স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রহার বিষয়ক।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
কিছুদিন আগে উনার বোন হাস্পাতালে ভর্তি ছিলো আমি নিয়মিত খোজ নিয়েছি, দেখতেও গিয়েছি খাবার নিয়ে। এখন আমার বোন হাস্পাতালে ভর্তি আমি উনাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম (আমার বোনের প্রতি কোন রাগ নেই)। কিন্তু যাবেনা আমি একাই যাওয়ার জন্য বের হই তাকে জিজ্ঞেস করেই। কিন্তু কিছু নিতে চাইলে আমাকে অনেক কম টাকা দেয়। আমি বললাম তোমার বিবেকে কি বলেনা আমার বোনের জন্য কিছু নেয়ার জন্য টাকা দিতে? তোমার বোনের বেলায় তো আমি দেখতে গেসি, ছিলাম সারাদিন। তখনই আমাকে সে এমন জোরে মারে যে চশ্মা ভেংগে যায় আর চোখে অনেক আঘাত লাগে। টানা কয়েকটা থাপ্পড় দেয়। আমিও রেগে বলেছি আমার ফ্যামিলি নিয়ে আমি কিছু করতে চাইলেই এমন মারধর করো তোমার ফ্যামিলির বেলায় আমি সব করতাম এটা কোন নিয়ম? তখন সে আমাকে আরও মারে, যে আমি নাকি পরদা করার ভং ধরি আমি আসলে মাগী, পতিতা। আমার বাপ নামাজ পরেনা হলুদ গেঞ্জি পরে ঘুরে কি শিক্ষা আসে চামারের জানা আছে। আমার শিক্ষার অভাব। আমিও বলেছি যে তোমার মাও তোমাকে শিক্ষা দিতে পারেনাই এজন্য এমনে বউকে মারো এমন ব্যবহার করো। ছেলে আমার কোলে ছিলো সেও অনেক কান্নাকাটি করতেছিলো আমাকে আরও মারতে আসলে আমিও চর থাপ্পড় দিয়ে দেই এরপর রেগে আমাকে গলায় অনেকবার চেপে ধরে ছেলের কান্নার জন্য ছেড়ে দেয়। আমি চলে যেতে চাইলে ছেলেকে রেখে দেয় আমাকে বের করে দেয় তখন পাশের বাসস্র লোকেরা বের হলে। আমি তাদের বলি আমাকে মারছে। তখন ঘরে এনে আমার তলপেটে ঘুষি দেয়। আর শান্ত হতে বলে। আমার এক বছরের ছেলেটা কান্না করেই যাচ্ছিলো ভয়ে। এভাবে আরও আগের কথা সব টেনে আনে। আমিও অনেক কথা বলি। তার গায়েও হাত লাগে আমাকে সে মাত্রাতিরিক্ত মারে এবং বলে আমার ইমান নাই সব অভিনয় আমি নাকি পারলে রাসুল(স.) কেও গালি দিতাম কিন্তু ভং ধরার কারণে পারিনা। আমার বাবাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। আমিও বলেছি আমার বাবাকে যা বলেছো তোমার বাবাও তাই। সে নিজেই নিজের মা সম্পর্কে খারাপ কথা বলে আমাকে বলে আমি বলেছি।পরবর্তী তে অনেক মারের কারণে আমি অজ্ঞান হয়ে যেতে লাগলে মাথায় পানি দেয় আর শুইয়ে দেয় বাবুকে রাখে। এরপর বাবুর জন্য আমিচুপ করে যাই। আমার ছেলেকেও নাকি দিবেনা আমাকে বের করে দিবে আমি চাইলে।
১। আমার সম্পর্কে যেই অপবাদ দিচ্ছে আমার ইমান নেই, রাসুল(স.) কে নিয়ে বলছে, খারাপ ভাষায় গালি দিচ্ছে তাতে তার কি কোন গুনাহ হবেনা?
২। আমার বাবা ও পরিবার সম্পর্কে কি আমার কোন রাইট নাই কথা বলার? তাদের কে এত খারাপ কথা বল্লেও কি প্রতিবাদ করতে পারবোনা?
৩।আমি যে তার গায়ে হাত তুলছি গুনাহ হবে? সে যেভাবে তুলছে তার গুনাহ হবেনা? আমার বেয়াদবির জন্য নাকি তুলছে। তার নাকি কোন অনুশোচনাও নেই।সারা শরীরে দাগ ফেলে দিসে আমি নরতেও পারছিনা।
৪।আমার কি আমার পরিবার কে জানানো উচিত? নাকি আরও ধইরজ ধরা উচিত? আগেও এমন করেছে শশুর বাড়িতে ইদের দিন আমাকে মেরেছে।
৫।আমার পরিবার কে জানালে তারা তালাকের দিকে যাবে শিউর। আমি কি আমার ছেলেকে হারিয়ে ফেলবো যদি তালাক হয়? আমি তাকে ছাড়া থাকতে পারবোনা।(বয়স ১বছর, সবসময় সাথে রাখতে চাই)
৬।তার পরিবার এর প্রতি আমার সব দায়িত্ব পালন করতে হবে না করলে গুনাহ হবে? আমার পরিবার এর প্রতি ১% ও ইসলাম বলেনা সদয় হতে দায়িত্ব পালন করতে?
