ইসলামে স্ত্রীর অধিকার, স্বামীর কর্তব্য, শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ, আলাদা সংসারের অধিকার সম্পর্কে জানতে চাই।
Family Life · Hanafi
Question
উস্তাদ,আমি এবং আমার হাজবেন্ড উভয়ই জেনারেল লাইন থেকে ইসলামিক পদ্ধতি মেনে জীবন শুরু করেছে,,এবং দ্বীন প্র্যাকটিস করছি,
আমার প্রশ্ন,
১/আমরা জানি মা বাবা ব্যাপারে উফ করা যাবে না,,
এরমানে কি এই ওয়াইফের প্রতি তার নিজের বাবার সকল অন্যায়, তা গালাগালি হোক , মিথ্যা অপবাদ হোক, অপরের সামনে ছোট করা হোক এবং কিছু না জায়েজ কাজ, যা ইসলামের বিরুদ্ধে যায়,যা রবের সাথে সরাসরি শিরকের পর্যায়ে যায়,
এসব বিষয়েও কি তাদের ভদ্রভাবে না, করা যাবে নাহ, বা ওয়াইয়ের প্রতি হওঅন্যায় প্রতিবাদ ও করা যাবে না।
এক্ষেএে ওয়াইফ যদি আশা রাখে তার প্রতি হওয়া অবিচার অন্যায়ের প্রতিবাদ হাজবেন্ড করবে,এটা কি ওয়াইফের জন্য খুব বড় গুনাহ,,,বা এমনটা আশা রেখে হাজবেন্ড এর কাছে চাওয়া টা কি বেয়াদবি পর্যায়ে পড়ে।
২/ ইসলামে ৪ বিয়ে সুন্নাহ,প্রয়োজনে করা জায়েজ,তবে সেটাকে কোন পুরুষ হাতিয়ার বা হুমকি পর্যায়ে বা ওয়াইফকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করলে বিষয় টা কেমন??যেখানে প্রথম ওয়াইফের সকল হুকুহ আদায় করা হয় না??
৩/যথাসাধ্য এবং নিজের বড় হওয়া পারিপার্শিক পরিবেশে বাহিরে গিয়ে মানিয়ে নেবার চেষ্টার পরও যদি শ্বশুর বাড়ির মানুষের কাছে মূল্যায়ন কিংবা তাদের ইসলাম বিরোধী কাজের সাথে মানিয়ে না নিতে পারায় এসব থেকে দুরে থাকাী জন্য অন্য স্থানে আলাদা সংসার চাইবার অধিকার কি নেই?? যেখানে তার অন্যান্য ছেলেমেয়ে রয়েছে।
৪/হাজবেন্ড এর মা বাবার সেবা করা, হাজবেন্ড এর দায়িত্ব, ওয়াইফ এহসান করে হাজবেন্ড এর দায়িত্ব পালন করে দেন,,
কিন্তু এই করা টা কি ওয়াইফ এর জন্য বাধ্যতামুলক,, স্বামী কি এটা বলতে পারে তার জায়েজ হুমুক হিসেরে সেবা করা বাধ্যতামুলক,,???
যখন যতই আপন হিসেবে সেবা করা হোক তার কোন মূল্যায়ন তো হয় ই না,উল্টো নানান কমতি খুদ ধরা,এবং ওয়াইফ কে নিয়ে কুৎসা রচনা করা হয়।
রব ছাড়া অন্য কাওকে সিজদা করার হলে তা স্বামী হতো,
আমার প্রশ্ন হলো যেখানে রব আমাকে একটা বিষয় আমার জন্য বাধ্যতামূলক করেন নি,সেটা স্বামীর জায়েজ হুকুমের জন্য আমায় করতে বাধ্য হতে হবে,তবে কি আমার রবের হুকুম থেকেও স্বামীর হুকুম বড়?
নাউজুবিল্লাহ,,
শুধু মাএ একজন পুরুষ না হয়ে অনুরোধ থাকবে,এজজন মুসলিম বোনের মুসলিম ভাই হিসেবে জবাব দেবেন।
কেননা এখন মনে হচ্ছে সকল বাধা নিষেধ আর নিয়ম নীতি শুধুমাএ একজন মেয়েকে হাদিস কুরআন এর আয়াত দিয়ে আটকে,নিজেরা নিজেরদের মত যা ইচ্ছা করার লাইসেন্স পেয়ে যাওয়া।
আমি প্রকৃত পক্ষে ই কারো প্রতি না ইনসাফ করতে চাই না,কিংবা নিজের প্রতিও অবিচার হতে দিতে চাই নাহ।
আমি দ্বীনের জন্য আমার লাইফস্টাইল করেছি,অনেককিছু সেক্রিফাইস করেছি,আমি চাই পরিপূর্ণ ভাবে দ্বীন পালন করতে তবে শুধু নিজের পক্ষের হাদিস মানবো আর বাকি গুলো মানবো না এমনটা
করতে চাই নাহ, আমার হাজবেন্ড এমনটা করবে এটাও চাই না।
দয়া করে এবিষয়ে গুলো জানাবেন।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর জন্য ধন্যবাদ। আপনি দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে আন্তরিক ও ন্যায়পরায়ণ হতে চান, এটি সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
১. স্ত্রীর পিতার অন্যায়ের প্রতিবাদ ও স্বামীর কর্তব্য
প্রশ্ন: স্ত্রীর নিজের বাবা যদি গালাগালি, মিথ্যা অপবাদ, অপরের সামনে ছোট করা বা শিরকের মতো কাজ করে, তবে কি স্ত্রী বা স্বামী তার প্রতিবাদ করতে পারবে না?
