সাধারণ প্রভিডেন্ট ফান্ড এর মুনাফা পদ্ধতি
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
প্রভিডেন্ট ফান্ডের মুনাফা পদ্ধতি: ইসলামিক শরিয়াহ বনাম সাধারণ পদ্ধতি
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনার সরকারি প্রতিষ্ঠান বাধ্যতামূলকভাবে বেতনের ন্যূনতম ১০% প্রভিডেন্ট ফান্ডে কেটে রাখে। এখন আপনি জানতে চান—প্রভিডেন্ট ফান্ডের মুনাফা পদ্ধতি হিসেবে ইসলামিক শরিয়াহ পদ্ধতি সিলেক্ট করা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক কি না, যদিও বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকই সম্পূর্ণ শরিয়াহ মোতাবেক চলে না বলে আপনি শুনেছেন।
মূল বিষয়সমূহের বিশ্লেষণ
আপনার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে 'ইসলামিক শরীয়াহ' পদ্ধতি নির্বাচন করা এবং প্রচলিত সুদি বা সাধারণ পদ্ধতি বর্জন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে আবশ্যক বা বাধ্যতামূলক।
হানাফী ফিকহ ও ফতোয়ার নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে আপনার প্রশ্নের বিস্তারিত শরয়ী বিশ্লেষণ নিচে পেশ করা হলো:
১. প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকার শরয়ী প্রকৃতি:
প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা মূলত কর্মচারীর পক্ষ থেকে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট একটি পাওনা বা ঋণ (দাইন) হিসেবে থাকে। আপনি যেহেতু বাধ্যতামূলকভাবে ১০% কর্তনের অধীনে আছেন, সেহেতু এই কর্তিত অর্থ এবং এর ওপর সরকার বা প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত অতিরিক্ত অংশ (মুনাফা বা সুদ নাম দিয়ে যা-ই হোক) আপনার জন্য গ্রহণ করা মৌলিকভাবে জায়েয। কারণ, এই টাকা আপনার হস্তগত হওয়ার পূর্বে শরীয়তের দৃষ্টিতে তা আপনার নিরঙ্কুশ মালিকানায় আসে না, ফলে এর ওপর আসা বাড়তি অংশকে সরাসরি 'সুদ' বলা হয় না ।
২. মুনাফা পদ্ধতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনার দায়িত্ব:
আপনার বর্ণনামতে, মুনাফা প্রদানের পদ্ধতি (শরীয়াহ/সাধারণ) নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনার 'ইখতিয়ার' বা পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। শরীয়তের মূলনীতি হলো—যেখানে মানুষের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে, সেখানে হারামের লেশমাত্র আছে এমন পথ পরিহার করে হালাল বা সন্দেহমুক্ত পথ অবলম্বন করা ওয়াজিব।
- সাধারণ পদ্ধতি বর্জনের কারণ: আপনি যদি নিজে 'সাধারণ পদ্ধতি' বা সুদি ব্যাংক নির্বাচন করেন, তবে আপনি জেনে-শুনে আপনার প্রাপ্য অর্থকে একটি সুদি চুক্তির (Interest-based Contract) অন্তর্ভুক্ত করার অনুমতি দিচ্ছেন। আপনার এই সম্মতির কারণে ঐ অতিরিক্ত অর্থ তখন আপনার জন্য সুদ হিসেবে গণ্য হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হবে।
- শরীয়াহ পদ্ধতি নির্বাচনের আবশ্যকতা: বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো শতভাগ শরীয়াহ অনুযায়ী চলে না বলে আপনার যে সংশয়, তা সত্ত্বেও যেখানে 'সাধারণ' সুদি পদ্ধতি এবং 'শরীয়াহ' পদ্ধতির মধ্যে নির্বাচনের সুযোগ আছে, সেখানে শরীয়াহ পদ্ধতি নির্বাচন করাই শরীয়তের অকাট্য নির্দেশ। কারণ, শরীয়াহ ভিত্তিক অ্যাকাউন্টগুলো অন্তত বাহ্যিকভাবে এবং চুক্তির দিক থেকে সুদমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে, যা সাধারণ সুদি অ্যাকাউন্টের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ ও তাকওয়াসম্মত ।
৩. ফিকহী সিদ্ধান্ত:
দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড)-এ প্রভিডেন্ট ফান্ডের মাসআলায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যে অংশে কর্মচারীর ইখতিয়ার বা স্বাধীনতা নেই, তার মুনাফা গ্রহণ করা জায়েয হলেও যেখানে কর্মচারীর ইখতিয়ার বা সিদ্ধান্তের সুযোগ থাকে, সেখানে সুদের সাদৃশ্য আছে এমন পদ্ধতি বর্জন করা উচিত। যদি কেউ স্বেচ্ছায় সুদি পদ্ধতি নির্বাচন করে, তবে তার ওপর সুদের নামে প্রাপ্ত টাকা সরাসরি সুদ হিসেবেই বিবেচিত হবে এবং তা গ্রহণ করা জায়েয হবে না।
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ:
১. আপনার প্রভিডেন্ট ফান্ডের মুনাফা পদ্ধতি হিসেবে অবশ্যই 'ইসলামিক শরীয়াহ পদ্ধতি' সিলেক্ট করতে হবে। ২. ব্যাংক পুরোপুরি শরীয়াহসম্মত কি না—সেই সংশয়ের চেয়ে আপনার নিজের 'সুদি পদ্ধতি' নির্বাচন না করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শরীয়াহ পদ্ধতি নির্বাচন করলে আপনি সুদি চুক্তিতে সরাসরি অংশগ্রহণের গুনাহ থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন।
সূত্র (কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর):
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা ১৭৩-১৭৬ (প্রভিডেন্ট ফান্ডের শর’য়ী বিধান ও যাকাত প্রসঙ্গ অধ্যায়)।
- ফাতাওয়ায়ে রহীমিয়া: ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫২ (ঐচ্ছিক প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুদের হুকুম)।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুদ থেকে বাঁচিয়ে হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন।