অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ হলে পরিবারের সদস্যের মাধ্যমে নিজের দক্ষতা দিয়ে কাজ করা কি জায়েজ?
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
পরিবারের সদস্যের মাধ্যমে Marketplace-এ কাজ করা: শরিয়াহ সম্মত পদ্ধতি
উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ, প্রশ্নটির জন্য ধন্যবাদ। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি ও বাস্তবিক প্রশ্ন। নিম্নে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
###১. প্রেক্ষাপট ও মূলনীতি প্রশ্নকারী এমন একজন ব্যক্তির কথা বলেছেন যিনি কোনো অন্যায় বা প্রতারণা ছাড়াই marketplace-এর নীতিমালার কারণে স্থায়ীভাবে বাদ পড়েছেন, অথচ তার বৈধ দক্ষতা ও উপার্জনের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি জানতে চান—পরিবারের কোনো সদস্যের মাধ্যমে কাজ করার বৈধ পদ্ধতি আছে কি না, যদি marketplace-এর শর্ত তা নিষেধ করে?
এখানে মূল বিষয় হলো: শরিয়াহ কি এমন পরিস্থিতিতে বৈধ বিকল্প পথ দেয়? এবং পরিবারের সদস্যের মাধ্যমে কাজ করা কি জায়েজ?
১. চুক্তির বাধ্যবাধকতা ও শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামি শরিয়তের একটি মৌলিক বিধান হলো, কোনো বৈধ চুক্তিতে আবদ্ধ হলে তার শর্তাবলি মেনে চলা ওয়াজিব বা আবশ্যক । কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো” (সূরা মায়েদা: ১)। আপনি যখন কোনো মার্কেটপ্লেসে (Marketplace) অ্যাকাউন্ট খোলেন, তখন আপনি তাদের নীতিমালা বা শর্তাবলি মেনে চলার অঙ্গীকার করেন। সুতরাং বৈধ দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও এবং কোনো অন্যায় না করলেও, মার্কেটপ্লেসের শর্ত ভঙ্গ করা মূলত চুক্তিভঙ্গের শামিল।
- কিতাব ও পৃষ্ঠা সূত্র:
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৪শ খণ্ড): পৃষ্ঠা ৫৩ (অধ্যায়: কফফারায়ে ইয়ামিন — প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের গুনাহ)।
২. পরিবারের সদস্যের মাধ্যমে কাজ করার পদ্ধতি (ওকালাত ও ইজারা)
যদি মার্কেটপ্লেসের শর্তে ‘অন্যের মাধ্যমে কাজ করানো’ বা ‘পরিবারের সদস্যের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা’ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ থাকে, তবে পরিচয় গোপন করে বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট চালানো শরিয়তের দৃষ্টিতে ‘তাদলিস’ (Deception) বা ধোঁকাবাজির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে যদি বিষয়টি এমন হয় যে, পরিবারের একজন সদস্য (যেমন ভাই বা বাবা) তার নিজের নামে অ্যাকাউন্ট খুলেছেন এবং তিনি আপনাকে তার ‘সহকারী’ বা ‘শ্রমিক’ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন, তবে ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি ‘ইজারা’ (শ্রম চুক্তি) হিসেবে গণ্য হবে।
- বৈধ পদ্ধতি: পরিবারের সদস্য নিজে চুক্তিকারী (Asil) হবেন এবং তিনি আপনাকে তার কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য নিয়োগ দেবেন। এক্ষেত্রে উপার্জিত অর্থ সদস্যের হবে এবং তিনি আপনাকে পারিশ্রমিক দেবেন [১১০]। তবে যদি মার্কেটপ্লেসের শর্ত এমন হয় যে, “যিনি অ্যাকাউন্টধারী তাকেই সরাসরি কাজ করতে হবে,” সেক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অবলম্বন করা চুক্তির খেলাপ হতে পারে।
- কিতাব ও পৃষ্ঠা সূত্র:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা ৩১২ (অধ্যায়: শ্রমহীন বিনিময় ও শ্রমিকের হক)।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা ৪৪৬ (অধ্যায়: যৌথ উত্তরাধিকার ও তাবাররু)।
৩. বিশেষ প্রয়োজনে বিকল্প পথ ও ‘জরুরত’-এর বিধান
যদি মার্কেটপ্লেসটি আপনাকে অন্যায়ভাবে বা কোনো ভুল সিদ্ধান্তের কারণে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করে এবং আপনার উপার্জনের আর কোনো বিকল্প পথ না থাকে, তবে শরিয়তের একটি মূলনীতি হলো— “জরুরত বা বিশেষ প্রয়োজনে নিষিদ্ধ বিষয়ও সীমিত পরিসরে বৈধ হয়” ।
- বিকল্প পথ: আপনি যদি সরাসরি মার্কেটপ্লেসের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত ক্লায়েন্ট (Direct Client) বা অন্য কোনো মার্কেটপ্লেসে কাজ করার চেষ্টা করেন, তবে তা হবে সবচেয়ে নিরাপদ ও তাকওয়াসম্মত পথ।
- সীমিত অবকাশ: যদি আপনার বেঁচে থাকার জন্য বা পরিবারের খরচ মেটানোর জন্য উপার্জনের আর কোনো মাধ্যমই না থাকে এবং মার্কেটপ্লেসের নিষেধাজ্ঞাটি অন্যায় হয়, তবে অত্যন্ত নিরুপায় অবস্থায় পরিবারের অন্য সদস্যের সহায়তায় কাজ করার ক্ষেত্রে শিথিলতা থাকতে পারে, যদি সেখানে বড় কোনো ধোঁকাবাজি বা আর্থিক ক্ষতি না থাকে। তবে এই অবকাশ কেবল ‘হাজত’ বা ‘জরুরত’ (চরম প্রয়োজন) থাকা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে।
- কিতাব ও পৃষ্ঠা সূত্র:
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা ৪৭৮ (অধ্যায়: চেয়ারে বসে নামায — জরুরত ও হাজতের সীমারেখা)।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা ১৩১ (অধ্যায়: প্রযুক্তির সাহায্যে বিবাহ — ওয়াকীল বা প্রতিনিধির ভূমিকা)।
সারকথা ও পরামর্শ:
অন্যায়ভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পর শরিয়াহ আপনাকে আপনার দক্ষতাকে ভিন্ন কোনো প্ল্যাটফর্মে বা সরাসরি ক্লায়েন্টের সাথে ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। মার্কেটপ্লেসের শর্ত ভঙ্গ করে অ্যাকাউন্ট চালানো চুক্তিভঙ্গের শামিল বিধায় তা পরিহার করা উচিত। তবে আপনি যদি পরিবারের কোনো সদস্যের অধীনে তার কাজ সম্পন্ন করে দেওয়ার মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন এবং এতে মার্কেটপ্লেসের পক্ষ থেকে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্যের (Identity) অপব্যবহার না হয়, তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বিজ্ঞ মুফতীগণ ভিন্নমতের অবকাশ দিতে পারেন।
আল্লাহ-ই ভালো জানেন।