উত্তর: আল্লাহ তাআলা পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, পিতামাতার অন্যায় কাজকে সমর্থন করতে হবে বা চুপ করে সহ্য করতে হবে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا ۖ وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا "যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করার জন্য চাপ দেয়, যা সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের কথা মানবে না। কিন্তু দুনিয়ায় তাদের সাথে সদ্ভাবে সহাবস্থান করবে।" (সূরা লুকমান: ১৫)
তাই পিতার অন্যায় ও শিরকের প্রতিবাদ করা জরুরি, তবে তা ভদ্রভাবে ও হিকমতের সাথে করতে হবে। গালিগালাজ বা অপমানের জবাব গালিগালাজ দিয়ে দেওয়া উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"মুসলিম সে ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।" (বুখারি: ১০)
স্বামীর কর্তব্য: স্ত্রীর প্রতি তার পরিবারের পক্ষ থেকে অন্যায় হলে, স্বামীর উচিত স্ত্রীর পাশে দাঁড়ানো এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে তার প্রতিবাদ করা। এটি স্ত্রীর প্রতি ইনসাফের অংশ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিজি: ১১৬২)
তবে মনে রাখবেন, স্ত্রী যদি আশা করে স্বামী তার পিতার সাথে গালিগালাজ বা ঝগড়া করুক, তবে তা কাম্য নয়। বরং স্বামী ভদ্রভাবে ও যুক্তিসঙ্গতভাবে স্ত্রীর পক্ষ নেবে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে। স্ত্রীর জন্য এতটুকু আশা রাখা গুনাহ নয়, বরং এটি তার প্রাপ্য অধিকার।
২. চার বিয়ে ও স্ত্রীকে চাপে রাখার কৌশল
প্রশ্ন: ইসলামে ৪টি বিয়ে জায়েজ, কিন্তু কেউ যদি সেটাকে স্ত্রীকে চাপে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এবং প্রথম স্ত্রীর অধিকার আদায় না করে, তবে তা কেমন?
উত্তর: ইসলামে একাধিক বিয়ে শর্তসাপেক্ষে জায়েজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً "তোমরা নারীদের মধ্যে থেকে যাকে ভালো লাগে তাকে দুই, তিন বা চারটি বিয়ে করতে পারো। কিন্তু যদি ভয় করো যে, তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একটি-ই।" (সূরা নিসা: ৩)
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এই আয়াতের শুরুতে বলা হয়েছে "فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً" অর্থাৎ ন্যায়বিচার না পারার ভয় থাকলে একটিই বিয়ে করবে। তাই একাধিক বিয়ে তখনই জায়েজ, যখন স্ত্রীদের মধ্যে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার করা সম্ভব হবে।
স্ত্রীকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে বিয়ের হুমকি দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ। এটি স্ত্রীর প্রতি জুলুম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।" (ইবনে মাজাহ: ১৯৭৭)
যদি প্রথম স্ত্রীর সকল অধিকার আদায় করা না হয়, তবে দ্বিতীয় বিয়ে করা জায়েজ হবে না। ফিকহের কিতাবে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ন্যায়বিচার না করার ভয় থাকলে একাধিক বিয়ে করা মাকরুহে তাহরিমি। (রদ্দুল মুহতার: ৩/১৬৫)
৩. শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ থেকে দূরে থাকার জন্য আলাদা সংসারের অধিকার
প্রশ্ন: শ্বশুরবাড়ির লোকজন যদি ইসলামবিরোধী কাজ করে এবং স্ত্রীকে সেসব কাজে মানিয়ে নিতে বাধ্য করে, তবে কি স্ত্রীর আলাদা সংসার চাওয়ার অধিকার আছে?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। ইসলামে স্ত্রীর জন্য আলাদা সংসারের অধিকার স্বীকৃত। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে সাহাবিরা আলাদা সংসার করতেন। ফাতাওয়া আলমগিরিতে বলা হয়েছে:
"স্ত্রীর জন্য পৃথক ঘরের ব্যবস্থা করা স্বামীর ওপর ওয়াজিব, যদি সে তা চায়।" (ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/৫৪৩)
যদি শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ এমন হয় যেখানে স্ত্রীকে ইসলামবিরোধী কাজে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়, তবে সেখান থেকে দূরে থাকা শুধু তার অধিকারই নয়, বরং দ্বীন রক্ষার জন্য এটি তার কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاللَّهُ يُرِيدُ أَن يَتُوبَ عَلَيْكُمْ "আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়া করতে চান।" (সূরা নিসা: ২৭)
তবে আলাদা সংসার চাওয়ার আগে স্বামীর সাথে পরামর্শ করা এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা উচিত। যদি স্বামী দ্বীনদার হয়, তবে সে নিজেই স্ত্রীর জন্য আলাদা সংসারের ব্যবস্থা করবে।
৪. শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা কি স্ত্রীর জন্য বাধ্যতামূলক?
