মহিলাদের চাকরি করা কি জায়েজ? পিতা-মাতার ঋণ পরিশোধে সন্তানের দায়িত্ব কী?
Business and Job · Hanafi
Question
আমি একজন মেয়ে সিএসই নিয়ে অনার্স শেষ করেছি।।আমাকে এই অনার্স পর্যন্ত পড়ানোর জন্য আমার মা বাবার লাখ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল +আমাকে বিয়ে দিয়েছে সেখানেই ২-৩ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় ১.৫+ বছর। আমি বিয়ের আগেই দীনে ফিরি।।যার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সরকারি চাকরি বা কোনো চাকরি করবো না। কিন্তু কয়েকমাস হলো জানতে পারি আমার বাবা প্রায় ১৫-১৬ লাখ টাকা ঋন করে ফেলছে।।আমার একটা ভাই আছে বাট ১৪ গ্রেড এর একটা চাকরি করে ভাইয়ার এখনো বিয়েই হয় নাই বাবার এইসব ঋন শোধ করতে গিয়ে ভাইয়া আরও খিটখিটে মেজাজের হয়ে যাচ্ছে মা,বাবার সাথে খারাপ ব্যবহারও করছে, অন্য দিকে বিয়ে করতে মেয়ে কে সর্ন,কাবিনের টাকা দেওয়ার টেনশনে বিয়েও করতে চাচ্ছে না অথচ ভাইয়ার বয়স ৩১+।।আগে থেকেই আমার মা বাবার অনেক স্বপ্ন ছিলো আমার মা বাবাকে আর কোনো সন্তান দেখুক আর না দেখুক আমি দেখবো,চাকরি করে তাদের সাহায্য করবো টাকা দিয়ে। কিন্তু আমার মা বাবার এই বিপদে আমি একটা টাকা দিয়েও সাহায্য করতে পারি না কারন আমার নিজের স্বামীরও ইনকাম কম যেটা আমাদেরই লাগে বরং আরও মা বাবাই মাঝে মাঝে বাবুকে এটা ওটা কিনে দেয়।।এখন তাই আমি মা বাবার চিন্তা করে চাকরি করতে চাইলে এটা কি জায়েজ হবে?যদি কোনো মহিলা কলেজ বা স্কুল বা প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করি এটা কি জায়েজ হবে?
২.আমি ফ্রিল্যান্সিং শিখছি ডিজিটাল মার্কেটিং এর উপর।।কিন্তু এখন বেশিরভাগ ক্লায়েন্টদের ব্যবসা তেই দেখা যায় তারা বেপর্দা মেয়েদের ছবি বা ভিডিও দিয়ে এড চালায় বা ওয়েবসাইটে মেয়েদের ছবি দিয়ে রাখে।। এখন আমি কাজ শিখেছি গুগলে বা ফেসবুকে মানুষের ব্যবসার এড রান করানো বা সেল এনে দেওয়ার উপর।।।যেহেতু আমি নিজে ছবি দিয়ে ব্যবসা করছি না তাহলে অন্যের ব্যবসার জন্য কি এড রান করালে আমার পাপ হবে যদি ওদের ওয়েবসাইটের জন্য কাজ করি?
৩.আবার যদি নারীদের ব্যবসার টা বাদ দিয়ে কোনো কাজ খুঁজি যেমন অনলাইন মাদরাসা বা আইটি প্রতিষ্ঠান তো এদের বেশিরভাগ মালিক থাকে পুরুষ তাই এদের থেকে কাজ নিলে মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলতে চাইলে কথা বলা কি জায়েজ হবে?
এইসব কিছু বিবেচনা করে আমাকে একটা মাসয়ালা দিলে অনেক উপকার হতো।।
মা বাবার জন্য অনেক কষ্ট হয় +পরিবারের মানুষ গুলোও অনেক কষ্ট দিয়ে কথা বলে যে তাদের বিপদে সার্থপরের মতো হাসবেন্ড এর কথা মতো চলি নিজে কোনো কাজ করার চিন্তা করি না।। তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করি না।।
Answer
উত্তর: পিতা-মাতার ঋণ পরিশোধে সহায়তা, মহিলার চাকরি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিধান
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। আপনি পিতা-মাতার কষ্ট দেখে তাদের সাহায্যের চিন্তা করছেন—এটি আপনার দ্বীনদারি ও সন্তানসুলভ দায়িত্ববোধের পরিচায়ক। আল্লাহ তাআলা আপনার নিয়তকে কবুল করুন। নিচে কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে ধাপে ধাপে উত্তর দিচ্ছি।
প্রথম বিষয়: মহিলার চাকরি করা ও পিতা-মাতাকে সাহায্য করা
প্রশ্নে উল্লেখিত ছুরতে আপনি যদি কোনো মহিলা কলেজ বা স্কুল বা প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করেন, এটা জায়েজ হবে। এক্ষেত্রে গায়রে মাহরাম পুরুষ দের সামনে পূর্ণ পর্দা মেইনটেইন করে চলবেন।
১. ইসলামে মহিলার চাকরির মূল বিধান
ইসলামে নারীর জন্য বাইরে চাকরি করা মূলত নিষিদ্ধ নয়, তবে শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত। শর্তগুলো হলো:
- পূর্ণ পর্দা ও হিজাব রক্ষা করা (মুখ-হাতসহ শরীর ঢাকা, দৃষ্টি সংযত)।
- পুরুষ-নারী অবাধ মেলামেশা (খালওয়া/মিক্সিং) থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।
- স্বামীর অনুমতি থাকা (কারণ স্বামীর ঘরই তার প্রথম দায়িত্ব)।
- চাকরির পরিবেশ শরিয়তসম্মত হওয়া।
- সন্তান-পরিবারের হক নষ্ট না হওয়া।
দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ "তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং পূর্ব জাহেলিয়াতের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।" (সূরা আহযাব: ৩৩)
তবে প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার অনুমতি রয়েছে—সাহাবিয়ারা (যেমন উম্মে আতিয়্যা, রুবাইয়্যা বিনতে মুআওয়ায রা.) বিভিন্ন কাজে বাইরে যেতেন।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"المرأة إذا خرجت لحاجة شرعية كتعلم علم أو عمل ضروري مع الستر التام يجوز" "নারীর শরিয়তসম্মত প্রয়োজন যেমন দ্বীনি ইলম শিক্ষা বা প্রয়োজনীয় কাজে পূর্ণ পর্দাসহ বের হওয়া জায়েজ।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৭)
২. পিতা-মাতার ঋণ পরিশোধে সাহায্য করা
পিতা-মাতার ঋণ পরিশোধে সন্তানের সাহায্য করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ, তবে এটি ফরজ নয়—বরং নফল/ঐচ্ছিক সদকা। কারণ সন্তানের সম্পদে পিতা-মাতার বাধ্যতামূলক হক শুধু তখনই থাকে যখন সন্তান সচ্ছল এবং পিতা-মাতা অভাবী হন।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
«أَنْتَ وَمَالُكَ لِأَبِيكَ» "তুমি এবং তোমার সম্পদ তোমার পিতার।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৯১)
তবে হানাফি ফিকহে এই হাদিসের ব্যাখ্যা হলো—পিতা-মাতা অভাবী হলে সন্তান সচ্ছল অবস্থায় তাদের ভরণপোষণ দেবে। কিন্তু সন্তান নিজে অভাবী হলে বাধ্যতামূলক নয়।
ইমাম তাহতাবি ও ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"يجب على الولد الموسر نفقة والديه الفقيرين، ولا يجب على المعسر" "সচ্ছল সন্তানের উপর অভাবী পিতা-মাতার ভরণপোষণ ওয়াজিব, কিন্তু অসচ্ছল সন্তানের উপর নয়।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২২১)
৩. আপনার ক্ষেত্রে সমাধান
আপনার স্বামীর আয় কম, আপনি নিজে অসচ্ছল। তাই আপনার উপর পিতা-মাতার ঋণ পরিশোধ ফরজ নয়। তবে আপনি যদি স্বামীর অনুমতি নিয়ে, পূর্ণ পর্দা রক্ষা করে, শরিয়তসম্মত পরিবেশে চাকরি করেন এবং আয়ের কিছু অংশ পিতা-মাতাকে দেন—তবে এটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং জায়েজ।
শর্তাবলি:
- স্বামীর স্পষ্ট অনুমতি।
- পূর্ণ পর্দা (নিকাবসহ)।
- পুরুষ সহকর্মীদের সাথে অবাধ মেলামেশা না করা।
- প্রয়োজনে কথা বললে সংক্ষিপ্ত, ভদ্র ও শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে।
- ঘরের দায়িত্ব ও স্বামীর হক আদায় করা।
মহিলা কলেজ/স্কুল/প্রাইমারি স্কুলে চাকরি: যদি উপরের শর্তগুলো রক্ষা হয়, তবে জায়েজ। তবে সর্বোত্তম হলো মহিলাদের প্রতিষ্ঠান বা অনলাইন মাদরাসা যেখানে পর্দার পরিবেশ বেশি।
ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) থেকে বর্ণিত:
"المرأة إذا عملت في بيتها أو في مكان مستور مع عدم الخلوة بالأجانب فلا بأس" "নারী যদি ঘরে বা পর্দার স্থানে কাজ করে এবং পরপুরুষের সাথে নির্জনতা না হয়, তবে অসুবিধা নেই।" (আল-আসার, পৃ. ১৪২)
দ্বিতীয় বিষয়: ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল মার্কেটিং—বেপর্দা ছবি/ভিডিও ব্যবহারের বিধান
১. মূল নীতি: গুনাহের কাজে সহায়তা করা হারাম
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "তোমরা নেকি ও তাকওয়ায় পরস্পরকে সাহায্য করো, কিন্তু গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে সাহায্য করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
«مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ» "যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের দিশা দেয়, সে কাজটি সম্পাদনকারীর সমান সওয়াব পায়।" (সহিহ মুসলিম: ১৮৯৩)
আর গুনাহের ক্ষেত্রে উল্টো—যে গুনাহের কাজে সহায়তা করে, সে গুনাহগার হয়।
২. আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর
যদি ক্লায়েন্টের ওয়েবসাইট/বিজ্ঞাপনে বেপর্দা নারীর ছবি বা ভিডিও থাকে এবং আপনি সেই কনটেন্ট ব্যবহার করে এড রান করেন বা সেল আনার কাজ করেন—তবে:
- আপনি সরাসরি ছবি আপলোড না করলেও, যদি আপনি সেই বিজ্ঞাপন প্রচার, সেল বৃদ্ধি বা কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে সহায়তা করেন—তবে এটি গুনাহের কাজে সহায়তা হিসেবে গণ্য হবে।
- কারণ আপনার কাজের মাধ্যমেই সেই হারাম কনটেন্ট আরও মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং ব্যবসা বাড়বে।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"الإعانة على الحرام حرام، سواء كانت مباشرة أو بالتسبب" "হারাম কাজে সহায়তা করা হারাম—সরাসরি হোক বা পরোক্ষভাবে।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯১)
ফতোয়ায়ে উসমানি (খণ্ড ৩, পৃ. ৪২১) -এ বলা হয়েছে:
"বেপর্দা ছবি/ভিডিও ব্যবহার করে ব্যবসা প্রচার করা বা তা প্রচারে সহায়তা করা জায়েজ নয়।"
৩. সমাধান
- যেসব ক্লায়েন্ট বেপর্দা ছবি/ভিডিও ব্যবহার করে না—শুধু তাদের কাজ করুন।
- যেসব ক্লায়েন্ট হারাম কনটেন্ট ব্যবহার করে—তাদের কাজ ছেড়ে দিন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা তালাক: ২)
- বিকল্প: শুধু টেক্সট-ভিত্তিক এড, এসইও, কনটেন্ট রাইটিং, ইমেইল মার্কেটিং—এসব কাজ করুন যেখানে ছবি/ভিডিওর প্রয়োজন নেই বা হালাল ছবি ব্যবহার হয়।
তৃতীয় বিষয়: পুরুষ মালিকের সাথে ফোনে কথা বলা
১. মূল নীতি
নারীর জন্য পরপুরুষের সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলা জায়েজ নয়। তবে প্রয়োজনীয় কথা (যেমন কাজের বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা) শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে জায়েজ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ "তোমরা কোমল স্বরে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে রোগ আছে সে লোভ না করে।" (সূরা আহযাব: ৩২)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
«الْحَيَاءُ مِنَ الْإِيمَانِ» "লজ্জা ঈমানের অংশ।" (সহিহ বুখারি: ২৪)
২. শর্তসহ অনুমতি
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"يجوز كلام المرأة مع الأجنبي عند الحاجة بقدر الضرورة، بشرط عدم الخضوع بالقول وعدم الخلوة" "প্রয়োজনে পরপুরুষের সাথে নারীর কথা বলা জায়েজ—ততটুকু যা প্রয়োজন, শর্ত হলো কোমল স্বরে না বলা এবং নির্জনতা না হওয়া।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৯)
ফতোয়ায়ে আলমগিরি (খণ্ড ৫, পৃ. ৩২৮):
"إذا احتاجت المرأة إلى مخاطبة الرجل الأجنبي في أمر ديني أو دنيوي ضروري، تتكلم بلا خضوع ولا خلوة"
৩. আপনার ক্ষেত্রে
- অনলাইন মাদরাসা বা আইটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে মালিক পুরুষ হলে—
- কাজের প্রয়োজনে সংক্ষিপ্ত, ভদ্র, পেশাদার কথা বলা জায়েজ।
- তবে অপ্রয়োজনীয় গল্প, হাসি-ঠাট্টা, কোমল স্বর নিষিদ্ধ।
- সম্ভব হলে ইমেইল/মেসেজে যোগাযোগ করুন, ফোনে কথা কমান।
- নির্জনতা (খালওয়া) এড়িয়ে চলুন—অর্থাৎ এমনভাবে কথা বলুন যেখানে অন্য কেউ সেখানে উপস্থিত থাকে।
- ** কথা না বলে টেক্সট** করা উত্তম।