৭।সব ঘটনার প্রেক্ষিতে আমাকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করবেন। কারো সাথে শেয়ার করতে পারছিনা।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
উত্তর:
আপনার বর্ণিত ঘটনা অত্যন্ত শোচনীয়। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, সম্মান ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার নির্দেশ দেয়। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, গালিগালাজ, ও অপবাদ দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে দেওয়া হলো।
১. আপনার সম্পর্কে অপবাদ, রাসূল (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি ও গালিগালাজের গুনাহ
উত্তর:
আপনার স্বামী আপনাকে ‘মাগী, পতিতা’ বলা, ‘ইমান নেই’ বলা, এবং রাসূল (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি করা—এগুলো সবই জঘন্য গুনাহ।
- অপবাদ (বুহতান) কুরআনে কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য। আল্লাহ বলেন:
“যারা মুমিন নারী-পুরুষকে এমন কিছুতে অপবাদ দেয় যা তারা করেনি, তারা নিজেরাই অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।” (সূরা আল-আহযাব: ৫৮)
- রাসূল (সা.)-কে গালি দেওয়া কুফরি পর্যায়ের অপরাধ। হাদিসে এসেছে:
“যে ব্যক্তি আমাকে গালি দেয়, সে যেন আল্লাহকে গালি দিল।” (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯২৩)
- গালিগালাজ করা হারাম। রাসূল (সা.) বলেছেন:
“মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসিকি, আর তাকে হত্যা করা কুফরি।” (বুখারি, হাদিস: ৪৮)
সারসংক্ষেপ: আপনার স্বামী এ সকল কাজের মাধ্যমে নিজেকে গুনাহের স্তূপে নিক্ষেপ করছে। তার তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা জরুরি।
২. আপনার বাবা ও পরিবার সম্পর্কে প্রতিবাদ করার অধিকার
উত্তর:
হ্যাঁ, আপনার পূর্ণ অধিকার আছে। ইসলাম সন্তানকে পিতা-মাতার সম্মান ও প্রতিরক্ষার নির্দেশ দেয়।
- আল্লাহ বলেন:
“তাদেরকে (পিতা-মাতাকে) ‘উহ’ বলো না, তাদের ধমক দিও না, বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।” (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
- আপনার স্বামী আপনার বাবাকে গালিগালাজ করলে আপনি শান্তভাবে প্রতিবাদ করতে পারেন এবং তাকে ইসলামি আদব স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন। তবে অপমানজনক পাল্টা গালি দেওয়া ঠিক নয়। রাসূল (সা.) বলেছেন:
“দু’জন ব্যক্তি যখন পরস্পরকে গালি দেয়, তখন শুরুকারীর ওপর গুনাহ বর্তায়, যতক্ষণ না অত্যাচারিত ব্যক্তি সীমা লঙ্ঘন করে।” (মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৭)
- আপনার অবস্থায় নিজেকে ও আপনার পরিবারকে রক্ষা করা আপনার দায়িত্ব। আপনি চুপ থাকতে বাধ্য নন।
৩. আপনি তার গায়ে হাত তুললে গুনাহ – তার গুনাহের তুলনায়
উত্তর:
- আপনার গুনাহ: আপনি যদি আত্মরক্ষার্থে বা প্রতিশোধ হিসেবে তাকে আঘাত করেন, তবে তা জায়েয নয়, কারণ ইসলাম ধৈর্য ও ক্ষমার নির্দেশ দেয়। তবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আপনি যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে তাকে আঘাত করেন, তবে তা গুনাহ হবে না, কিন্তু উত্তম হলো সাহস করে পরিস্থিতি থেকে সরে আসা। আল্লাহ বলেন:
“যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪)
- তার গুনাহ: আপনার স্বামী যে মাত্রাতিরিক্ত মারধর করেছে, চশমা ভেঙেছে, গলা টিপে ধরেছে, তা হারাম ও কবিরা গুনাহ। হাদিসে এসেছে:
“তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীকে চাকরের মতো প্রহার না করে, আর দিনের শেষে তার সাথে সহবাস করে।” (বুখারি, হাদিস: ৫২০৪)
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: “স্বামীর জন্য স্ত্রীকে প্রহার করা শুধুমাত্র বিবাহিত দায়িত্বে অবহেলা (যেমন: বিছানা ত্যাগ) ক্ষেত্রে অনুমোদিত, তবে তা অত্যন্ত মৃদু হতে হবে এবং মুখে আঘাত করা হারাম।” (রাদ্দুল মুহতার, ৩/৫৭)
সারসংক্ষেপ: আপনার স্বামীর গুনাহ অনেক বেশি, তবে আপনারও উচিত আইন ও ইসলামি পদ্ধতিতে প্রতিকার চাওয়া, হাত তোলা নয়।
৪. পরিবারকে জানানো উচিত নাকি ধৈর্য ধরা?
