হারাম -হালাল সম্পর্কে

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5173
Questioner: Shezan Ahmmed
Question Asked: 09 Sep 2026, 08:03 AM
Reviewed & Published: 09 Sep 2026, 11:06 AM
Views: 43
Tokens: 4,270
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বর্তমান যুগে বেশিরভাগ যুবকই উন্নত জীবন ও বেশি আয়ের লক্ষ্যে ইউরোপ আমেরিকাসহ বিভিন্ন অমুসলিম দেশে যায়,ও অনেকাংশেই সেটেল্ড হয়,অনেক ওলামায়ে কেরামগণ এটাকে হারাম/উচিৎ নয় বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন,এটা কতটুকু সঠিক?

Answer

অমুসলিম দেশে যাওয়া ও সেটেলড হওয়ার বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

বর্তমান যুগে অনেক যুবক উন্নত জীবন ও বেশি আয়ের লক্ষ্যে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন অমুসলিম দেশে যায় এবং অনেকেই সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। অনেক ওলামায়ে কেরাম এটাকে হারাম বা অনুচিত বলেন। এই মতামত কতটুকু সঠিক?


উত্তর

মূলনীতি

ইসলামী শরীয়তে অমুসলিম দেশে বসবাসের বিষয়ে মূলনীতি হলো—অমুসলিম দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা (সেটেলড হওয়া) সাধারণত মাকরূহ ও অনুচিত, তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে জায়েয হতে পারে। আর অস্থায়ীভাবে (প্রয়োজন বা কাজের জন্য) যাওয়া জায়েয, তবে সেখানেও কিছু শর্ত পালন করা আবশ্যক।


কুরআন ও হাদীসের দলীল

১. কুরআনুল কারীম

আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنْتُمْ ۖ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ ۚ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا ۚ فَأُولَٰئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ ۖ وَسَاءَتْ مَصِيرًا

"যারা নিজেদের প্রতি যুলুমকারী অবস্থায় ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে, তারা বলে, 'আমরা তো দুর্বল ছিলাম'। ফেরেশতারা বলেন, 'আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা দেশত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে?' তাদের ঠিকানা জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত মন্দ স্থান।" (সূরা আন-নিসা: ৯৭)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন মুসলিমদের সমালোচনা করেছেন যারা অমুসলিমদের দেশে দুর্বল অবস্থায় বসবাস করে এবং দ্বীন পালনে বাধার সম্মুখীন হয়েও হিজরত করে না।

২. হাদীস শরীফ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

أَنَا بَرِيءٌ مِنْ كُلِّ مُسْلِمٍ يُقِيمُ بَيْنَ أَظْهُرِ الْمُشْرِكِينَ

"আমি প্রত্যেক সেই মুসলিম থেকে সম্পর্কমুক্ত, যে মুশরিকদের মধ্যে বসবাস করে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২৬৪৫; সুনানে নাসাঈ)

আরেকটি হাদীসে এসেছে:

مَنْ جَامَعَ الْمُشْرِكَ وَسَكَنَ مَعَهُ فَهُوَ مِثْلُهُ

"যে ব্যক্তি মুশরিকের সাথে মেলামেশা করে এবং তার সাথে বসবাস করে, সে তারই মতো।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২৬৪৭)


হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ

১. দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের সংজ্ঞা

হানাফী ফিকহে অমুসলিম দেশে বসবাসের বিধান বুঝতে হলে প্রথমে দারুল ইসলামদারুল হারব-এর সংজ্ঞা জানা প্রয়োজন।

ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর মতে, কোনো দেশ দারুল ইসলাম হওয়ার শর্ত হলো:

  • দেশটির শাসন ক্ষমতা মুসলিমদের হাতে থাকা
  • ইসলামী আইন (অন্তত আংশিক) প্রয়োগ হওয়া
  • মুসলিমদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকা

ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মতে, শাসন ক্ষমতা মুসলিমদের হাতে থাকলেই তা দারুল ইসলাম।

২. অমুসলিম দেশে বসবাসের বিধান

ক. স্থায়ীভাবে বসবাস (সেটেলড হওয়া):

হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়াহফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে যে, অমুসলিম দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা মাকরূহ। কারণ এতে দ্বীন ও ঈমানের নিরাপত্তা থাকে না।

ইমাম ইবনে আবিদীন শামী রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ বলেন:

وَيُكْرَهُ الْإِقَامَةُ بِدَارِ الْحَرْبِ لِمُسْلِمٍ يَقْدِرُ عَلَى الْهِجْرَةِ مِنْهَا

"যে মুসলিম হিজরত করতে সক্ষম, তার জন্য দারুল হারবে (অমুসলিম দেশে) বসবাস করা মাকরূহ।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৭৪)

খ. অস্থায়ীভাবে যাওয়া (প্রয়োজন বা কাজের জন্য):

