মহিলা ডক্টর কি পুরুষ রোগীর আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে পারবে

Business and Job · Hanafi

Question No: 5423
Questioner: Sharifa Jannat
Question Asked: 13 Sep 2026, 11:12 PM
Reviewed & Published: 13 Sep 2026, 11:18 PM
Views: 9
Tokens: 5,916
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একজন মহিলা ডাক্তার। আলট্রাসনোগ্রাফির বিষয়ে অভিজ্ঞ। আমার স্বামী এবং আমার পরিবারের বাকি সবাই চায় আমি চাকরি করি। কিন্তু ক্লিনিক গুলোতে চাকরি করলে নারী-পুরুষ উভয়েরই আল্টাসনোগ্রাফি করতে হয়। আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে সব মহিলা স্টাফ রা থাকেন এজন্য এইটা চয়েস করেছিলাম যাতে পর্দা করতে পারি কিন্তু এখন পুরুষ রোগীদের পর্দার সহিত আল্টাসনোগ্রাফি করা যাবে কিনা নারী চিকিৎসক হিসেবে তা জানতে চাই। উল্লেখ্য চাকরি করা আমার জরুরতের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু সবার চাপে পড়ে এখন কি করব বুঝতে পারছি না।

Answer

মহিলা ডাক্তারের জন্য পুরুষ রোগীর আলট্রাসনোগ্রাফি করার হুকুম

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

একজন মহিলা ডাক্তার আলট্রাসনোগ্রাফি (ultrasound) বিষয়ে অভিজ্ঞ। ক্লিনিকে চাকরি করলে নারী-পুরুষ উভয় রোগীর আলট্রাসনোগ্রাফি করতে হয়। তিনি জানতে চান—নারী চিকিৎসক হিসেবে পুরুষ রোগীর পর্দার সহিত আলট্রাসনোগ্রাফি করা কি জায়েয? উল্লেখ্য, চাকরি করা তাঁর প্রয়োজন নয়, বরং পরিবারের চাপে পড়ে আছেন।


সংক্ষিপ্ত উত্তর

মহিলা চিকিৎসকের জন্য পুরুষ রোগীর আলট্রাসনোগ্রাফি করা—যেখানে রোগীর সতর খোলা বা শরীরে হাত দেওয়ার প্রয়োজন হয়—শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নয়। তবে কিছু শর্তসাপেক্ষে সীমিত পরিসরে অনুমতি রয়েছে, যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


বিস্তারিত আলোচনা

১. মূল নীতি: পুরুষ-নারীর মধ্যে পর্দা

কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا

"মুমিন নারীদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে; আর তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না, যা প্রকাশ্য তা ছাড়া।" — (সূরা আন-নূর: ৩১)

আর পুরুষদের সম্পর্কে বলেন:

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ

"মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে।" — (সূরা আন-নূর: ৩০)

২. চিকিৎসার প্রয়োজনে সতর খোলার বিধান

হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো—চিকিৎসার প্রয়োজনে পরপুরুষ/পরনারীর সতরের দিকে তাকানো বা স্পর্শ করা কেবল তখনই অনুমোদিত, যখন সমলিঙ্গের চিকিৎসক পাওয়া না যায় এবং রোগের গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

ফাতাওয়া আলমগিরিতে উল্লেখ আছে:

"الرجل إذا مرض لا يجوز للطبيب أن ينظر إلى عورته إلا عند الضرورة، والضرورة تقدر بقدرها"

"পুরুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসকের জন্য তার সতরের দিকে তাকানো জায়েয নয়, কেবল প্রয়োজনের সময়; আর প্রয়োজন তার পরিমাণ অনুযায়ী।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)

রাদ্দুল মুহতারে ইবনে আবিদীন শামি (রহ.) বলেন:

"وَلَا يَجُوزُ لِلرَّجُلِ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ وَلَا بِالْعَكْسِ إِلَّا لِضَرُورَةِ الْمُدَاوَاةِ"

"পুরুষের জন্য নারীর সতরের দিকে তাকানো জায়েয নয়, অনুরূপভাবে নারীর জন্যও পুরুষের প্রতি; কেবল চিকিৎসার প্রয়োজনে অনুমতি আছে।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, কিতাবুল হাজার)

৩. সমলিঙ্গের চিকিৎসক অগ্রাধিকারযোগ্য

ফাতাওয়া উসমানিইমদাদুল ফাতাওয়া-তে স্পষ্ট করা হয়েছে:

"যদি সমলিঙ্গের চিকিৎসক পাওয়া যায়, তবে বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জায়েয নয়। আর যদি সমলিঙ্গের চিকিৎসক না পাওয়া যায় এবং রোগ গুরুতর হয়, তবে প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী অনুমতি রয়েছে।"

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:

"চিকিৎসার প্রয়োজনে পরপুরুষ বা পরনারীর শরীর দেখা বা স্পর্শ করার অনুমতি কেবল তখনই, যখন সমলিঙ্গের চিকিৎসক উপলব্ধ না থাকে এবং রোগীর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।"

৪. আলট্রাসনোগ্রাফির ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা

আলট্রাসনোগ্রাফিতে সাধারণত নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জড়িত থাকে:

  1. রোগীর শরীরের নির্দিষ্ট অংশ খোলা রাখা — যেমন পেট, বুক, পিঠ ইত্যাদি।
  2. প্রোব (probe) শরীরে স্পর্শ করা — যা সরাসরি স্পর্শের অন্তর্ভুক্ত।
  3. ঘনিষ্ঠ অবস্থান — চিকিৎসককে রোগীর খুব কাছে থাকতে হয়।
  4. দীর্ঘ সময় — অনেক সময় ১৫-৩০ মিনিট লাগে।

এই সবগুলোই পর্দার বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, যদি না প্রকৃত শরয়ী প্রয়োজন থাকে।

৫. শরয়ী প্রয়োজন (ضرورت) এর সংজ্ঞা

হানাফি ফিকহে ضرورت (প্রয়োজন) এর সংজ্ঞা হলো:

"الضرورة هي التي إذا لم يتناولها المرء وقع في الهلاك أو المرض الشديد"

"প্রয়োজন হলো তা, যা না করলে মানুষ ধ্বংস বা গুরুতর রোগে পতিত হবে।"

আল-হিদায়ায় আছে:

"الضرورات تبيح المحظورات"

"প্রয়োজন নিষিদ্ধ বিষয়কে বৈধ করে।"

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো:

"الضرورة تقدر بقدرها"

"প্রয়োজন তার পরিমাণ অনুযায়ী অনুমান করা হবে।"

অর্থাৎ, যদি সমলিঙ্গের চিকিৎসক পাওয়া যায়, তবে বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন এর অন্তর্ভুক্ত নয়।

৬. আপনার পরিস্থিতির বিশ্লেষণ

আপনার প্রশ্নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে:

| বিষয় | বিবেচনা | |------|---------| | চাকরির প্রয়োজন | আপনি নিজেই বলেছেন—চাকরি করা আপনার জরুরতের মধ্যে পড়ে না। | | পরিবারের চাপ | এটি শরয়ী প্রয়োজন নয়; বরং সামাজিক চাপ। | | পুরুষ রোগীর আলট্রাসনোগ্রাফি | এতে সতর খোলা, স্পর্শ ও ঘনিষ্ঠতা জড়িত। | | সমলিঙ্গের চিকিৎসক | পুরুষ রোগীদের জন্য পুরুষ চিকিৎসক সাধারণত পাওয়া যায়। | | পর্দার বিধান | আপনি নিজেই পর্দা করতে চান—এটি প্রশংসনীয়। |

সিদ্ধান্ত: যেহেতু চাকরি করা আপনার শরয়ী প্রয়োজন নয়, এবং পুরুষ রোগীদের জন্য পুরুষ চিকিৎসক সাধারণত উপলব্ধ, সেহেতু পুরুষ রোগীর আলট্রাসনোগ্রাফি করা আপনার জন্য জায়েয হবে না—বিশেষত যখন তাতে সতর খোলা বা স্পর্শের প্রয়োজন হয়।

৭. যদি ক্লিনিকে বাধ্যতামূলক হয়?