উত্তর:
আপনার পরিবারকে জানানো আপনার ইসলামি অধিকার। আপনি একা এতবড় নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য নন।
- রাসূল (সা.) বলেছেন:
“মুসলিমকে নিজের ক্ষতি করা বা অন্যের ক্ষতি করার অনুমতি নেই।” (ইবনে মাজা, হাদিস: ২৩৪০)
- ধৈর্য ধরার অর্থ নির্যাতন সহ্য করা নয়। বরং ধৈর্য হলো আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং প্রয়োজনে সাহায্য নেওয়া।
- যেহেতু তিনি আগেও ইদের দিন মারধর করেছেন, এটি প্যাটার্ন নির্দেশ করে। আপনি পরিবারকে জানান এবং তাদের সহায়তা নিন। এটি আপনার শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তার জন্য জরুরি।
৫. তালাক হলে ছেলেকে হারানোর ঝুঁকি
উত্তর:
- হানাফি ফিকহ অনুসারে, মায়ের জিম্মায় (হেফাজতে) শিশু থাকে সন্তান স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত।
- ছেলের ক্ষেত্রে: ৭ বছর পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকবে।
- মেয়ের ক্ষেত্রে: বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকবে।
(রাদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪২)
- আপনার ছেলের বয়স ১ বছর। মা হলে আপনি প্রাথমিক হেফাজতের অধিকারী। তবে তালাকের পর যদি আপনি পুনরায় বিয়ে না করেন, তবে আপনার কাছেই থাকবে।
- শর্ত: আপনাকে ইসলামি নিয়মে সন্তান লালন-পালনের যোগ্য প্রমাণিত হতে হবে।
পরামর্শ: আপনার পরিবারকে জানিয়ে আইনি ও পারিবারিক সালিশের মাধ্যমে তালাকের প্রক্রিয়া শুরু করলে আপনি ছেলের কাস্টডি পেতে পারেন। পুলিশ বা আইনজীবীর সাহায্যও নিতে পারেন।
৬. তার পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন – আপনার পরিবারের প্রতি তার কর্তব্য
উত্তর:
- তার পরিবারের প্রতি আপনার দায়িত্ব: ইসলাম স্ত্রীকে স্বামীর পরিবারের প্রতি মৌলিক সেবা (যেমন অসুস্থ হলে খোঁজখবর) করতে উৎসাহিত করে, তবে এটি ফরজ নয়। তবে শর্ত হলো নির্যাতনের পরিস্থিতিতে তা আবশ্যক নয়।
- ফাতাওয়া শামীতে বলা হয়েছে: “স্ত্রী স্বামীর আত্মীয়দের সেবা করতে বাধ্য নয়, তবে উত্তম হলো পারস্পরিক সদাচার।” (রাদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫৯)
- আপনার পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ব: স্বামীর জন্য ফরজ হলো স্ত্রীর পরিবারের সাথে সদয় আচরণ করা। রাসূল (সা.) বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।” (তিরমিজি, হাদিস: ৩৯৫)
সারসংক্ষেপ: তিনি যেহেতু আপনার পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করেন না, আপনি তার পরিবারের প্রতি অতিরিক্ত কিছু করতে বাধ্য নন। তবে হক হলো শুধু দ্রুত কোনো প্রয়োজনে সাহায্য করা (যেমন জীবনরক্ষা)।
৭. সামগ্রিক পরামর্শ
আপনার করণীয়:
১. প্রথমে নিরাপত্তা: নিজের ও ছেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। আপনি যদি এখনই বাড়ি ছাড়তে চান, তবে স্থানীয় মেয়েদের হেল্পলাইন (জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯) অথবা আইনজীবীর সাহায্য নিন।
২. পরিবারকে জানান: আপনার জীবন ও সম্মান রক্ষার জন্য এটি জরুরি। তারা আপনার পাশে দাঁড়াবে।
৩. সালিশের চেষ্টা: ইসলামি পদ্ধতি অনুযায়ী উভয় পরিবারের সালিস (মধ্যস্থতা) করুন। কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
“তাদের (স্বামী-স্ত্রীর) মধ্যে মীমাংসার জন্য একজন সালিস স্বামীর পরিবার থেকে এবং একজন স্ত্রীর পরিবার থেকে নিয়ে এসো।” (সূরা নিসা: ৪:৩৫)
৪. তালাকের প্রস্তুতি: যদি শর্ত পূরণ না হয় এবং মারধর বন্ধ না হয়, তবে তালাকই সর্বোত্তম পথ। মনে রাখবেন, আল্লাহর কাছে অপমানজনক জীবন যাপন করার চেয়ে সম্মানজনক বিচ্ছেদ উত্তম।
৫. সন্তানের জন্য দোয়া: ছেলে আপনার কাছে থাকবে ইনশাআল্লাহ। আপনি একজন মা হিসেবে তার হেফাজতের অধিকারী।
আপনার প্রতি সহানুভূতি:
আপনি অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। আল্লাহ আপনার ধৈর্যের বিনিময়ে উত্তম প্রতিদান দিন। তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবেন না। আপনার সম্মান ও জীবন ইসলামে অত্যন্ত মূল্যবান।
আল্লাহ তায়ালা আপনাকে শক্তি দিন। আমিন।