কাজের প্রয়োজনে বা শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি বৈধ প্রয়োজনে অমুসলিম দেশে অস্থায়ীভাবে যাওয়া জায়েয, তবে নিম্নোক্ত শর্তগুলো পালন করতে হবে:

১. দ্বীন পালনের স্বাধীনতা থাকতে হবে ২. হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা না থাকা ৩. নিজের ঈমান ও আমল সংরক্ষণের চেষ্টা করা ৪. স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাসের নিয়ত না করা

মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ. বলেন:

"অমুসলিম দেশে চাকরি বা ব্যবসার জন্য যাওয়া জায়েয, যদি দ্বীনী অবস্থা ঠিক থাকে এবং হারাম কাজে জড়ানোর আশঙ্কা না থাকে। তবে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করা এবং নিজ দেশকে বিক্রি করে দেওয়া উচিত নয়।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৫৮)

৩. ওলামায়ে কেরামের মতের বিশ্লেষণ

ওলামায়ে কেরাম অমুসলিম দেশে যাওয়া ও সেটেলড হওয়াকে নিম্নোক্ত কারণে অনুচিত বলেন:

ক. ঈমান ও আকীদার নিরাপত্তা: অমুসলিম পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকলে ধীরে ধীরে নিজের দ্বীনী পরিচয় ও আকীদা দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সন্তান-সন্ততিদের উপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে।

খ. হারাম কাজে জড়ানোর আশঙ্কা: পশ্চিমা দেশগুলোতে সুদ, জুয়া, মদ, ব্যভিচার, অশ্লীলতা ইত্যাদি বৈধ। ফলে সেখানে বসবাসকারী মুসলিমদের জন্য এসব থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন।

গ. দ্বীনী পরিবেশের অভাব: মসজিদ, মাদরাসা, ইসলামী পরিবেশ—এসব থেকে দূরে থাকার কারণে দ্বীনী আমল ও জ্ঞান ধীরে ধীরে কমে যায়।

ঘ. হিজরতের নির্দেশ: উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহে আল্লাহ ও রাসূল ﷺ মুসলিমদের জন্য অমুসলিম দেশে বসবাস করা থেকে সতর্ক করেছেন।


তবে কিছু ক্ষেত্রে জায়েয হওয়ার শর্ত

মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম তার ফতোয়াসমূহে উল্লেখ করেছেন যে, নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ হলে অমুসলিম দেশে বসবাস করা জায়েয হতে পারে:

১. দ্বীন পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা ২. নিজের ঈমান ও আমল সংরক্ষণের দৃঢ় সংকল্প থাকা ৩. সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা ৪. হারাম ও সন্দেহজনক কাজ থেকে বিরত থাকা ৫. দেশটিতে থাকাকালীন দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ থাকা ৬. স্থায়ীভাবে সেখানে থাকার নিয়ত না করা (যদি সম্ভব হয়)

তবে তিনি আরও বলেন যে, শুধু পার্থিব উন্নতি ও বেশি আয়ের জন্য অমুসলিম দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা উচিত নয়, কারণ এতে দ্বীন ও আখিরাতের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি।


সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ

বর্তমান যুগে অনেক মুসলিম যুবক শুধু অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ইউরোপ-আমেরিকায় যায়। সেখানে গিয়ে তারা:

  • সুদী ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে জড়িয়ে পড়ে
  • হারাম খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে
  • সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখে
  • ধীরে ধীরে দ্বীনী আমল থেকে দূরে সরে যায়

এমতাবস্থায় ওলামায়ে কেরামের সতর্কবাণী সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত ও শরীয়তসম্মত।

তবে যদি কেউ দ্বীন সংরক্ষণের দৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে যায় এবং সেখানে গিয়েও দ্বীনের উপর অটল থাকে, তাহলে সেটা জায়েয হতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সেখানে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ থাকলে সেটা সওয়াবের কাজও হতে পারে।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

১. অমুসলিম দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা (সেটেলড হওয়া)—সাধারণত মাকরূহ ও অনুচিত, বিশেষ করে শুধু পার্থিব উন্নতির জন্য।

২. অস্থায়ীভাবে কাজের জন্য যাওয়া—শর্ত সাপেক্ষে জায়েয, তবে দ্বীন সংরক্ষণের চেষ্টা করতে হবে।

৩. ওলামায়ে কেরামের সতর্কবাণী—এটি সম্পূর্ণ সঠিক ও শরীয়তসম্মত, কারণ এতে মুসলিম উম্মাহর দ্বীনী ও আখিরাতী ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

৪. যারা ইতিমধ্যে অমুসলিম দেশে আছেন, তাদের উচিত:

  • দ্বীনী আমল ও নামাজ-রোজা নিয়মিত আদায় করা
  • হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা
  • সন্তানদের ইসলামী শিক্ষার ব্যবস্থা করা
  • সম্ভব হলে নিজ দেশে ফিরে আসার পরিকল্পনা করা

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের উপর অটল থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.