ব্যাবসার উদ্দেশ্যে ইনডোর ফুটবল টার্ফ মাঠ এবং সুইমিংপুল স্থাপন
Business and Job · Hanafi
Question
আলহামদুলিল্লাহ, আমি দ্বীনের ওপর চলার এবং হালাল-হারাম মেনে জীবন পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। এ বিষয়ে শরীয়তের বিধান জানা ও মেনে চলার ব্যাপারে আমি আন্তরিক।
আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি ইনডোর ফুটবল টার্ফ মাঠ এবং একটি সুইমিং পুল স্থাপনের পরিকল্পনা করছি। উদ্দেশ্য হলো, মানুষ নির্ধারিত ভাড়ার বিনিময়ে ফুটবল খেলতে পারবে এবং সুইমিং পুল ব্যবহার করতে পারবে।
আমাদের প্রশ্ন হলো, এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি না? এ ব্যবসার মধ্যে কোনো শরয়ি সমস্যা, নিষেধাজ্ঞা বা বিশেষ শর্ত রয়েছে কি না, অনুগ্রহ করে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জানালে উপকৃত হব।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
কয়েকজন বন্ধু মিলে ইনডোর ফুটবল টার্ফ মাঠ ও সুইমিং পুল স্থাপন করে নির্ধারিত ভাড়ার বিনিময়ে মানুষকে খেলার ও সাঁতারের সুযোগ দিতে চান। এই ব্যবসা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি না, তাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা শর্ত আছে কি না—এ বিষয়ে জানতে চেয়েছেন।
উত্তর:
আপনাদের এই ব্যবসায়িক পরিকল্পনা মূলত দুটি অংশে বিভক্ত: (১) ফুটবল টার্ফ মাঠ ভাড়া দেওয়া, (২) সুইমিং পুল ভাড়া দেওয়া। শরীয়তের দৃষ্টিতে এ দুটির বিধান আলাদা আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
১. ফুটবল টার্ফ মাঠ ভাড়া দেওয়া
মূলনীতি:
ভাড়া (ইজারা) একটি বৈধ চুক্তি। তবে ভাড়ার বিষয়বস্তু (যা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে) এবং তার ব্যবহার শরীয়তসম্মত হতে হবে। যদি ভাড়াটিয়া শরীয়তবিরোধী কোনো কাজে তা ব্যবহার করে, তবে তা ভাড়া দেওয়া জায়েজ নয়।
ফুটবল খেলার বিধান:
ফুটবল খেলা নিজে হারাম নয়; বরং এটি একটি বৈধ খেলা, যদি নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ হয়:
- খেলার মধ্যে শরীয়তবিরোধী কিছু না থাকে (যেমন: জুয়া, অশ্লীলতা, নামাজ-ইবাদত থেকে গাফিলতা, শরীরের সতর ঢেকে না রাখা ইত্যাদি)।
- খেলার সময় নামাজের সময় পার না হয় বা নামাজ ত্যাগ না করা হয়।
- খেলায় কোনো ধরনের বাজি বা জুয়া না থাকে।
- পুরুষদের ক্ষেত্রে সতর ঢাকা থাকে (নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত) এবং মহিলাদের জন্য পর্দার বিধান মানা হয়।
সমস্যা:
আপনাদের মাঠে যদি পুরুষ ও মহিলা উভয়েই খেলার সুযোগ পায় এবং পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হয়, তবে তা শরীয়তবিরোধী হবে। এছাড়া যদি খেলার সময় নামাজের সময় হয় এবং খেলোয়াড়রা নামাজ ত্যাগ করে, তবে মাঠ ভাড়া দেওয়া গুনাহের সহায়তা হবে।
সমাধান:
- শুধু পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট সময় বা শুধু মহিলাদের জন্য পৃথক সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে, যাতে পর্দার বিধান রক্ষা হয়।
- নামাজের সময় মাঠ বন্ধ রাখা বা নামাজের বিরতি দেওয়া।
- কোনো প্রকার জুয়া বা বাজি নিষিদ্ধ করা।
- খেলোয়াড়দের সতর ঢাকার বিষয়ে সচেতন করা।
ফতোয়ার ভিত্তি:
«وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ»
“পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।” (সূরা মায়িদা: ২)
«إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ»
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফ ও সদাচরণের আদেশ দেন।” (সূরা নাহল: ৯০)
ফিকহের কিতাবে বলা হয়েছে:
«الإجارة على المعصية باطلة»
“পাপের কাজে ভাড়া দেওয়া বাতিল।” (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪)
«كل إجارة كان المقصود منها محرماً فهي باطلة»
“প্রত্যেক এমন ভাড়া যা হারাম কাজের উদ্দেশ্যে হয়, তা বাতিল।” (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৮৪)
২. সুইমিং পুল ভাড়া দেওয়া
সাঁতারের বিধান:
সাঁতার শেখা ও সাঁতার কাটা ইসলামে বৈধ ও প্রশংসনীয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«عَلِّمُوا أَبْنَاءَكُمُ السِّبَاحَةَ وَالرَّمْيَ»
“তোমাদের সন্তানদের সাঁতার ও তীরন্দাজি শেখাও।” (মুসনাদে বাযযার, হাদিস: ১৩৪; যদিও সনদে দুর্বলতা আছে, তবে অর্থটি সহিহ)
তবে সুইমিং পুল ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত শর্তগুলো অবশ্যই মানতে হবে:
- পুরুষ ও মহিলাদের জন্য পৃথক সময় বা পৃথক পুল থাকতে হবে।
- মহিলাদের জন্য পূর্ণ পর্দার ব্যবস্থা থাকতে হবে; পুরুষদের দৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আড়াল থাকতে হবে।
- সাঁতারের পোশাক শরীয়তসম্মত হতে হবে (সতর ঢেকে রাখে এমন)।
- মিক্সড (পুরুষ-মহিলা একসাথে) সাঁতার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- নামাজের সময়সূচি মানা।
সমস্যা:
যদি মিক্সড সুইমিং হয় বা মহিলারা পর্দা ছাড়া সাঁতার কাটে, তবে তা হারাম হবে এবং এমন ব্যবসা চালানো জায়েজ হবে না। কারণ এটি সরাসরি শরীয়তবিরোধী কাজে সহায়তা।
সমাধান:
- পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ (যেমন: সকালে মহিলা, বিকেলে পুরুষ)।
- মহিলাদের জন্য সম্পূর্ণ আবদ্ধ ও পর্দাযুক্ত ব্যবস্থা।
- সাঁতারের পোশাকের ব্যাপারে কঠোর নিয়ম।
- মিক্সড সাঁতার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ফতোয়ার ভিত্তি:
«وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ»
“মুমিন নারীদের বলো, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে, লজ্জাস্থান হেফাজত করবে এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না।” (সূরা নূর: ৩১)
«الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ»
“নারী হলো সতর (গোপনীয়)।” (তিরমিজি, হাদিস: ১১৭৩)
ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. বলেন:
«لا تجوز الإجارة للحمام إذا كان مختلطاً»
“মিক্সড হাম্মামের ভাড়া জায়েজ নয়।” (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪০)
৩. সাধারণ শর্তাবলি
আপনাদের ব্যবসায় নিম্নলিখিত শর্তগুলো অবশ্যই পালন করতে হবে:
- হালাল উপার্জন: ভাড়ার টাকা হালাল হতে হবে; কোনো জুয়া, বাজি বা হারাম কাজের সাথে সম্পৃক্ততা থাকা যাবে না।
- নামাজের ব্যবস্থা: মাঠ ও পুলের কাছে নামাজের জায়গা বা মসজিদের ব্যবস্থা রাখা।
- পর্দা: পুরুষ-মহিলার সম্পূর্ণ পৃথক ব্যবস্থা।
- সতর: খেলোয়াড় ও সাঁতারুদের সতর ঢাকার নিশ্চয়তা।
- চুক্তি: ভাড়ার চুক্তি স্পষ্ট ও লিখিত হওয়া উত্তম, যাতে পরবর্তীতে বিবাদ না হয়।
- কর/ট্যাক্স: সরকারি নিয়ম মানা, কারণ শরীয়তেও ন্যায্য নিয়ম মানা আবশ্যক।
- কর্মচারী: কর্মচারীদের সাথে সদাচরণ ও তাদের হক আদায়।
- পরিবেশ: আশপাশের মানুষের ক্ষতি না করা।
৪. সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত ফতোয়া
- ফুটবল টার্ফ মাঠ ভাড়া দেওয়া: জায়েজ, তবে শর্ত হলো—শরীয়তবিরোধী কাজ (জুয়া, পর্দা লঙ্ঘন, নামাজ ত্যাগ) না হতে দেওয়া। শুধু পুরুষদের জন্য বা শুধু মহিলাদের জন্য পৃথক সময় নির্ধারণ করলে এবং নামাজের সময় বিরতি দিলে এটি জায়েজ হবে।
- সুইমিং পুল ভাড়া দেওয়া: জায়েজ, তবে শর্ত হলো—পুরুষ ও মহিলার সম্পূর্ণ পৃথক ব্যবস্থা, পর্দা রক্ষা, সতর ঢাকা, মিক্সড সাঁতার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই শর্তগুলো মানলে ব্যবসা হালাল; অন্যথায় হারাম।
- মিক্সড (পুরুষ-মহিলা একসাথে) ফুটবল বা সাঁতার: সম্পূর্ণ হারাম এবং এমন ব্যবসা চালানো জায়েজ নয়।
উপদেশ:
আপনারা দ্বীনের প্রতি আন্তরিক, আলহামদুলিল্লাহ। ব্যবসার পাশাপাশি দ্বীনি বিধান মেনে চললে ইনশাআল্লাহ এই ব্যবসা হালাল ও বরকতময় হবে। মহান আল্লাহ আপনাদের প্রচেষ্টায় বরকত দান করুন। আমিন।
আরও জানতে:
- ফতোয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪২১-৪২৫ (ব্যবসা ও ইজারা অধ্যায়)
- ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৮৭
- ফতোয়া আলমগিরি, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৫০ (ইজারা অধ্যায়)
- বাহিশতী জেওর, ব্যবসা অধ্যায়
والله أعلم بالصواب
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।