যদি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বাধ্যতামূলক করে যে আপনাকে পুরুষ রোগীদেরও আলট্রাসনোগ্রাফি করতে হবে, তাহলে:

  1. সম্ভব হলে শুধু নারী রোগীদের জন্য কাজ করার ব্যবস্থা করুন — যেমন নারীদের জন্য পৃথক বিভাগ বা শিফট।
  2. পুরুষ রোগীর ক্ষেত্রে পুরুষ চিকিৎসকের কাছে রেফার করুন — এটি শরয়ী দৃষ্টিতে উত্তম।
  3. যদি একান্তই বাধ্যতামূলক হয় এবং সমলিঙ্গের চিকিৎসক না থাকে, তবে কেবল প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী সীমিত অনুমতি হতে পারে—যেমন শুধু প্রয়োজনীয় অংশ খোলা রাখা, স্পর্শ এড়ানো, দৃষ্টি সংযত রাখা ইত্যাদি। তবে এটি অনুমোদিত নয়, বরং বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে ছাড়
  4. এমন চাকরি ত্যাগ করা উত্তম, যদি তা আপনার দ্বীনি স্বার্থ রক্ষা করে এবং আপনার প্রয়োজনও না হয়।

৮. ফকীহদের অভিমত

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, পরপুরুষ-পরনারীর মধ্যে চিকিৎসার প্রয়োজনে দেখা-স্পর্শ কেবল চরম প্রয়োজন এর ক্ষেত্রে অনুমোদিত।

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) একই মত পোষণ করেন।

ইমাম তাহাবি (রহ.) তাঁর শরহু মাআনিল আসার-এ উল্লেখ করেন:

"لا يجوز النظر إلى عورة الغير إلا عند الضرورة القصوى"

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বাহিশতী জেওর-এ বলেন:

"নারীর জন্য পরপুরুষের সতরের দিকে তাকানো বা স্পর্শ করা জায়েয নয়, কেবল চিকিৎসার প্রয়োজনে সমলিঙ্গের চিকিৎসক না থাকলে সীমিত অনুমতি আছে।"

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ সূরা নূরের তাফসীরে বলেন:

"পর্দার বিধান চিকিৎসার প্রয়োজনে শিথিল হয় কেবল তখনই, যখন সমলিঙ্গের চিকিৎসক না পাওয়া যায় এবং রোগ গুরুতর হয়।"


ব্যবহারিক পরামর্শ

  1. শুধু নারী রোগীদের জন্য কাজ করার চেষ্টা করুন — নারীদের আলট্রাসনোগ্রাফি সেন্টার বা নারী বিভাগে।
  2. পুরুষ রোগীদের জন্য পুরুষ চিকিৎসক নিয়োগের দাবি করুন — ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করুন।
  3. পরিবারকে বুঝান — চাকরি না করলেও আপনি ঘরে বসে অনলাইন কনসালটেশন বা নারী রোগীদের সেবা দিতে পারেন।
  4. দ্বীনি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিন — দুনিয়ার চাপে পড়ে হারাম কাজে জড়িত হবেন না।
  5. ইস্তিখারা করুন — আল্লাহর কাছে সিদ্ধান্তের জন্য দোয়া করুন।
  6. স্থানীয় মুফতির সাথে পরামর্শ করুন — আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিস্তারিত জানিয়ে ফতোয়া নিন।

উপসংহার

মহিলা চিকিৎসকের জন্য পুরুষ রোগীর আলট্রাসনোগ্রাফি করা—যেখানে সতর খোলা, স্পর্শ বা ঘনিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়—শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নয়। যেহেতু আপনার চাকরি করা শরয়ী প্রয়োজন নয়, সেহেতু পরিবারের চাপে পড়ে এমন কাজে জড়িত হওয়া উচিত নয়। আপনি শুধু নারী রোগীদের সেবা করার ব্যবস্থা করুন, অথবা এমন প্রতিষ্ঠানে কাজ করুন যেখানে পুরুষ রোগীদের জন্য পুরুষ চিকিৎসক রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আপনার জন্য সহজ ও হালাল রুজির ব্যবস্থা করুন।


তথ্যসূত্র:

  • সূরা আন-নূর: ৩০-৩১
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬
  • আল-হিদায়া
  • শরহু মাআনিল আসার, ইমাম তাহাবি
  • বাহিশতী জেওর, আশরাফ আলী থানভী
  • মাআরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি
  • ফাতাওয়া উসমানি, মুফতি তাকি উসমানি
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, আশরাফ আলী থানভী

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.