মুশারাকা বিনিয়োগে নির্দিষ্ট সময় পর পর অগ্রিম/সাময়িক মুনাফা গ্রহণ করা কি শরিয়াহসম্মত?
Business and Job · Hanafi
Question
তবে ব্যবসাটি প্রতি ৪ মাস পর পর কিছু অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেয়।
বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে বলছি:
- আমি ব্যবসায় ১,০০,০০০ টাকা বিনিয়োগ করলাম।
- ব্যবসার প্রত্যাশিত বা আনুমানিক বার্ষিক ROI ১৫–২০%, অর্থাৎ আনুমানিক ১৫,০০০–২০,০০০ টাকা লাভ হতে পারে।
- ব্যবসাটি প্রতি ৪ মাস পর পর আমাকে ৪,০০০ টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব করছে। অর্থাৎ এক বছরে মোট ১২,০০০ টাকা।
- কিন্তু ৪ মাস বা ৮ মাসের সময়ে ব্যবসার প্রকৃত বার্ষিক লাভ বা ক্ষতি তখনও চূড়ান্তভাবে জানা থাকে না।
- বছর শেষে ব্যবসার প্রকৃত লাভ বা ক্ষতি হিসাব করা হবে এবং এর ভিত্তিতে আগে দেওয়া অর্থের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় (adjustment) করা হবে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি বছর শেষে দেখা যায় যে প্রকৃত লাভ হয়েছে ২০,০০০ টাকা, তাহলে আগে দেওয়া ১২,০০০ টাকার পর বাকি প্রাপ্য লাভ হিসাব করে দেওয়া হবে।
আবার, যদি প্রকৃত লাভ প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়, তাহলে আগে দেওয়া অর্থের অতিরিক্ত অংশ চূড়ান্ত হিসাবের সময় সমন্বয় করা হবে।
আর যদি ব্যবসায় প্রকৃত ক্ষতি (loss) হয়, তাহলে চুক্তি অনুযায়ী সেই ক্ষতি আমার বিনিয়োগকৃত মূলধন থেকে সমন্বয় করা হবে।
অর্থাৎ, প্রতি ৪ মাসে দেওয়া ৪,০০০ টাকা কোনো নির্দিষ্ট বা গ্যারান্টিযুক্ত লাভ হিসেবে নির্ধারিত নয়। এটি মূলত অগ্রিম/সাময়িক (provisional/interim) মুনাফা বিতরণ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে এবং বছর শেষে ব্যবসার প্রকৃত লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে চূড়ান্ত সমন্বয় করা হবে।
আমার প্রশ্ন:
মুশারাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে, ব্যবসার প্রকৃত লাভ বা ক্ষতি চূড়ান্তভাবে জানা না থাকা অবস্থায় প্রতি ৪ মাস পর পর এভাবে অগ্রিম/সাময়িক মুনাফার অর্থ গ্রহণ করা কি ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বৈধ?
বিশেষভাবে জানতে চাই:
১. যদি প্রতি ৪ মাসে দেওয়া ৪,০০০ টাকা নিশ্চিত বা গ্যারান্টিযুক্ত মুনাফা না হয়ে অগ্রিম/সাময়িক মুনাফা হিসেবে দেওয়া হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা কি জায়েজ?
২. বছর শেষে ব্যবসার প্রকৃত লাভ বা ক্ষতি হিসাব করে আগে দেওয়া অর্থের সঙ্গে সঠিকভাবে সমন্বয় করা হলে, এই পদ্ধতিটি কি শরিয়াহসম্মত হবে?
৩. মুশারাকার ক্ষেত্রে এ ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন/অগ্রিম মুনাফা বিতরণ বৈধ হওয়ার জন্য কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে?
৪. এই ব্যবস্থায় এমন কোনো বিষয় আছে কি, যার কারণে এটি মুশারাকার পরিবর্তে নির্দিষ্ট মুনাফার (fixed/guaranteed return) চুক্তি হিসেবে গণ্য হতে পারে?
