়: কিতাবুল বুয়ু — উপযোগিতাপূর্ণ হালাল খাদ্যসামগ্রী কেনাবেচার মূলনীতি)।
    • ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৬শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৫২ (অধ্যায়: বাবুল বায়ইছ সহীহ — হালাল খাদ্যদ্রব্য বিক্রির বৈধতার বিবরণ)।
    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৮১–২৮২ (অধ্যায়: ক্রয়-বিক্রয়ের শর'য়ী রূপরেখা)।

৩. নেশাজাতীয় ও ক্ষতিকর তামাকজাত দ্রব্যাদি (পান, বিড়ি, জর্দা, সিগারেট, খৈনি, গুল ইত্যাদি) বিক্রির হুকুম:

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত: বিড়ি, সিগারেট, জর্দা/দক্তা, খৈনি, বিমল, শেখর ইত্যাদির মতো তামাকজাত ও ক্ষতিকর দ্রব্যাদি বিক্রি করা শরীয়তের দৃষ্টিতে মাকরূহে তাহরীমী (নাজায়েয বা অপছন্দনীয়)।
  • শরয়ী ব্যাখ্যা: এগুলো মানবদেহের জন্য সরাসরি ক্ষতিকর, মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী এবং স্বাস্থ্যহানির কারণ। ইসলামি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, যেসব বস্তু কেবলই ক্ষতির কারণ এবং যার মধ্যে শরয়ী কোনো উপকার নেই, সেগুলো কেনাবেচা করা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। তবে জর্দা বা তামাক ছাড়া কেবল সাধারণ পান ও সুপারি বিক্রি করা সম্পূর্ণ জায়েয।
  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    • ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৬শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১২০–১২২ (অধ্যায়: বাবুল বায়ইল মাকরূহ — তামাক, বিড়ি, সিগারেট ও ক্ষতিকর দ্রব্য কেনাবেচার ফতোয়া)।
    • ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৬ষ্ঠ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৮৩–৮৫ (অধ্যায়: তামাক ও ধূমপান সংক্রান্ত মাসআলা)।
    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৪৪০ (অধ্যায়: ক্ষতিকর বস্তু কেনাবেচার ফিকহী বিধান)।

৪. পূজার সামগ্রী (হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজার ব্যবহৃত জিনিসপত্র) বিক্রির হুকুম:

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত: অমুসলিমদের পূজায় বা ধর্মীয় রীতিনীতিতে ব্যবহৃত সুনির্দিষ্ট পূজার সামগ্রী (যেমন: পূজার প্রতিমা, দেব-দেবীর ছবি, পূজার বিশেষ সিঁদুর, চড়াওয়ার কাপড় বা পূজার সরঞ্জাম) বিক্রি করা কোনো মুসলমানের জন্য নাজায়েয ও গুনাহ।
  • শরয়ী ব্যাখ্যা: শিরক বা অন্য ধর্মের উপাসনার জন্য খাস বা সুনির্দিষ্ট জিনিস বিক্রি করলে তাতে গোনাহ ও শিরকী কাজে সহযোগিতা করা হয়, যাকে শরীয়তের পরিভাষায় 'ইআনাত 'আলাল মা'ছিয়াহ (পাপে সহযোগিতা) বলা হয়, যা কুরআন ও ফিকহে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে যেসব জিনিস সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন কাজেও ব্যবহার করে (যেমন: সাধারণ ফলমূল, নারকেল, মিষ্টি, সাধারণ ধূপ বা সুতা), তা বিক্রি করা জায়েয।
  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    • ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৬শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৩৮–১৩৯ (অধ্যায়: বাবুল বায়ইল বাতেল ওয়াল ফাসিদ ওয়াল মাকরূহ — পূজার বিশেষ সামগ্রী ও পূজার জিনিসপত্র কেনাবেচার ফতোয়া)।
    • ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৮শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৬–৩৭ (অধ্যায়: অন্য ধর্মের পূজা ও অনুষ্ঠানে সহযোগিতা সংক্রান্ত বিধান)।
    • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১২৮–১২৯ (অধ্যায়: 'ইআনাত 'আলাল মা'ছিয়াহ বা গোনাহের কাজে সহায়তার নিষেধাজ্ঞা)।

তথ্যসূত্র:

  • কুরআন: সূরা মায়িদা ২, সূরা বাকারা ২৭৫, সূরা আরাফ ১৫৭, সূরা আহযাব ৩২
  • সহীহ মুসলিম: ২০০৩
  • সুনানে আবু দাউদ: ৩৪৮৮
  • ফতোয়ায়ে শামী: ৬/৩৮৫, ৬/৩৯১
  • ফতোয়ায়ে উসমানী: ৩/৪০৮, ৩/৪৩২, ৩/৪৩৫
  • ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ৩/৩৪৫
  • ইমদাদুল ফতোয়া: ৪/২৭৬
  • রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৮৫, ৬/৩৯১

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.