বাচ্চা হওয়ার পর স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়ি থেকে আনতে গেলে মিষ্টি, মাছ, পান দেওয়ার প্রথা কি শিরক?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: বাচ্চা হওয়ার পর বউ শ্বশুরবাড়িতে গেলে ৩-৪ মাস পরে আনতে গেলে মিষ্টি, মাছ, পান দিতে হয় যাত্রার জন্য — এটা কি শিরক হবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, এটি শিরক নয়। বরং এটি একটি সামাজিক প্রথা (রীতি-নীতি) যা শিরকের সাথে সম্পর্কিত নয়। তবে এ বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিস্তারিত আলোচনা
১. শিরকের সংজ্ঞা
শিরক হলো আল্লাহ তা'আলার সাথে কাউকে শরিক করা — অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, উপকার-ক্ষতিকারক বা ইবাদতের যোগ্য মনে করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ ۘ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ
"আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহকে ডাকো না; তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।" — (সূরা আল-কাসাস: ৮৮)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা ক্ষমা করেন না; এছাড়া অন্য সব গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" — (সূরা আন-নিসা: ৪৮)
২. প্রশ্নে উল্লিখিত বিষয়ের প্রকৃত রূপ
বাচ্চা হওয়ার পর স্ত্রী শ্বশুরবাড়িতে থাকলে, ৩-৪ মাস পরে তাকে আনতে যাওয়ার সময় মিষ্টি, মাছ, পান ইত্যাদি নিয়ে যাওয়া — এটি মূলত:
- সামাজিক প্রথা ও রীতি (আদত/উরফ)
- আপ্যায়ন ও সম্মান প্রদর্শন
- খুশির প্রকাশ
এতে যদি কেউ বিশ্বাস না করে যে এই মিষ্টি/মাছ/পান নিজে থেকে কোনো উপকার বা ক্ষতি করে, বা এগুলোকে কোনো পবিত্র শক্তি হিসেবে মনে না করে — তাহলে এটি শিরক নয়।
৩. কখন শিরক বা হারাম হবে?
এই প্রথাটি শিরক বা হারাম হবে যদি:
| নং | শিরকের কারণ | ব্যাখ্যা | |-----|-------------|----------| | ১ | বিশ্বাস করা যে মিষ্টি/মাছ/পান নিজে থেকে উপকার করে | এটি শিরক হবে | | ২ | এই জিনিসগুলোকে বরকতের উৎস মনে করা | শিরক | | ৩ | আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে মান্নত করা | শিরক | | ৪ | কুফরি বা শিরকি বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত করা | শিরক | | ৫ | হারাম কিছু (যেমন মদ, জুয়া) অন্তর্ভুক্ত করা | হারাম | | ৬ | অপচয় বা অহংকারের উদ্দেশ্যে করা | মাকরুহ/হারাম |
৪. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:
العادة محكمة
"প্রথা (উরফ) বিচার্য।"
অর্থাৎ, শরীয়তবিরোধী না হলে সামাজিক প্রথা পালন করা জায়েজ।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন:
"যেসব প্রথা শরীয়তের মূলনীতির পরিপন্থী নয় এবং তাতে শিরকি বিশ্বাস নেই, সেগুলো পালন করা জায়েজ।"
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ উল্লেখ করেন:
"শিরক হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা। সামাজিক প্রথা বা রীতি-নীতি শিরক নয়, যতক্ষণ না তাতে শিরকি বিশ্বাস যুক্ত হয়।"
৫. সতর্কতা
যদিও এটি শিরক নয়, তবে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত:
- নিয়ত পরিষ্কার রাখা — এটি শুধু সামাজিক আপ্যায়ন, কোনো ধর্মীয় বিধান নয়।
- অপচয় পরিহার করা — ইসলামে অপচয় নিষিদ্ধ।
- শিরকি বিশ্বাস থেকে বেঁচে থাকা — কোনো জিনিসকে স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে না ভাবা।
- কুসংস্কার পরিহার — যদি কেউ মনে করে এই জিনিস না দিলে অমঙ্গল হবে, তাহলে তা কুসংস্কার ও শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
উপসংহার
প্রশ্নে উল্লিখিত প্রথাটি শিরক নয়, যদি না তাতে শিরকি বিশ্বাস বা কুফরি আকিদা যুক্ত হয়। এটি একটি সামাজিক রীতি, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ। তবে নিয়ত পরিষ্কার রাখা এবং শিরকি বিশ্বাস থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য।