Answer
মুশারাকা বিনিয়োগে অগ্রিম/সাময়িক মুনাফা গ্রহণের শরয়ী বিধান
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার বর্ণিত মুশারাকা (Musharaka) নীতির ভিত্তিতে বিনিয়োগের পদ্ধতিটি ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ, জায়েয ও শরিয়াহসম্মত।
এখানে প্রতি ৪ মাস পর পর প্রদত্ত ৪,০০০ টাকা কোনো নির্দিষ্ট বা গ্যারান্টিযুক্ত মুনাফা নয়; বরং এটি ব্যবসার আনুমানিক বা প্রত্যাশিত লাভের ওপর ভিত্তি করে প্রদানকৃত একটি সাময়িক/অগ্রিম লভ্যাংশ বিতরণ (Provisional/Interim Profit Distribution), যা ফিকহের পরিভাষায় ‘দফ’আ তাহতাল হিসাব’ (الدفعة تحت الحساب) নামে পরিচিত । যেহেতু বছর শেষে ব্যবসার প্রকৃত লাভ-ক্ষতির হিসাব (Constructive Liquidation / التنضيض التقديري) করে পূর্বে প্রদত্ত অর্থের সাথে যথাযথ সমন্বয় (Final Settlement/Adjustment) করার স্পষ্ট শর্ত রয়েছে, সেহেতু এটি মুশারাকার মূলনীতিকে অক্ষুণ্ণ রাখে।
হানাফী ফিকহ ও সমকালীন ইসলামি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে আপনার প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত শরয়ী বিশ্লেষণ নিচে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ পেশ করা হলো:
১. সাময়িক/অগ্রিম মুনাফা গ্রহণের শরয়ী হুকুম:
- শরয়ী সমাধান: ব্যবসার প্রকৃত লাভ-ক্ষতি চূড়ান্তভাবে জানা না থাকা সত্ত্বেও প্রতি ৪ মাস পর পর অগ্রিম বা সাময়িক মুনাফা হিসেবে অর্থ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ জায়েয ।
- শরয়ী কারণ: ইসলামি ফিকহে মুশারাকা বা মুদারাবা চুক্তিতে ব্যবসার বাৎসরিক চূড়ান্ত হিসাব সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে আনুমানিক লাভের ওপর ভিত্তি করে অংশীদারদের ‘সাময়িক অগ্রিম’ (On-account Advance) হিসেবে অর্থ প্রদান করা বৈধ। । শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি একটি সাময়িক বন্টন, যা চূড়ান্ত হিসাব না হওয়া পর্যন্ত আমানত বা ঋণ হিসেবে গণ্য থাকে এবং বছর শেষে প্রকৃত হিসাবের সাথে তা সমন্বয় করা হয়।
২. বছর শেষে প্রকৃত লাভ-ক্ষতির সাথে সমন্বয় করার বৈধতা:
- শরয়ী সমাধান: বছর শেষে প্রকৃত হিসাব (Actual Accounting) কষে পূর্বে প্রদত্ত অর্থের সাথে সমন্বয় করার পদ্ধতিটি পুরোপুরি শরিয়াহসম্মত।
- সমন্বয়ের নিয়ম:
- যদি বছর শেষে দেখা যায় প্রকৃত লাভ বেশি হয়েছে (যেমন: ২০,০০০ টাকা), তবে পূর্বে দেওয়া ১২,০০০ টাকা বাদ দিয়ে বাকি ৮,০০০ টাকা বিনিয়োগকারীকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে [৮০২]।
- যদি প্রকৃত লাভ কম হয়ে থাকে (যেমন: ১০,০০০ টাকা), তবে পূর্বে প্রদত্ত অতিরিক্ত ২,০০০ টাকা চূড়ান্ত হিসাবের সময় সমন্বয় বা ফেরত নেওয়া হবে [৮০২]।
- যদি ব্যবসায় প্রকৃত ক্ষতি (Loss) হয়, তবে চুক্তি অনুযায়ী সেই ক্ষতি অর্জিত মুনাফা থেকে এবং প্রয়োজনে বিনিয়োগকৃত মূলধন (Capital) থেকে সমন্বয় করতে হবে।
৩. অন্তর্বর্তীকালীন মুনাফা বিতরণ বৈধ হওয়ার আবশ্যিক শর্তাবলি:
মুশারাকা বিনিয়োগে এই ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন লভ্যাংশ বন্টন বৈধ হওয়ার জন্য নিচের শর্তগুলো পূরণ করা বাধ্যতামূলক:
১. শতকরা হারে লভ্যাংশ নির্ধারণ (Percentage Ratio): চুক্তির শুরুতে লাভ বন্টনের অনুপাত শতকরা বা আনুপাতিক হারে (যেমন: অর্জিত লাভের ৫০%:৫০% বা ৬০%:৪০%) নির্ধারিত থাকতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট অংকের টাকা (যেমন: বছরে ১২,০০০ টাকা নিশ্চিত) লাভ হিসেবে ধার্য করা যাবে না [৬৩৬]। ২. চূড়ান্ত সমন্বয়ের বাধ্যবাধকতা (Subject to Final Settlement): চুক্তিপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে, অন্তর্বর্তীকালীন দেওয়া অর্থ ‘সাময়িক/অগ্রিম’ এবং বছর শেষে প্রকৃত লাভ-ক্ষতির ওপর ভিত্তি করে এর চূড়ান্ত সমন্বয় করা হবে । ৩. লোকসান মূলধন অনুপাতে বহন করা (Loss Sharing): ব্যবসায়ে কোনো বছরে প্রকৃত লোকসান হলে তা অর্জিত মুনাফা এবং বিনিয়োগকৃত মূলধনের আনুপাতিক হারে সমন্বয় করতে হবে। ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারীকে মূলধনের গ্যারান্টি (Capital Guarantee) দিতে পারবে না। ৪. যৌক্তিক আনুমানিক হিসাব: ৪ মাস পর পর দেওয়া সাময়িক অর্থের পরিমাণটি ব্যবসার বাস্তবসম্মত ও সম্ভাব্য হিসাবের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে, অবাস্তব কোনো কল্পনা থেকে হতে পারবে না ।
৪. নির্দিষ্ট মুনাফার (Fixed/Guaranteed Return) চুক্তিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়সমূহ:
আপনার বর্ণিত চুক্তিতে নিচের বিষয়গুলোর কোনো একটি পাওয়া গেলে তা মুশারাকার বদলে সুদি বা হারাম নির্দিষ্ট মুনাফার চুক্তি (Guaranteed Return Contract) হিসেবে গণ্য হবে:
১. সমন্বয় না করা: যদি ৪ মাস পর পর দেওয়া ৪,০০০ টাকাকে ‘চূড়ান্ত লাভ’ হিসেবে ধরা হয় এবং বছর শেষে ব্যবসার প্রকৃত লাভ কম হলেও বা লোকসান হলেও এই টাকা আর সমন্বয় না করার শর্ত করা হয়। ২. মূলধন সুরক্ষার নিশ্চয়তা (Capital Guarantee): যদি ব্যবসায়ে ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও পূর্বে দেওয়া সাময়িক মুনাফা ফেরত না নিয়ে বা মূলধন থেকে সমন্বয় না করে বিনিয়োগকারীর মূলধন ১০০% সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। ৩. নিশ্চিত লাভের বাধ্যবাধকতা: যদি চুক্তিপত্রে বলা থাকে যে, ব্যবসার লাভ বা ক্ষতি যা-ই হোক না কেন, বিনিয়োগকারী প্রতি ৪ মাস পর পর নিশ্চিতভাবে ৪,০০০ টাকা পেতেই থাকবে।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. বুহুস ফি কাযায়া ফিকহিয়্যাহ মুয়াসারা (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৯২–৯৪ ও ৩৬২–৩৬৩: (অধ্যায়: শরীকত ও মুদারাবায় ‘তানযীয তাকদীরী’ ও ‘দফ'আ তাহতাল হিসাব’ বা সাময়িক অগ্রিম লভ্যাংশ বন্টন ও চূড়ান্ত সমন্বয়)। ২. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৪শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১২২ & ১৮২–১৮৩: (অধ্যায়: কিতাবুশ শরীকতি ওয়াল মুদারাবাহ — মুশারাকায় লাভ-লোকসান বন্টন ও নির্দিষ্ট মুনাফা ধার্যের নিষেধাজ্ঞা)। ৩. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৫২–১৫৩: (অধ্যায়: ৩য় পরিচ্ছেদ — শরীকাতে ইনান ও মুদারাবায় লভ্যাংশ ও লোকসানের শর্তাবলী)। ৪. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৬৯–১৭২: (অধ্যায়: কোম্পানি ও যৌথ বিনিয়োগের শরয়ী মূলনীতি)।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।