প্রশ্ন: স্বামীর মা-বাবার সেবা করা কি স্ত্রীর জন্য বাধ্যতামূলক? স্বামী কি এটা তার জায়েজ হুকুম হিসেবে দাবি করতে পারে?
উত্তর: ইসলামে স্ত্রীর ওপর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা বাধ্যতামূলক নয়। এটি একটি নৈতিক কর্তব্য, যা স্ত্রী সাধ্যমতো করতে পারে। কিন্তু স্বামীর জন্য বৈধ নয় যে, সে স্ত্রীকে তার মা-বাবার সেবা করার জন্য বাধ্য করবে। হানাফি ফিকহের কিতাবে স্পষ্ট বলা হয়েছে:
"স্ত্রীর ওপর স্বামীর মা-বাবার সেবা করা ওয়াজিব নয়।" (রদ্দুল মুহতার: ৩/৬০১)
স্বামীর হুকুমের সীমা: স্ত্রীকে স্বামীর আনুগত্য করতে হবে, তবে শুধুমাত্র জায়েজ ও বৈধ বিষয়ে। যদি স্বামী এমন কিছু আদেশ করে যা শরিয়তসম্মত নয় বা স্ত্রীর জন্য কষ্টকর, তবে তা মানা বাধ্যতামূলক নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"আল্লাহর নাফরমানিতে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮)
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয়: আপনি বলেছেন, "যেখানে রব আমাকে একটা বিষয় বাধ্যতামূলক করেননি, সেটা স্বামীর জায়েজ হুকুমের জন্য আমাকে করতে বাধ্য হতে হবে, তবে কি আমার রবের হুকুম থেকেও স্বামীর হুকুম বড়?"
উত্তর: না, কখনোই না। স্বামীর হুকুম রবের হুকুমের চেয়ে বড় নয়। বরং স্বামীর আনুগত্য তখনই জরুরি, যখন তা রবের হুকুমের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যদি আমি কাউকে আদেশ করতাম যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করতে, তবে আমি স্ত্রীকে আদেশ করতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে।" (তিরমিজি: ১১৫৯)
এই হাদিসটি স্ত্রীর ওপর স্বামীর মর্যাদা বোঝাতে বলা হয়েছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, স্বামীর হুকুম আল্লাহর হুকুমের চেয়ে বড়। বরং স্বামীর আনুগত্য আল্লাহরই আদেশ পালনের অংশ। কিন্তু স্বামী যদি আল্লাহর হুকুমের বিপরীত কিছু আদেশ করে, তবে তা মানা যাবে না।
আপনার শেষ মন্তব্য সম্পর্কে
আপনি বলেছেন, "সকল বাধা নিষেধ আর নিয়ম নীতি শুধুমাত্র একজন মেয়েকে হাদিস কুরআনের আয়াত দিয়ে আটকে, নিজেরা নিজেদের মত যা ইচ্ছা করার লাইসেন্স পেয়ে যাওয়া।"
এটি দুঃখজনক যে, কিছু পুরুষ ইসলামের নামে নারীদের ওপর জুলুম করে। কিন্তু ইসলাম কখনো এটা সমর্থন করে না। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার সমানভাবে সংরক্ষণ করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমরা স্ত্রীদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করো।" (বুখারি: ৫১৮৬)
আপনার উচিত স্বামীর সাথে খোলামেলা আলোচনা করা এবং তাকে ইসলামের সঠিক শিক্ষা বোঝানো। যদি তিনি দ্বীনদার হন, তবে তিনি অবশ্যই বুঝবেন। প্রয়োজনে কোনো আলেমের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা যেতে পারে।
*আল্লাহ তাআলা আপনাকে ও আপনার পরিবারকে দ্বীনের সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।