মায়ের নির্দেশে তালাক দেওয়া জায়েজ হবে কি না?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5042
Questioner: Shabina Yasmin
Question Asked: 06 Sep 2026, 06:21 AM
Reviewed & Published: 06 Sep 2026, 07:42 AM
Views: 23
Tokens: 6,111
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
আমার ভাই একজন হাফেজ। আলিম শেষ করে ফাজিলে ভর্তি হয়েছে। ওর পড়ালেখার সব খরচ এখনো বাবা বহন করেন। ওকে নিয়ে বাবার অনেক স্বপ্ন। ও কোনো মহিলা মানুষের দিকে তাকায়না পর্যন্ত। অনেক ভদ্র ছেলে সবাই অনেক স্নেহ ও সম্মান করে। অথচ গত আট মাস আগে বাবা মাকে না জানিয়ে বিবাহ করেছে এমন একজন মহিলাকে যার আমার ভাইয়ের বয়সি সন্তান আছে। যিনি একজন বেপর্দা মহিলা। একজন সাংবাদিক। পারিবারিক ও সামাজিক দিক থেকে আমার পরিবার অনেক সম্মানের। তাই এরকম বেপর্দা ও বয়স্ক মহিলাকে আমার বাবা মা কোনোদিন মেনে নিবে না। বাবা এখনো এই বিষয়টা জানেন না। বিয়েটা গোপনে হয়েছে এজন্য মা বলেছেন এটা গোপনে তালাক দিয়ে চলে আসতে। কিন্তু ও ভাবছে এটা অন্যায় হবে এজন্য তালাক দিতে চাচ্ছে না। প্রথমত তিনি
একজন বেপর্দা মহিলা, তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে ইনকাম করে থাকেন যেটা হালাল না। এই বিষয়টা জানজানি হলেও সামাজিকভাবে অনেক অপদস্ত হতে হবে। এমন মহিলাকে মায়ের কথামত তালাক প্রদান করা কি জায়েজ হবে নাকি আমাদের গুনাহ হবে?

Answer

বিবাহ ও তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আমি কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করছি।

১. বিবাহের বৈধতা ও শর্তাবলী

ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন। তবে বিবাহের জন্য কুফু (সামঞ্জস্যতা) একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। হানাফি মাযহাবে কুফু বিবেচনা করা হয় নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে:

  • বংশ (নসব)
  • ধর্মপরায়ণতা (দিয়ানত)
  • পেশা (সানআত)
  • স্বাধীনতা (হুররিয়াত)
  • আর্থিক সামর্থ্য (ইয়াসার)

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর মতে, কুফু বিবাহের শর্ত। তবে বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেলে তা সহীহ হবে, কিন্তু অভিভাবকের আপত্তির কারণে তা ফাসখ (বাতিল) করানোর অধিকার থাকে।

রদ্দুল মুহতার (৫ম খণ্ড, ২৩৪ পৃষ্ঠা) এ উল্লেখ আছে:

"الكفاءة معتبرة في النكاح عند أبي حنيفة في النسب والديانة والصناعة والحرية واليسار"

অর্থাৎ, "আবু হানিফার মতে কুফু বিবেচ্য হবে বংশ, ধর্মপরায়ণতা, পেশা, স্বাধীনতা ও আর্থিক সামর্থ্যের ক্ষেত্রে।"

২. পিতা-মাতার সম্মতি ও আপত্তি

বিবাহের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার সম্মতি গ্রহণ করা ইসলামী আদব ও সামাজিক প্রথা। তবে ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) ও সুস্থ মস্তিষ্কের পুরুষ নিজে বিবাহ করার অধিকার রাখে। কিন্তু পিতা-মাতার অনুমতি না নিয়ে বিবাহ করলে তা যদি কুফু না হয়, তাহলে অভিভাবকরা আপত্তি করতে পারেন।

৩. তালাক প্রদানের বিধান

তালাক ইসলামে অত্যন্ত অপছন্দনীয় (মাকরূহ) কাজ। হাদিসে আছে:

"أبغض الحلال إلى الله الطلاق"
"আল্লাহর নিকট বৈধ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত হলো তালাক।"
(আবু দাউদ, হাদিস: ২১৭৮; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২০১৮)

তাই তালাক দেওয়া কোনো সাধারণ বিষয় নয়। তালাক শুধুমাত্র তখনই জায়েজ হয় যখন দাম্পত্য জীবন অচল হয়ে যায় এবং কোনোভাবেই মিল-মিশ করে চলা সম্ভব হয় না।

৪. মায়ের নির্দেশে তালাক দেওয়া

মায়ের নির্দেশে তালাক দেওয়া জায়েজ হবে কি না—এটি নির্ভর করে পরিস্থিতির উপর। সাধারণভাবে:

  • যদি স্ত্রী ভালো ও ধার্মিক হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমস্যা না থাকে, তাহলে শুধুমাত্র মায়ের নির্দেশে তালাক দেওয়া জায়েজ নয় এবং গুনাহ হবে।
  • যদি স্ত্রীর মধ্যে এমন ত্রুটি থাকে যা ধর্মীয় বা সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং যা দাম্পত্য জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করছে, তাহলে তালাক দেওয়া যেতে পারে।

৫. আপনার ভাইয়ের ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

১. আপনার ভাই গোপনে বিবাহ করেছে (পিতা-মাতাকে না জানিয়ে) ২. স্ত্রী তার চেয়ে অনেক বয়স্ক (তার বয়সি সন্তান আছে) ৩. স্ত্রী বেপর্দা ৪. স্ত্রী ফেসবুকের মাধ্যমে ইনকাম করে যা হালাল নয় (আপনার মতে) ৫. পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন আছে

এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে:

ক. কুফু (সামঞ্জস্যতা) না থাকা:

যেহেতু স্ত্রী বয়সে অনেক বড় এবং বেপর্দা, তাই কুফু না থাকার কারণে অভিভাবক (পিতা) আপত্তি করতে পারেন। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, কুফু না থাকলে অভিভাবকের আপত্তিতে বিবাহ ফাসখ (বাতিল) করানো যেতে পারে।

খ. স্ত্রীর চারিত্রিক ত্রুটি:

স্ত্রী বেপর্দা এবং হারাম উপায়ে ইনকাম করে—এটি গুরুতর সমস্যা। ইসলামে পর্দা ফরজ এবং হারাম উপার্জন কবিরা গুনাহ। এমন স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য জীবন চালানো কঠিন।

গ. পিতা-মাতার সম্মান ও সামাজিক মর্যাদা:

পারিবারিক সম্মান রক্ষা করা জরুরি, তবে এর জন্য অন্যায়ভাবে তালাক দেওয়া উচিত নয়।

৬. সমাধান ও পরামর্শ

আপনার ভাইয়ের করণীয় সম্পর্কে নিম্নোক্ত পরামর্শ প্রদান করছি:

প্রথম ধাপ:

  • আপনার ভাইকে উচিত বিষয়টি পিতাকে জানানো। কারণ বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং পিতা-অভিভাবক হিসেবে জানার অধিকার রাখেন।
  • পিতা-মাতার সাথে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা এবং তাদের মতামত নেওয়া।

দ্বিতীয় ধাপ:

  • স্ত্রীকে নসীহত (উপদেশ) দেওয়া যে, সে যেন পর্দা করে এবং হারাম উপার্জন পরিত্যাগ করে।
  • যদি সে তওবা করে এবং সঠিক পথে আসে, তাহলে বিবাহ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা।

তৃতীয় ধাপ:

  • যদি স্ত্রী তওবা না করে এবং তার আচরণে কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে তালাক দেওয়া জায়েজ হবে।
  • তবে তালাক দেওয়ার আগে দুজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিমের মধ্যস্থতায় সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। (সূরা নিসা: ৩৫)

চতুর্থ ধাপ:

  • যদি সব চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং দাম্পত্য জীবন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাহলে তালাক দেওয়া জায়েজ হবে এবং এতে গুনাহ হবে না।

৭. গুরুত্বপূর্ণ নোট

১. শুধুমাত্র মায়ের নির্দেশে তালাক দেওয়া—যদি স্ত্রী ভালো হয় এবং দাম্পত্য জীবনে সমস্যা না থাকে, তাহলে জায়েজ নয়। ২. স্ত্রীর বয়স বেশি হওয়া—এটি তালাকের বৈধ কারণ নয়, যদি স্ত্রী ধার্মিক ও সচ্চরিত্রা হয়। ৩. বেপর্দা হওয়া ও হারাম ইনকাম—এটি গুরুতর সমস্যা, তবে প্রথমে নসীহত করা উচিত। ৪. পারিবারিক সম্মান রক্ষা—গুরুত্বপূর্ণ, তবে এর জন্য অন্যায়ভাবে তালাক দেওয়া উচিত নয়।

৮. ফিকহী রায়

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী:

  • যদি স্ত্রী বেপর্দা হয় এবং হারাম উপার্জন করে এবং নসীহতের পরও সে তা পরিত্যাগ না করে, তাহলে তালাক দেওয়া জায়েজ হবে।
  • তবে তালাক দেওয়ার আগে পিতা-মাতাকে বিষয়টি জানানো এবং তাদের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
  • পিতার সম্মতি ছাড়া গোপনে বিবাহ করা হয়েছে—এটি সঠিক হয়নি, তবে বিবাহটি সহীহ হয়েছে। এখন পিতা জানতে পারলে তিনি আপত্তি করতে পারেন।

৯. চূড়ান্ত পরামর্শ

আপনার ভাইয়ের উচিত:

১. প্রথমে বিষয়টি পিতাকে জানানো ২. পিতা-মাতার সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ৩. স্ত্রীকে নসীহত করা এবং তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া ৪. যদি স্ত্রী সংশোধিত না হয় এবং পিতা-মাতা আপত্তি করেন, তাহলে শরীয়ত ও দ্বীন মানেনা এই কারনে তাকে তালাক দেওয়া জায়েজ হবে।

মনে রাখবেন: তালাক একটি গুরুতর বিষয়। তালাক দেওয়ার আগে অবশ্যই সব দিক বিবেচনা করা উচিত। তালাক দেওয়া হবে কি না—এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোনো বিশ্বস্ত আলেমের সাথে পরামর্শ করা উত্তম।

আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারকে হেফাজত করুন এবং সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। আমীন।


দলিলসমূহ:

১. সূরা নিসা: ৩৫ - "আর যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক নিয়োগ কর। তারা উভয়ে যদি সংশোধন করতে চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিলিয়ে দেবেন।"

২. আবু দাউদ, হাদিস: ২১৭৮ - "আল্লাহর নিকট বৈধ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত হলো তালাক।"

৩. রদ্দুল মুহতার, ৫ম খণ্ড, ২৩৪ পৃষ্ঠা - কুফুর শর্তাবলী

৪. ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১ম খণ্ড, ৩০৮ পৃষ্ঠা - কুফু না থাকলে অভিভাবকের আপত্তির বিধান

৫. আল-হিদায়া, ২য় খণ্ড - বিবাহ ও তালাকের বিধানাবলী


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.